বিশ্বকাপ ১৯৯৪
ম্যারাডোনার কান্না, এসকোবার-ট্র্যাজেডি, বাজ্জোর শূন্য দৃষ্টি এবং ব্রাজিল
১৯৩০ সালে মন্টেভিডিওর সেই ধূসর বিকেলে বিশ্বকাপ নামে যে মহাযাত্রার শুরু হয়েছিল, তা আজ শতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। এই যাত্রার কোথাও পেলে-গারিঞ্চার সাম্বার ছন্দ, কোথাও ম্যারাডোনার ঈশ্বরপ্রদত্ত জাদুকরি ছোঁয়া, আবার কোথাও জিনেদিন জিদান কিংবা লিওনেল মেসির অমরত্বের পথে হেঁটে যাওয়া—সব মিলিয়েই তো এই ফুটবল-পুরাণ। ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে বিশ্বকাপের সব রোমাঞ্চকর স্মৃতি ফেরানোর আয়োজন—ফিরে দেখা বিশ্বকাপ।
১৯৯৪ সালে বিশ্বকাপ যখন আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে মার্কিন মুলুকে নোঙর ফেলল, ফুটবল রোমান্টিকেরা তখন নাক সিটকেছিলেন। ‘ফুটবল’ কী জিনিস, সেটাই তো বোঝে না আমেরিকানরা! যেখানে রাগবি, বেসবল আর বাস্কেটবলের দাপটে ফুটবল চার কি পাঁচ নম্বরে ধুঁকছে, সেখানে ফুটবল-পুরাণের সবচেয়ে বড় যজ্ঞ! অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে স্থানীয় আয়োজকেরা দর্শকদের নিয়মকানুন বোঝাতে ‘অদীক্ষিতদের জন্য গাইড বুক’ পর্যন্ত ছাপিয়েছিল।
কিন্তু মাঠের বল গড়াতেই সব সংশয় কর্পূরের মতো উড়ে গেল। পপকর্ন আর হটডগ খেতে খেতেই আমেরিকানরা স্টেডিয়ামে এমন স্রোতের মতো আছড়ে পড়ল যে গ্যালারির উপস্থিতিতে আগের সব রেকর্ড ভেঙে চুরমার! ৫২টি ম্যাচে মাঠে এসেছিলেন প্রায় ৩৬ লাখ দর্শক। ম্যাচপ্রতি গড় উপস্থিতি ছিল প্রায় ৬৯ হাজার। ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে এর চেয়ে ১২টি ম্যাচ বেশি হয়েও মোট দর্শকসংখ্যা মার্কিন মুলুকের রেকর্ড স্পর্শ করতে পারেনি।
নতুনত্ব
বিশ্বকাপের পঞ্চদশ এই আসরেই প্রথম জয়ের জন্য ৩ পয়েন্ট দেওয়ার নিয়ম চালু হয়, আর ফুটবলারদের জার্সির পেছনে লেখা হতে শুরু করে তাঁদের নাম।
ডায়না রসের ‘মিস’
১৭ জুন শিকাগোর সোলজার ফিল্ডে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গান গাইতে গাইতে পেনাল্টি কিক নেওয়ার কথা ছিল মার্কিন পপ তারকা ডায়না রসের। পরিকল্পনা ছিল, তাঁর শটে প্লাস্টিকের গোলপোস্টটি ভেঙে দুই টুকরা হয়ে যাবে। দূরত্ব ছিল মাত্র তিন মিটার। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে ডায়না রস বলটি পোস্টের বাইরে মারলেন! তবে যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে বল না লাগলেও পোস্টটি ভেঙে পড়ে। রস অবশ্য পেশাদার শিল্পীর মতো নাচ-গান চালিয়ে গেলেন, তবে সেটিই হয়ে রইল বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে মজাদার ‘ব্লুপার’।
বিশ্বকাপ শুরু হলো এক পেনাল্টি মিসে, শেষও হয়েছিল এক পেনাল্টি মিসেই।
ওলেগ সালেঙ্কো এবং ‘বুড়ো’ মিলার রূপকথা
২৮ জুন স্ট্যানফোর্ড স্টেডিয়ামে রাশিয়া-ক্যামেরুন ম্যাচটি ছিল স্রেফ নিয়মরক্ষার। কিন্তু সেই ম্যাচই ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে রইল দুই রেকর্ডে। ক্যামেরুনের ৪২ বছর ৩৯ দিন বয়সী রজার মিলা গোল করে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে বয়োবৃদ্ধ গোলদাতার রেকর্ড গড়লেন। আর ওদিকে রাশিয়ার ওলেগ সালেঙ্কো একাই করলেন ৫ গোল! বিশ্বকাপের এক ম্যাচে ৫ গোল করার রেকর্ড আর কারও নেই।
সেই নার্স এবং ম্যারাডোনার কান্না
নাইজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ২-১ গোলে জয়। বোস্টনের ফক্সবোরো স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাস মাড়িয়ে হেঁটে যাচ্ছেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। হঠাৎ দেখা গেল, সু কার্পেন্টার নামের এক হাসিমুখ নার্স ম্যারাডোনার হাত ধরে ডোপ টেস্টের ঘরের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। ম্যারাডোনা হাসছিলেন, কিন্তু সেই হাসির আড়ালে যে ফুটবলের একটা যুগের সমাপ্তি লুকিয়ে ছিল, তা কে জানত! মূত্র পরীক্ষায় মিলল এফিড্রিনসহ পাঁচটি নিষিদ্ধ উপাদান। ফিফা ১৫ মাসের জন্য নিষিদ্ধ করে তাড়িয়ে দিল ফুটবলের রাজপুত্রকে। ব্যস, ওখানেই শেষ ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ–অধ্যায়। নিষিদ্ধ হওয়ার পর ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত উক্তি, ‘ওরা আমার পা দুটো কেটে নিয়েছে’—আজও আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সবচেয়ে ভারী দীর্ঘশ্বাস।
আর্জেন্টাইন অধিনায়কের এই বিদায় মেনে নিতে পারেনি ফুটবল–বিশ্ব। বাংলাদেশের মানুষ রাস্তায় নেমে ফিফা সভাপতি জোয়াও হ্যাভেলেঞ্জের কুশপুতুল দাহ করল। এক বাংলাদেশি আইনজীবী ম্যারাডোনার বিদায়ে ‘মানসিক কষ্টের’ ক্ষতিপূরণ চেয়ে হ্যাভেলেঞ্জের বিরুদ্ধে মামলাও ঠুকে দিলেন! ওদিকে ইসরায়েলের হাইফায় এক ১১ বছরের বালক তিন দিন অনশন করে হাসপাতালে ভর্তি হলো। ম্যারাডোনার মহিমা এমনই, তিনি যখন খেলেন না, তখনো বুয়েনস এইরেস থেকে ঢাকা—হৃদয় ভেঙে চুরমার হয় সবখানে।
একটি আত্মঘাতী গোল, ১২টি বুলেট এবং এসকোবার-ট্র্যাজেডি
ফুটবল কখনো কখনো স্রেফ বিনোদন থাকে না, রূপ নেয় এক বিভীষিকায়। স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ম্যাচে আত্মঘাতী গোল করে বসেন কলম্বিয়ার ডিফেন্ডার আন্দ্রেস এসকোবার। টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যায় কলম্বিয়া। শোনা যায়, ওই ম্যাচ নিয়ে বাজি ধরেছিলেন কলম্বিয়ান মাফিয়ারা। সেই বাজিতে অনেক টাকা খুইয়ে তাঁরা খেপে গেলেন এসকোবারের ওপর। দেশে ফেরার পর এক রেস্তোরাঁর বাইরে একদল উগ্র সমর্থকের সঙ্গে তর্কের জেরে এসকোবারের শরীরে গেঁথে দেওয়া হলো ১২টি বুলেট! খুনি হামবার্তো মুনিয়োজ কাস্ত্রোর ৪৩ বছরের জেল হলেও মাত্র ১১ বছর সাজা খেটে ২০০৫ সালে তিনি পার পেয়ে যান।
এসকোবার-ট্র্যাজেডির আগেই অবশ্য কলম্বিয়া শিবিরে মাফিয়ার কালো ছায়া পড়েছিল। আমেরিকার বিপক্ষে সেই ভাগ্যনির্ধারক ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা আগে মিডফিল্ডার গ্যাব্রিয়েল হাইমে ‘বারাবাস’ গোমেজ ও তাঁর পরিবারকে খুনের হুমকি দেয় এক মাফিয়া চক্র। অবৈধ জুয়াড়িদের সেই চক্রটির দাবি ছিল, রোমানিয়ার কাছে প্রথম ম্যাচের হারের জন্য গোমেজ দায়ী। ভয়ে গোমেজ আর মাঠে নামেননি। ১৭ বছরের ক্যারিয়ারের ইতি টেনে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি পরিবারের জন্য ভয় পাচ্ছি, নিজের জন্য নয়।’
হায় বাজ্জো!
ব্রাজিলের ২৪ বছরের ট্রফি-খরা কাটল ক্যালিফোর্নিয়ার রোজ বোল স্টেডিয়ামে। তবে রোমারিও-বেবেতোদের সেই সাম্বার উদ্যাপনের আগে ফাইনালটা উপহার দিল ফুটবলীয় নান্দনিকতায় মরচে পড়া ম্যাচ। ১২০ মিনিটের ম্যাড়মেড়ে ফুটবল শেষে বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবার ফাইনালের ভাগ্য নির্ধারিত হলো পেনাল্টি শুটআউটে। ইতালির স্বপ্ন চূর্ণ করে মহাকাশে বল ভাসিয়ে দিলেন তখনকার বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার রবার্তো বাজ্জো।
বছরের পর বছর ধরে সেই বিষাদের বোঝা বয়ে বেড়ানো বাজ্জো অবশ্য পরে এক অদ্ভুত অতিলৌকিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, ‘আমার মনে হয়, ওপর থেকে আয়ার্টন সেনা এসে বলটা আকাশে টেনে নিয়েছিলেন।’ বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র দুই মাস আগে রেসিং ট্র্যাকে মারা যাওয়া ব্রাজিলের সেই কিংবদন্তি ফর্মুলা ওয়ান ড্রাইভার সেনাই কি তবে আকাশ থেকে ট্রফিটা তুলে দিয়েছিলেন রোমারিও-বেবেতোদের হাতে!