বিশ্বকাপে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিকল্পনা থেকে যেভাবে সরে এল ফিফা

সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফিফার সদরদপ্তররয়টার্স

বিশ্বকাপে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিকল্পনা থেকে শেষ পর্যন্ত সরেই দাঁড়াতে হলো ফিফাকে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো আজ এ পরিকল্পনা বাতিলের কথা জানান। তার আগে পাঁচ-ছয় দিন ধরে তুমুল সমালোচনার শিকার হন ইনফান্তিনো। ফিফার বেশির ভাগ সদস্য অ্যাসোসিয়েশন এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।

বিশ্বকাপসহ নিজেদের মূল প্রতিযোগিতাগুলো আয়োজনের জন্য নতুন একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছিল ফিফা। প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার মূল্যমান ধরে সেই প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২০ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে ৪২০ কোটি ডলার তোলার লক্ষ্য ছিল বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির।

ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই) প্রস্তাবটি কীভাবে সামনে এল, বিশ্ব ফুটবলে তা গভীর সংকট তৈরি করার পর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে কীভাবে বাতিল হলো, একনজরে দেখে নেওয়া যাক।

সংবাদমাধ্যমে ফাঁস

ফিফার এ পরিকল্পনা ফাঁস করেছিল ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টাইমস’। বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ফিফা গোপনে কোটি কোটি ডলারের একটি প্রাইভেট ইকুইটি চুক্তির চেষ্টা চালাচ্ছে—এ খবর সংবাদমাধ্যমটি ফাঁস করার পর বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনে তুমুল আলোড়ন তৈরি হয়।

ফিফার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা

সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি ফাঁস হওয়ার পর তড়িঘড়ি করে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয় ফিফা। বলা হয়, বিশ্বকাপ, ক্লাব বিশ্বকাপসহ নিজেদের প্রধান ফুটবল আসরগুলো পরিচালনা করতে নতুন একটি কোম্পানির কাছে শেয়ার বিক্রির পরিকল্পনা করেছে ফিফা। মূলত ২১১টি সদস্য সংস্থাকে দেওয়া উন্নয়ন তহবিলের পরিমাণ তিন গুণ করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) নামে নতুন একটি প্রতিষ্ঠান সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো
ইনস্টাগ্রাম/ইফান্তিনো

ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের কাছে ক্ষুদ্র শেয়ার বিক্রি করে’ চলতি বছরের শেষ নাগাদ এফএফইয়ের মাধ্যমে ৪২০ কোটি ডলার তোলাই তাদের লক্ষ্য। প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে সদস্যদেশগুলোকে ২০২৭ সালের শুরুতেই এককালীন ২ কোটি ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, যা ২০৩০ সালে মেয়াদ শেষে মোট ৪ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে।

আরও পড়ুন

ফুটবলের ‘আত্মা’ বিক্রির অভিযোগ

ফিফার ঘোষণার পরই শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। ফিফার বিরুদ্ধে ‘ফুটবলের আত্মা বিক্রি করার চেষ্টার’ অভিযোগ তুলে আইনি ব্যবস্থার হুমকি দেয় উয়েফা। পরিকল্পনাটি নিয়ে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করে উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনক্যাকাফ এবং ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ)। সিদ্ধান্তটি প্রকাশ্যে আনার আগে আলোচনা না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি)।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ক্রীড়াবিষয়ক কমিশনার গ্লেন মিকালিফ। বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থাকে সতর্ক করে মিকালিফ বলেন, ‘আমাদের খেলা নিয়ে ছিনিমিনি খেলবেন না।’

সুইজারল্যান্ডের নিওনে উয়েফার সদরদপ্তর
রয়টার্স

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘ফুটবল কোনো বিনিয়োগকারীদের সম্পদ নয়। ফুটবল তাদেরই, যারা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে সপ্তাহের পর সপ্তাহ গ্যালারি ও মাঠের চারপাশ ভরিয়ে রাখে।’

এসবেরই মধ্যে পরিকল্পনাটি অনুমোদন করতে সদস্যদেশগুলোকে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয় ফিফা।

ফিফার সাফাই ও উয়েফার শক্ত অবস্থান

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এ পরিকল্পনাকে ‘একটি সুযোগ, তবে কোনো বাধ্যবাধকতা নয়’ হিসেবে উল্লেখ করেন। ওদিকে ফিফা যদি তাদের বেসরকারি বিনিয়োগের পরিকল্পনায় অনড় থাকে, তবে বিশ্বকাপ বয়কট করার হুমকি দেয় ইউরোপীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা উয়েফা ও এর ৫৫টি সদস্যদেশ।

ফিফার বিতর্কিত পরিকল্পনাটি পুনর্বিবেচনা করার জন্য নিজেদের সদস্যদেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানায় আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন (সিএএফ)। ফিফার প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে প্রত্যাখ্যান করে কনক্যাকাফের ৪১টি সদস্যদেশ।

‘সবার মতামত সতর্কতার সঙ্গে শোনার পর এটি স্পষ্ট যে প্রকল্পটি এমন এক বিভাজন তৈরি করেছে, যা আমাদের মূল লক্ষ্যের পক্ষে আর সহায়ক নয়...ফলে এ প্রস্তাব আর সামনে এগোবে না।’
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো

পদত্যাগ ও ‘ভুল ব্যক্তি’

সমালোচনার জবাবে ফিফা জানায়, প্রস্তাবিত বেসরকারি বিনিয়োগ পরিকল্পনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে তারা একটি ‘উন্মুক্ত ও গণতান্ত্রিক’ আলোচনা চালিয়ে যাবে। ওদিকে এএফসি বিবৃতিতে জানিয়ে দেয়, ‘ফিফার মূল প্রতিযোগিতাগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগ আনার প্রস্তাব নিয়ে ইউরোপীয় ফুটবলের সংস্থা উয়েফা ও কনক্যাকাফের গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পূর্ণ একাত্মতা প্রকাশ করছে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি)।’

এমন পরিস্থিতির মধ্যে প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগ করেন ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস কর্ডেইরো। তিনি মার্কিন ফুটবল ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি ও গোল্ডম্যান স্যাকসের সাবেক ব্যাংকার। এফএফই প্রকল্পের প্রকাশ্যে সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘এটি ফিফার সদস্যদেশগুলো, ফুটবল এবং দীর্ঘ মেয়াদে ফুটবল খেলার ভবিষ্যতের জন্য একটি খারাপ প্রস্তাব।’

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম মন্তব্য করেন, ফিফার নেতৃত্বের জন্য ইনফান্তিনো ‘ভুল ব্যক্তি’।

আরও পড়ুন

পরিকল্পনা বাতিল

প্রকাশ্য প্রতিবাদে যোগ দিয়ে ফিফার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) কেভিন লামুর গণমাধ্যমকে জানান, এ প্রস্তাব কোনো দাপ্তরিক উদ্যোগ ছিল না; বরং এটি ছিল ‘একক ব্যক্তির প্রজেক্ট’। এতে ফিফার কর্মীরা ‘প্রতারিত বোধ করছেন’ বলেও জানান তিনি।

তীব্র বিরোধিতা এবং আগামী সভাপতি নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক সমর্থন পুরোপুরি হারানোর মুখে দাঁড়িয়ে এরপর পরিকল্পনাটি বাতিলের ঘোষণা দিয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেন ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো।

নতিস্বীকার করে ইনফান্তিনো বলেন, ‘সবার মতামত সতর্কতার সঙ্গে শোনার পর এটি স্পষ্ট যে প্রকল্পটি এমন এক বিভাজন তৈরি করেছে, যা আমাদের মূল লক্ষ্যের পক্ষে আর সহায়ক নয়...ফলে এ প্রস্তাব আর সামনে এগোবে না।’