পেটে খাবার ছিল না, পায়ে ছিল না জুতা, সেই ছেলে আজ রিয়াল মাদ্রিদের তারকা

ইয়ান দিওমান্দেরয়টার্স

পুরোনো কাপড়, ছেঁড়া মোজা কিংবা ন্যাকড়া পেঁচিয়ে বানানো ফুটবল। কখনো ভাগ্য ভালো থাকলে জুটত প্লাস্টিকের বল। আরও বেশি ভাগ্যবান হলে পুরোনো চামড়ার একটা ফুটবল।

আইভরিকোস্টের আবিদজান শহরের ইয়োপুগন এলাকার সিকোজি মহল্লায় এভাবেই ফুটবল খেলত একদল শিশু। পায়ের নিচে কখনো মাটি, কখনো সিমেন্টের রাস্তা। আশপাশে মানুষের ভিড়। সেই ভিড় বাঁচিয়ে বল নিয়ে ছুটে চলা। পায়ে জুতা নেই। থাকলেও স্যান্ডেল। সেই শিশুদের একজনের নাম ইয়ান দিওমান্দে।

যে মহল্লায় তিন বেলা খাবার জোটানোই স্বপ্ন, সেখানে ফুটবল বুট তো রাজকীয় বিলাসিতা! অথচ ওই ছেলেটার স্বপ্ন ছিল রাজকীয়ই। একদিন আফ্রিকার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো হবে সে। স্বপ্নটা যে একদিন সত্যি হওয়ার পথে এত দূর এগোবে, কে জানত! দিওমান্দে এখন রিয়াল মাদ্রিদের ফুটবলার। যে পায়ে একদিন জুতাও ছিল না, সেই পায়ে এখন ইউরোপীয় ফুটবলের সবচেয়ে অভিজাত ক্লাবের স্বপ্ন। যেন রূপকথার কোনো গল্প!

কিন্তু রূপকথার শুরুটা মোটেও সুন্দর ছিল না। কাজের সন্ধানে বাবা চলে গিয়েছিলেন ফ্রান্সে। মা আর বোন রোকসানের কাছে বেড়ে ওঠা দিওমান্দের। অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। আনন্দ বলতে ফুটবল। আর সেই ফুটবলে ছোটবেলা থেকেই ছেলেটা অন্য রকম।

ড্রিবলিংয়ে অবিশ্বাস্য দক্ষতা। শটে প্রচণ্ড শক্তি। পাড়ার লোকজন তাই নাম দিয়েছিল ‘রবার্তো কার্লোস’। ব্রাজিলের সেই বিখ্যাত বাঁ পায়ের ফুটবলারের নামে। একদিন রাস্তার ফুটবলে বদলে গেল জীবন।

দেজ বাম্বা নামের এক ব্যবসায়ী ও ফুটবল প্রতিভা অন্বেষকের চোখে পড়ল ছেলেটা। বাম্বা তাঁকে নিয়ে গেলেন নিজের প্রতিষ্ঠিত এএফআই সুদ কোমোয়ে একাডেমিতে। আবিদজান থেকে ১০০ কিলোমিটার পূর্বে আসুবার সেই একাডেমিতে ২০১৪ সালে পৌঁছাল ১০ বছরের দিওমান্দে। সেখানে আরও ৪০ জন প্রতিভাবান শিশু। অনেকের জীবনেই প্রথমবার স্কুলে যাওয়ার সুযোগ। দিনে তিন বেলা, কখনো চার বেলা খাবার! দিওমান্দের কাছে যেন স্বর্গ।

এল ক্লাসিকোয় লামিনে ইয়ামালের সঙ্গে বল দখলের লড়াইয়ে ইয়ান দিওমান্দে
রয়টার্স

একাডেমির দায়িত্বে ছিলেন স্প্যানিশ কোচ হোসে হুলিয়ান লোপেস। এখন স্পেনের ভালদেমোরো ফুটবল একাডেমির সমন্বয়ক। তাঁর স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল সেই ছোট্ট ছেলেটা। লোপেসের ভাষায়, ‘প্রথম দেখাতেই বুঝেছিলাম, বল পায়ে ছেলেটা বিশেষ কিছু। ড্রিবলিং করত, ডিফেন্ডারদের চ্যালেঞ্জ জানাত, ভেতরে ঢুকে পড়ত। অসম্ভব সাহসী ছিল।’ এতটাই প্রতিভাবান যে অনূর্ধ্ব-১২ থেকে সরাসরি অনূর্ধ্ব-১৪ দলে তুলে নেওয়া হয়।

সমস্যা ছিল একটাই। বল পেলে থামতে চাইত না দিওমান্দে। নিজেদের গোলপোস্টের কাছ থেকে ড্রিবলিং শুরু করে পাঁচ-ছয়জন বড় ফুটবলারকে কাটিয়ে প্রতিপক্ষের গোলপোস্টে পৌঁছে যেত। কখনো গোল, কখনো বল হারানো। লোপেসের প্রথম কাজ ছিল তাঁকে থামতে শেখানো। কখন ড্রিবলিং করতে হবে, কখন পাস দিতে হবে, সেটা বোঝানো। ছেলেটা শিখতও অবিশ্বাস্য দ্রুততায়। লোপেস বলেন, ‘কোনো কিছু বোঝানোর সময় ও যেভাবে আমার দিকে তাকিয়ে থাকত, এখনো মনে আছে। শুধু কী করতে হবে, তা নয়, কেন করতে হবে, সেটাও বুঝতে চাইত।’

শুধু মাঠে নয়, পড়াশোনাতেও মেধাবী। একাডেমিতে আসা ৮০ শতাংশ শিশুই পড়তে বা লিখতে জানত না। তাদের শিক্ষার ব্যবস্থাও ছিল সেখানে। দিওমান্দে দুই জায়গাতেই এগিয়ে। আর ফুটবল? লোপেসের স্মৃতিচারণা, ‘ড্রিবলিং আর শুটিং ছিল জন্মগত। আমরা ওকে প্রথম বুটজোড়া দিলাম। তারপর যেন উড়তে শুরু করল! অন্য ছেলেরা শট নিয়ে গোলপোস্টের কাছেও পৌঁছাতে পারত না। আর ও কর্নার নিত অবিশ্বাস্য দক্ষতায়।’

সর্বশেষ দলবদল উইন্ডোয় রিয়াল মাদ্রিদ তাঁকে লাইপজিগ থেকে ১২ কোটি ৫০ লাখ ইউরোয় কিনেছে। আফ্রিকার ইতিহাসের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় এখন দিওমান্দে।

বয়সে পাঁচ বছরের বড় ছেলেদের বিপক্ষেও ভয় পেত না। নিয়মিত লিগ না থাকায় একাডেমি প্রীতি ম্যাচ খেলত বিভিন্ন দলের সঙ্গে। সেখানে মূলত ডান উইংয়ে খেলত দিওমান্দে। ডিফেন্ডারদের জন্য ছিল মূর্তিমান আতঙ্ক। বাঁ উইংয়ে খেলা শুরু আরও পরে। আফ্রিকান ট্যালেন্ট এলিট একাডেমির পরিচালক ফ্রান কাস্তানিয়ো প্রথম তাঁকে দেখেন অনূর্ধ্ব-১৭ আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের বাছাই টুর্নামেন্টে। বয়স তখন মাত্র ১৫। কাস্তানিয়োর স্মৃতিতে, ‘প্রথম মুহূর্তেই নজর কেড়েছিল। দুই উইংয়ে খেলতে পারত। গতি, শক্তি, দক্ষতা, গোল করার ক্ষমতা, সবই ছিল। টুর্নামেন্টে বেশ কয়েকটি গোলও করেছিল। বাকিদের চেয়ে পরিষ্কারভাবে এগিয়ে ছিল।’

এমন প্রতিভার গন্তব্য ইউরোপই হওয়ার কথা। কিন্তু বাধা ফিফার নিয়ম। ১৮ বছরের আগে ইউরোপে গিয়ে খেলার সুযোগ নেই। ১৬ বছরে চুক্তি করা গেলেও খেলা যায় না। তাই দিওমান্দেকে যেতে হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায়। অথচ তাঁর একাডেমি বছরে দুবার স্পেনে টুর্নামেন্ট খেলতে যেত। দিওমান্দেকে দেখে মুগ্ধ হলেও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে বিনিয়োগের সাহস করেনি কেউ। সেই ছেলেই শেষ পর্যন্ত পৌঁছে গেল রিয়াল মাদ্রিদে।

ইয়ান দিওমান্দে
রয়টার্স

সর্বশেষ দলবদল উইন্ডোয় রিয়াল মাদ্রিদ তাঁকে লাইপজিগ থেকে ১২ কোটি ৫০ লাখ ইউরোয় কিনেছে। আফ্রিকার ইতিহাসের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় এখন দিওমান্দে। শুরুটা ছিল মন্থর। রিয়ালের জার্সিতে প্রথম গোল ১০ অক্টোবর, ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে।

ওই গোলে ১-০ ব্যবধানে জেতে দল। এরপর ছন্দ পেয়েছেন দ্রুত। লা লিগায় সেভিয়ার বিপক্ষে ৪-১ ব্যবধানের জয়ে একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট। চ্যাম্পিয়নস লিগে সাবেক ক্লাব লাইপজিগের বিপক্ষে ৪-১ ব্যবধানের জয়ে বদলি নেমে কিলিয়ান এমবাপ্পেকে দিয়েছেন অ্যাসিস্ট, আবার নিজে করেছেন দলের চতুর্থ গোলটিও। সব মিলিয়ে রিয়ালের জার্সিতে এই মৌসুমে ১৩ ম্যাচে খেলেছেন ৬৫৬ মিনিট। ৩ গোল, ৪ অ্যাসিস্ট। লা লিগায় শুরুর একাদশে পাঁচ ম্যাচ খেলেছেন, পাঁচটিতেই জিতেছে রিয়াল। তাই কোচ হোসে মরিনিওর ‘পয়মন্ত’ হিসেবেও আলোচনায় এসেছেন।

আইভরিকোস্টে এখন উৎসব! দেশটির বাস্কেটবল দলের স্প্যানিশ কোচ মিগেল আনহেল ওইয়ো আবিদজান থেকে স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এএসকে বলেছেন, ‘এখানে সবাই শুধু দিওমান্দেকে নিয়েই কথা বলছে। চরম দারিদ্র্য থেকে প্রতিভা, পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ে যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানো যায়, ও তার প্রমাণ।’

এখন দিওমান্দে সেই ভালোবাসাকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন। দেশটির মানুষের কাছে তাঁর নাম উঠে আসছে দ্রগবা ও ইয়াইয়া তোরের মতো কিংবদন্তিদের পাশে।

দেশটির রাস্তায় এমনিতেই রিয়াল মাদ্রিদের সাদা আর বার্সেলোনার নীল-মেরুন জার্সি পরিচিত দৃশ্য। এখন সাদার আধিপত্য বাড়ছে। ওইয়োর কথায়, ‘পুরো দেশ যেন সাদা হয়ে যাচ্ছে।’

স্পোর্ট আইভরির সাংবাদিক কাদের গিলাভোগির মতে, এই উন্মাদনার পেছনে ইতিহাসও আছে। ২০০৯ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ সেমিফাইনালে চেলসি ও বার্সেলোনার বিতর্কিত ম্যাচের পর দিদিয়ের দ্রগবার প্রতি সমর্থন থেকে অনেক আইভরিয়ান বার্সেলোনার বিপক্ষে চলে যান। জোসে মরিনিওর জনপ্রিয়তাও রিয়ালের প্রতি আকর্ষণ বাড়িয়েছে।

এখন দিওমান্দে সেই ভালোবাসাকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন। দেশটির মানুষের কাছে তাঁর নাম উঠে আসছে দ্রগবা ও ইয়াইয়া তোরের মতো কিংবদন্তিদের পাশে। গিলাভোগি বলছেন, শুরুর মানিয়ে নেওয়ার সমস্যা কাটিয়ে দিওমান্দে এখন নিজের সামর্থ্য দেখাচ্ছেন। দেশের তরুণদের জন্য হয়ে উঠেছেন উদাহরণ।

এমবাপ্পের সঙ্গে দিওমান্দে
রয়টার্স

অথচ এই খ্যাতির মধ্যেও শিকড় ভোলেননি দিওমান্দে। পরিবার ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের দারিদ্র্য থেকে বের করে এনেছেন। নিয়মিত অর্থ পাঠান নিজের পুরোনো মহল্লায়। সেই সিকোজিতে, যেখানে একদিন ন্যাকড়ার ফুটবল নিয়ে দৌড়াতেন। তাঁর এই পথচলার সবচেয়ে বড় প্রেরণা ছিলেন বোন রোকসান। সেই প্রিয় বোন আর বেঁচে নেই। আফ্রিকার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো হওয়ার স্বপ্নটা দেখেছিলেন তাঁরই উৎসাহে।

লোপেসের একাডেমির ১১ জন এখন ইউরোপে খেলেন। ২০ জনের বেশি আইভরিকোস্টের প্রথম বিভাগে। কিন্তু দিওমান্দের গল্পটা তাঁর কাছে আলাদা। কেন আলাদা? একাডেমির ছেলেদের কাছে একবার জানতে চেয়েছিলেন লোপেস, সেখানে থাকার সবচেয়ে বড় আনন্দ কী? উত্তর এসেছিল, ‘প্রতিদিন খেতে পারা।’ সেই শিশুদেরই একজন আজ রিয়াল মাদ্রিদে।

ফুটবল কখনো কখনো শুধু জীবন বদলায় না। একটা শিশুকে আকাশের ঠিকানাও দিয়ে দেয়।