পর্তুগাল দল ছেড়ে যাওয়ায় কি শাস্তি পেয়েছেন রোনালদো, না পেলে আইন কী বলে

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোএএফপি

উয়েফা নেশনস লিগে জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে চলে যাওয়ায় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে শাস্তির মুখে পড়তে পারেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। পর্তুগিজ সংবাদমাধ্যম ‘এ বোয়া’কে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন দেশটির আইনজীবী গনসালো আলমেইদা।

পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের (এফপিএফ) শৃঙ্খলা বিধিমালার ১৬০ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কোনো খেলোয়াড় যদি ‘নিয়মিতভাবে ডাক পাওয়ার পরও জাতীয় দল, ম্যাচ, এফপিএফ বা পর্তুগালের ক্রীড়া প্রতিনিধিত্ব–সংক্রান্ত কোনো কার্যক্রমে বিনা কারণে অনুপস্থিত থাকেন কিংবা ত্যাগ করেন, তবে ১ থেকে ৬ মাসের নিষেধাজ্ঞায় পড়বেন। পেশাদার খেলোয়াড় হলে ৫১০ থেকে ১,০২০ ইউরো জরিমানাও গুনতে হবে।’

গনসালো এ ধারার ব্যাখ্যায় বলেন, ‘তার (রোনালদো) শাস্তি এড়ানোর কোনো উপায় আছে বলে মনে হয় না।’ ধারাটির প্রথম অনুচ্ছেদে শাস্তি বিধানের বিষয়টি ‘সুস্পষ্ট’ বলা হয়েছে। গনসালো মনে করেন, ‘অনুপস্থিতি বা দলত্যাগ খেলোয়াড়ের ওপর স্বয়ংক্রিয় সতর্কতামূলক নিষেধাজ্ঞা ডেকে আনে।’

গনসালো ফিফা ফুটবল ট্রাইব্যুনালের বিচারকও। তাঁর মতে, এর মাধ্যমে রোনালদো ‘জাতীয় দলে খেলা বা দলটির প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষেত্রে এরই মধ্যে নিষিদ্ধ হয়েছেন।’

শাস্তির প্রক্রিয়া ব্যাখ্যায় গনসালো বলেন, ‘ফেডারেশনের ডিসিপ্লিনারি কাউন্সিলের মাধ্যমে একটি প্রক্রিয়া শুরু হবে। সেখানে ন্যায়বিচার নিশ্চিতের নীতি মেনে ক্রিস্টিয়ানোকে তার মতামত জানানোর জন্য নোটিশ দেওয়া হবে এবং এরপর এমন একটি সিদ্ধান্ত আসবে, যা আমার বিশ্বাস বেশ দ্রুতই নেওয়া হবে।’ গনসালো আরও জানান, পর্তুগাল দলের অধিনায়ক সাক্ষীদের তলব করতে পারেন। এফপিএফের শৃঙ্খলা কাউন্সিল আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই কাজ করতে পারে; কারণ, ‘ঘটনাগুলো সবার জানা।’

কোচের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে যান রোনালদো
রয়টার্স

সর্বশেষ আন্তর্জাতিক বিরতিতে উয়েফা নেশনস লিগে নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে বদলি হিসেবে বেঞ্চে বসে থাকার পর ডেনমার্কের বিপক্ষেও একাদশে থাকবেন না জানতে পেরে জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে যান রোনালদো। ডেনমার্ক ম্যাচের আগের দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের এই সিদ্ধান্ত জানান ৪১ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড। মাঝে অনেক জল ঘোলা হওয়ার পর গত মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই গান রোনালদো। এই প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি অবশ্য রোনালদোর অনুকূলেই কাজ করবে।

আরও পড়ুন

এফপিএফের শৃঙ্খলা বিধিমালার ২৪৪ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘অভিযুক্ত ব্যক্তি যেকোনো সময় কার্যধারার বিষয়বস্তু হওয়া ঘটনাগুলোর বিষয়ে স্বীকারোক্তি দিতে পারেন’ এবং ‘যদি স্বীকারোক্তিটি পূর্ণাঙ্গ ও শর্তহীন হয় এবং এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে কোনো সন্দেহ না জাগায়, তবে আর কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের প্রক্রিয়া চালানো হবে না এবং প্রযোজ্য শাস্তির সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ সীমা অর্ধেকে নামিয়ে আনা হবে।’ গনসালো জোর দিয়ে বলেন, পর্তুগিজ ফরোয়ার্ড এ বিষয়ে নিজের পোস্টগুলোতে ‘দল ছেড়ে যাওয়ার কথা নিঃশর্তে ও পুরোপুরি স্বীকার করেছেন।’

পর্তুগাল কোচ জর্জ জেসুস
রয়টার্স

গনসালোর মতে, ‘ডিসিপ্লিনারি কাউন্সিল যদি তেমন সিদ্ধান্ত নেয়’ তবে শাস্তি অর্ধেক কমিয়ে আনা হবে। রোনালদোর ‘সবচেয়ে অনুকূল পরিস্থিতিতে’ এক মাসের সর্বনিম্ন সাজা ও ৫১০ ইউরো জরিমানা কমে ১৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা এবং ২৫৫ ইউরো জরিমানা হতে পারে বলেন মনে করেন গনসালো।

পরবর্তী ফিফা আন্তর্জাতিক বিরতিতে আগামী ১৪ নভেম্বর ডেনমার্কের মুখোমুখি হবে পর্তুগাল। এর তিন দিন পর যাবে ওয়েলসে। স্বয়ংক্রিয় নিষেধাজ্ঞার সময়কাল যদি ডিসিপ্লিনারি কাউন্সিলের দেওয়া শাস্তি থেকে কেটে নেওয়া হয়, তবে আগামী আন্তর্জাতিক বিরতিতে রোনালদোকে পাওয়ার একটা সম্ভাবনা থেকেই যায় পর্তুগালের। দলটির কোচ জর্জ জেসুসও বলেছেন, রোনালদো চাইলে জাতীয় দলে ফিরতে পারেন। এ ছাড়া রোনালদোও ইনস্টাগ্রামে বিবৃতিতে ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার জন্য নিজের ভুল স্বীকার করেন।

আরও পড়ুন

জেসুসের বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ তুলে জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে যান রোনালদো। এখন শাস্তির বিষয়টি নির্ভর করছে ডিসিপ্লিনারি কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ের ওপর। গনসালো বলেন, ‘ক্রিস্টিয়ানোর ফেরাটা যদি নিশ্চিত করতে হয়, তবে তাকে দীর্ঘ সময়ের জন্য নিষিদ্ধ রাখা ডিসিপ্লিনারি কাউন্সিল কিংবা ফেডারেশন—কারোরই স্বার্থের অনুকূলে নয়।’

গত মঙ্গলবারের বিবৃতিতে শাস্তি ভোগের বিষয়ে নিজের পূর্ণ সদিচ্ছা জানান রোনালদো। জোর দিয়ে বলেন, ‘আমি মনে করি, শাস্তি লঘু করা উচিত নয়। আমি সাধারণ কোনো খেলোয়াড় নই, আমি দলের অধিনায়ক এবং সেটাই একটি বড় দিক। আমি ইতিমধ্যে ক্ষমা চেয়েছি, তবে আমি জানি যে কাজের ফল ভোগ করতেই হবে।’

জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে আল নাসরে ফিরে গতকাল রাতে দলের জয়ে গোলও পান রোনালদো
এএফপি

গনসালো মনে করেন, রোনালদোর অধিনায়কত্ব এ বিষয়ে ‘গুরুতর দিক’। তবে গনসালো জোর দিয়ে বলেন, গত ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে জাতীয় দলের জন্য ‘সবকিছু উজাড় করে দেওয়া’ কিংবদন্তির ‘অতীতে শৃঙ্খলাভঙ্গের রেকর্ড নেই।’

এফপিএফের শৃঙ্খলা বিধিমালার ৪৪ নম্বর ধারার প্রথম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘এফপিএফে নিবন্ধিত হওয়ার মৌসুমে এবং তার আগের তিন মৌসুমে শৃঙ্খলাভঙ্গের কোনো রেকর্ড না থাকা’, ‘ফুটবলে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা’ এবং ‘ক্রীড়াসুলভ অর্জনের জন্য প্রশংসা পাওয়া’—এগুলো বিচার্য বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়।

গনসালোর মতে, ‘সুনির্দিষ্ট বিচারিক নজির’ না থাকায় বিষয়টিতে আলাদাভাবে প্রতিটি ঘটনা ধরে বিশ্লেষণ করতে হবে। আর এ কারণেই ২০১১ সালে জাতীয় দলের অনুশীলন শিবির ছেড়ে চলে যাওয়ার দায়ে রিকার্দো কারভালহোকে জাতীয় দলের সব ধরনের কার্যক্রম থেকে এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ করার ঘটনাটিকে এ বিষয়ে খুব একটা বড় করে দেখছেন না গনসালো।