ম্যারাডোনার সেই ‘পাম’ আর ‘টাক’-এর অপেক্ষায় কেইন

২০১৭ সালে ওয়েম্বলিতে সেই ম্যারাডোনা–মুহূর্তটটেনহাম

ওয়েম্বলি তখন টটেনহামের অস্থায়ী ঘর। প্রিমিয়ার লিগে সেদিন তাদের ম্যাচ ছিল লিভারপুলের বিপক্ষে। ২০১৭ সালের ২২ অক্টোবর। কিন্তু ম্যাচের ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে সাজঘরে বড় এক রোমাঞ্চ ডানা মেলছিল। ক্লাবের স্টাফরা জানতে পেরেছেন, গ্যালারিতে আজ বসবেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বর্ণিল ও বোহেমিয়ান রাজপুত্র—ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা।

আর্জেন্টিনার মহানায়ক তখন ফিফা দ্য বেস্ট অ্যাওয়ার্ডসের জন্য লন্ডনে। টটেনহামের আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি ও ক্লাব অ্যাম্বাসেডর ওসি আর্দিলেস সুযোগটা হাতছাড়া করেননি। তিনি ম্যারাডোনাকে আমন্ত্রণ জানান টটেনহামের ডাগআউটে থাকা তাঁরই একসময়ের অনুজের সঙ্গে দেখা করতে। একসময়ের রুমমেটও। তিনি মরিসিও পচেত্তিনো।

১৯৯৩ সালে নিউয়েলস ওল্ড বয়েজে যখন ম্যারাডোনা-উপন্যাসের শেষ অধ্যায় আর পচেত্তিনোর গল্পের ভূমিকা লেখা হচ্ছে, তখন তাঁরা ছিলেন রুমমেট। নিউয়েলসে যোগ দেওয়ার পর পচেত্তিনো যখন লাজুক পায়ে নিজের পরিচয় দিতে গিয়েছিলেন, ম্যারাডোনা তখন নাকি হেসে বলেছিলেন, ‘আমি জানি তুমি কে!’ কী এক ঘোর! তারপর পচেত্তিনো যখন টটেনহামের ডাগআউটে, তখনো ম্যারাডোনা তাঁকে মাঝেমধ্যে ভয়েস নোট পাঠাতেন। সেই খুদে বার্তা পচেত্তিনো আশপাশের সবাইকে শোনাতেন এক পরম গৌরবে, ‘শোনো শোনো, কে পাঠিয়েছে দেখো!’ ম্যারাডোনাকে নিয়ে পচেত্তিনোর সেই উল্লাস আর মুগ্ধতা কখনো এক বিন্দু কমেনি।

স্মৃতির সরণি বেয়ে সেই ম্যারাডোনা যখন পচেত্তিনোর অফিসে এলেন, টটেনহাম কোচের চোখে তখনো শিশুর বিস্ময়। পুরোনো দিনের গল্পে আড্ডার পর পচেত্তিনো জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমার দলের অধিনায়ক আর সহ-অধিনায়কের সঙ্গে দেখা করবে?’ ম্যারাডোনা সানন্দে রাজি হলেন। তবে ম্যাচের আগে পুরো দলের মনোযোগ নষ্ট করতে চাননি বলে তিনি ড্রেসিংরুমে যাননি। বরং সাজঘরের পেছনের দরজা দিয়ে ডেকে আনা হলো টটেনহামের তৎকালীন অধিনায়ক হুগো লরিস এবং সহ-অধিনায়ক হ্যারি কেইনকে।

হ্যারি কেইনের ছবিযুক্ত কার্ড
রয়টার্স

ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দী সেই মুহূর্তটি ছিল দেখার মতো। চব্বিশ বছরের তরুণ হ্যারি কেইন কিছুটা আড়ষ্ট। হঠাৎ সামনে ম্যারাডোনাকে দেখে যেন অপ্রস্তুত। ম্যারাডোনা দুজনকে জড়িয়ে ধরলেন। কেইনকে দেখে তাঁর চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। চিরচেনা স্প্যানিশ টানে বলে উঠলেন, ‘গলেয়াদর!’ (গোলদাতা!)

পচেত্তিনো হাসিমুখে আর্দিলেসকে বললেন অনুবাদ করে দিতে। ম্যারাডোনা রসিকতা করে লরিস আর কেইনকে দেখিয়ে বললেন, ‘তাহলে ওরাই দলের মেরুদণ্ড! ও গোল বাঁচায়, আর ও গোল করে।’

কথা শেষ। বিদায় নেওয়ার মুহূর্ত। ঠিক তখনই ঘটল সেই অবিস্মরণীয় ঘটনা। ম্যারাডোনা হ্যারি কেইনের ডান হাতটি নিজের বাঁ হাতে শক্ত করে চেপে ধরলেন। ছাড়লেন না। তারপর হাত নেড়ে কেইনকে বললেন, ‘সব গোল ওদিকে (দূরের পোস্টে) কোরো না। কিছু গোল করো এদিকে (কাছের পোস্টে)।’ নিজের হাত দিয়ে শূন্যে বলের গতিপথ এঁকে দিলেন। তারপর শরীরটা কিছুটা ঝুঁকিয়ে, মুখের একটা অদ্ভুত ভঙ্গি করে ম্যারাডোনা এক চরম বিস্ময়ের অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুললেন, ‘এএএ পাম...!’ (আর ব্যস, গোল!)

২০২০ সালের এক বিষাদমাখা নভেম্বরে ম্যারাডোনা পাড়ি জমিয়েছেন না-ফেরার দেশে। তিনি আজ নেই। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া সেই ছোট্ট পরামর্শ হয়তো আজও বেঁচে আছে কেইনের অবচেতনে।

তারপর সেই বিখ্যাত অট্টহাসি। চোখ টিপে বললেন, ‘কারণ গোলকিপাররা আজকাল সারাক্ষণ টেলিভিশনে তোমার খেলা দেখে। তারা জানে তুমি কোথায় মারবে। তাই একটু ছলনা করো। জাস্ট ডু ইট লাইক দিস... টাক!’

সেই অক্টোবরের বিকেলে ওয়েম্বলিতে লিভারপুলের জালে দুটি গোল করেছিলেন হ্যারি কেইন। টটেনহাম জিতেছিল ৪-১ ব্যবধানে। কিন্তু ম্যারাডোনার শেখানো সেই ‘টাক’ কিংবা ‘পাম’-এর ছলাকলা সেদিন দেখাতে হয়নি কেইনকে। দুটি গোলই করেছিলেন দূরের পোস্টে।

আজ ঘড়ির কাঁটা বাংলাদেশ সময় রাত একটায় বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ম্যারাডোনার দেশ আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খেলতে নামবে কেইনের ইংল্যান্ড। ২০২০ সালের এক বিষাদমাখা নভেম্বরে ম্যারাডোনা পাড়ি জমিয়েছেন না-ফেরার দেশে। তিনি আজ নেই। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া সেই ছোট্ট পরামর্শ হয়তো আজও বেঁচে আছে কেইনের অবচেতনে। যে দেশের আকাশ-বাতাস এখনো ম্যারাডোনার স্মৃতিতে ভারী, যাদের ডিফেন্সকে আজ চূর্ণ করতে চাইবেন কেইন, সেই দেশেরই ফুটবল-ঈশ্বর তাঁকে দিয়েছিলেন গোল করার মহৌষধ।

এবারের বিশ্বকাপে সেমির আগপর্যন্ত ৬ গোল করেছেন হ্যারি কেইন
রয়টার্স

বিশ্লেষণ বলছে, আর্জেন্টিনার ডিফেন্সে কিছু ফাঁক আছে। বিশেষ করে সেন্টারব্যাকদের পেছনের জায়গা। কিংবা ফুলব্যাকদের ওঠানামার মাঝে তৈরি হওয়া ফাঁকা অঞ্চল। এই জায়গাগুলোতেই কেইনের মতো স্ট্রাইকাররা সুযোগ খোঁজেন। সে রকম সুযোগ পেলে কী করবেন কেইন? গোলপোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে কি আজ পুরোনো অভ্যাস ভাঙবেন? যখন গোলকিপার তাঁর নড়াচড়া দেখে ধরে নেবে, বল যাবে দূরের কোণে, ঠিক তখনই কি তিনি ‘টাক’ করে কাছের পোস্টে মারবেন?

যদি করেন, সেটাই হবে এক অদ্ভুত প্রতিধ্বনি। ম্যারাডোনার। যিনি অনেক আগেই ইংলিশ স্ট্রাইকারের কানে কানে বলে গিয়েছিলেন স্ট্রাইকারদের সফল হওয়ার এক চিরন্তন মন্ত্র—চমকে দেওয়া কিছু করো।

আজকের রাতটা কেইনের পরীক্ষার মঞ্চ। হয়তো কেইন গোল করবেন। হয়তো করবেন না। কিন্তু যদি কোনো এক মুহূর্তে তিনি হঠাৎ করে শটটা ঘুরিয়ে দেন—দূরের বদলে কাছে, পূর্বানুমানের বদলে বিস্ময়ে—তাহলে গ্যালারির হাজারো চোখের ভিড়ে অদৃশ্য কোথাও হয়তো হাসবেন একজন।

ম্যারাডোনা।

আরও পড়ুন