ইংল্যান্ড কেন কখনো মেসির মুখোমুখি হয়নি
ইংলিশ ক্লাবগুলোর বিপক্ষে লিওনেল মেসির রেকর্ড রীতিমতো ভয় ধরানোর মতো। এর মধ্যে ২০১০ সালের একটি ম্যাচ সম্ভবত সবচেয়ে বেশি স্মরণীয়।
বার্সেলোনায় সেই রাতে অবিশ্বাস্য জাদুকরি পারফরম্যান্স দেখান মেসি। চ্যাম্পিয়নস লিগে আর্সেনালের মৌসুম গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন প্রায় একাই। আর্সেনালের বিপক্ষে কাতালান ক্লাবটির ৪-১ গোলের জয়ে সব কটি গোলই করেন মেসি।
ম্যাচ শেষে হতবাক আর্সেনালের তৎকালীন কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গার মেসিকে ‘প্লে স্টেশন’–এর চরিত্রের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। ওয়েঙ্গার বলেছিলেন, ‘আপনার সব ভুলেরই ফায়দা তুলতে পারে সে।’
গত ১৫ বছর ও ৩৫ ম্যাচ মিলিয়ে ইংলিশ ক্লাবগুলোর বিপক্ষে ২৭ গোল করেছেন মেসি। অথচ বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এবারই প্রথম বিশ্বকাপের মঞ্চে ইংল্যান্ড জাতীয় দলের মুখোমুখি হবেন মেসি।
এত দিন দুই পক্ষের মুখোমুখি না হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। ২০০৫ সালে জেনেভায় ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা সর্বশেষ প্রীতি ম্যাচে কিশোর মেসিকে দলের বাইরে ছিলেন নিষেধাজ্ঞার কারণে। তার ঠিক তিন মাস আগে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেকের মাত্র ৪৭ সেকেন্ডের মাথায় লাল কার্ড পেয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল মেসিকে।
সেই ম্যাচে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে নিজের ট্রেডমার্ক ড্রিবলিংয়ে হাঙ্গেরির ভিলমোস ভানজাককে কাটিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন মেসি। কিন্তু প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারের বাধা এড়াতে কনুইয়ের গুঁতো মেরে বসেন। সেটা ফাউল ছিল রেফারির চোখে। এর ফলে জেনেভায় সেই প্রীতি ম্যাচে মেসির আর খেলা হয়নি, যেটিতে ইংল্যান্ড ৩-২ গোলে জেতে।
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচ মানেই অন্য রকম এক রোমাঞ্চ। ১৯৮৬ সালের সেই বিখ্যাত ম্যাচ তো বটেই, ১৯৬৬, ১৯৯৮ ও ২০০২ সালের বিশ্বকাপেও দল দুটি একে অপরের মুখোমুখি হয়েছিল। তবে ২০০২ বিশ্বকাপে ‘এফ’ গ্রুপের ম্যাচে ডেভিড বেকহামের পেনাল্টি গোলে ইংল্যান্ড জেতার পর আর কখনোই মুখোমুখি হয়নি এ দুই পরাশক্তি।
এই দীর্ঘ বিরতির পেছনে কিছু কারণ রয়েছে বলে চলতি সপ্তাহে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এফএ) শীর্ষ কর্মকর্তারা ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমসকে জানান। এর মধ্যে অন্যতম আন্তর্জাতিক ফুটবল সূচির পরিবর্তন এবং উয়েফা নেশনস লিগ চালু হওয়া। পাশাপাশি আর্জেন্টিনা সাধারণত নিজেদের মহাদেশের দলগুলোর বিপক্ষে খেলতেই বেশি পছন্দ করে। প্রীতি ম্যাচের ক্ষেত্রে তারা মধ্যপ্রাচ্য কিংবা উত্তর আমেরিকার মতো অর্থনৈতিকভাবে বেশি লাভজনক অঞ্চলের ওপরই জোর দেয়।
এফএ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দ্য টাইমসের সংক্ষিপ্ত আলাপচারিতায় জানা গেছে, মেসি ও তাঁর দলের বিপক্ষে একটি ম্যাচ আয়োজনে যে বিশাল খরচ, সেটি বড় কোনো সমস্যা না হলেও খরচটা যে আকাশচুম্বী, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশেষ করে আর্জেন্টিনার ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) এখন বাণিজ্যিকভাবে বিশ্বের অন্যতম লাভজনক ফুটবল ফেডারেশন।
স্পনসরশিপ থেকেই আর্জেন্টিনা দলের বছরে আয় হয় ৮ কোটি ডলারের (প্রায় ৯৮৯ কোটি টাকা) বেশি। আর একেকটি প্রীতি ম্যাচের জন্য তারা ফি নেয় ৩০ থেকে ৪০ লাখ ডলার। যদিও এই চুক্তিতে মেসির জন্য আলাদা কোনো ফি উল্লেখ থাকে না, তবে দলে তাঁর উপস্থিতির কারণেই প্রতিপক্ষ দলগুলোর কাছ থেকে চড়া মূল্য আদায় করা হয়।
চলতি বছর মার্চে মায়ামির এক আদালতে একটি নথি থেকে এমন চড়া মূল্যের সত্যতা মেলে। ভেনেজুয়েলা ও পুয়ের্তো রিকোর বিপক্ষে সাতটি প্রদর্শনী ম্যাচের একটিতে চুক্তির শর্তভঙ্গের দায়ে মেসি ও এএফএর বিরুদ্ধে চুক্তিভঙ্গের মামলা করা হয়। মামলায় অভিযোগ করা হয়, ম্যাচে মেসির অন্তত ৩০ মিনিট খেলার কথা ছিল। কিন্তু পরদিন ইন্টার মায়ামির একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ থাকায় তিনি ভেনেজুয়েলার বিপক্ষে ম্যাচটি খেলেননি।
মামলাটি এখনো চলমান। তবে এএফএ তাদের কোনো ‘ভুল ছিল না’ দাবি করে জানিয়েছে, ‘গত অক্টোবরে অনুষ্ঠিত দুটি প্রীতি ম্যাচেই জাতীয় দলকে মাঠে নামানোসহ আমরা চুক্তির সব শর্ত যথাযথভাবে পূরণ করেছি।’
দ্য টাইমস জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহেই আর্জেন্টাইন ফুটবলের এমন কিছু নতুন তথ্য সামনে এসেছে, যা দেখলে অন্য যেকোনো ফুটবল ফেডারেশন তাদের সঙ্গে চুক্তি করার আগে দুবার ভাববে।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, সম্ভাব্য জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে এএফএর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে এফবিআই। ‘ওয়াশিংটন ও মায়ামির তদন্তের সঙ্গে যুক্ত দুই আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তা’র বরাত দিয়ে মায়ামি হেরাল্ড জানিয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যাংক লেনদেনে কোটি কোটি ডলারের’ সূত্র ধরে এই তদন্ত চালানো হচ্ছে।
মায়ামি হেরাল্ড জানিয়েছে, মূল খবরটি প্রথম প্রকাশ করেছিল আর্জেন্টিনার সংবাদপত্র লা নাসিওন। সেখানে অভিযোগ করা হয়েছে, এএফএ দক্ষিণ ফ্লোরিডাসহ অন্যান্য অঞ্চলের ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানে ৩০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ পাচার করেছে। ফেডারেশনের বিদেশি বাণিজ্যিক চুক্তিগুলো দেখভাল করা ফ্লোরিডাভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এএফএর সম্পর্কের বিষয়টি এখন এফবিআইয়ের নজরে।
এ বিষয়ে এএফএর একজন মুখপাত্র বলেন, ‘তদন্ত শুরু হওয়া মানেই অপরাধ বা দোষী সাব্যস্ত হওয়া নয়।’ তবে এটা সাম্প্রতিক একটি ঘটনা। মেসি ও ইংল্যান্ড দলের এত বছর ধরে কেন দেখা হয়নি, তার ব্যাখ্যা এই তদন্তের মধ্যে মিলবে না।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আগামী বুধবার আটলান্টায় ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা। এই ম্যাচ ঘিরে ফিফার টিকিট পুনর্বিক্রির অ্যাপে টিকিটের দাম যে আকাশ ছোঁবে এবং যুক্তরাজ্য থেকে সব ফ্লাইটের টিকিট নিমেষে শেষ হয়ে যাবে, তা বলাই বাহুল্য। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত ইংলিশ সমর্থকদের সেখানে থাকার মেয়াদ বাড়বে।
মেসির বয়স এখন ৩৯। সেরা সময়টা পেছনে ফেলে এলেও এবার বিশ্বকাপেও দারুণ খেলছেন। ৮ গোলের পাশাপাশি ২টি গোল করিয়েছেন। তবে সেমিফাইনালে উঠলেও আর্জেন্টিনাকে বেশ কিছু জায়গায় নড়বড়ে লেগেছে। ইংল্যান্ড দল তাই এই বিশ্বাস নিয়েই মাঠে নামবে যে আর্জেন্টিনাকে বিদায় করার সামর্থ্য তাদের আছে।