বাংলাদেশের নারী ফুটবলে সাবিনা মানেই যেন ‘প্রথম’–এর গল্প

ট্রফি নিয়ে সাবিনা খাতুনফেসবুক/সাবিনা খাতুন

সেই চিরচেনা হাসি, একই ধরনের গোল, গোলের পর দুহাত প্রসারিত করে উদ্‌যাপন! ফুটবলের সাবিনা আর ফুটসালের সাবিনার পার্থক্য নেই কোনো। ২০২২ সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে বল পায়ে একের পর এক গোল করেছেন। চার বছর পর ফুটসালেও অভিন্ন সাবিনার দেখা মিলেছে। মাঠের দৈর্ঘ্য, খেলার নিয়ম, খেলোয়াড়ের সংখ্যায় ফুটবলের সঙ্গে ফুটসালের পার্থক্য অনেক। কিন্তু সাবিনা আছেন আগেরই মতো।

নিয়মিত গোল, নেতৃত্বের বাহুবন্ধনী পরে দলকে এগিয়ে নেওয়ার কাজটাও ঠিক একইভাবে সামলেছেন সাতক্ষীরার মেয়েটি। বাংলাদেশও গতকাল প্রথম সাফ উইমেন্স ফুটসালের শেষ ম্যাচে মালদ্বীপকে ১৪–২ গোলে উড়িয়ে জিতেছে শিরোপা।

প্রথমের কথা এলেই সাবিনার নামটা চলে আসে। দেশের নারী ফুটবলে এখন পর্যন্ত বড় অর্জন বলতে দুবার সাফ জয় ও দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে (এসএ) দুটি ব্রোঞ্জপদক। এ অর্জনের প্রতিটি পাতায় আছেন তিনি। সেটা যদি হয় ‘প্রথম’ প্রাপ্তির বেলায়, তাহলে তো কথাই নেই। ২০২২ সালে নেপালে প্রথমবার সাফের শিরোপা জিতেছিলেন বাংলাদেশের মেয়েরা। যে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ অধিনায়ক সাবিনা করেছিলেন ৮ গোল।

আরও পড়ুন

সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার পাশাপাশি সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও ওঠে তাঁর হাতে। এসএ গেমসে ২০১০ সালে প্রথম পদক পায় বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। সেই প্রাপ্তিতেও রেখেছিলেন অবদান। অন্তত ব্রোঞ্জপদক পাওয়ার জন্য সে প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানকে হারাতে হতো। ঢাকা স্টেডিয়ামে স্বাগতিক দর্শকদের সামনে সাবিনাই গোল করে দলকে জেতান। আরেক প্রথমেও আছেন তিনি। ২০১০ এসএ গেমসে নেপালের বিপক্ষে খেলা ম্যাচটি বাংলাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। সেই ম্যাচেও ছিলেন সাবিনা।

সতীর্থদের সঙ্গে ট্রফি হাতে সাবিনার উদ্‌যাপন
সাফ

এমন অনেক প্রথমের সাক্ষী সাবিনা ২০২৪ সালের অক্টোবরের পর ফিরতে পারেননি জাতীয় দলে। কোচ পিটার বাটলারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পর থেকেই দলের বাইরে। কোচের ফিটনেস এবং পারফরম্যান্সের মাপকাঠি নাকি ছুঁতে পারছেন না, তাই দলেও জায়গা হচ্ছে না। জাতীয় দলে জায়গা হারালেও খেলা থেকে হারিয়ে যাননি সাবিনা। গত বছর খেলেছেন ভুটান ফুটবল লিগে। এরপর ট্রায়ালে অংশ নিয়ে ফুটসাল জাতীয় দলে নাম লেখান। সাফ ফুটসালে তো নিজেকে আবিষ্কার করেছেন নতুন করে, ১৪ গোল নিয়ে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা।

ফুটবল ও ফুটসালে সাবিনার অবদানে খুশি বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল। কাল বাফুফে ফেসবুক পেজে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি অধিনায়ক সাবিনারও প্রশংসা করেছেন তিনি, ‘বাংলাদেশের একমাত্র ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব হিসেবে খেলার দুটি ভিন্ন ফরম্যাটে (ফুটবল ও ফুটসাল) দলকে চ্যাম্পিয়ন করায় সাবিনাকে নিয়ে আমরা গর্বিত।’

আরও পড়ুন

শিরোপা উৎসবে চেনা সাবিনা। মালদ্বীপকে হারানোর পর টিম হোটেলে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে ব্যাংককের নন্থাবুরি স্টেডিয়ামে ফেরে বাংলাদেশ দল। মাঠে তখনো নেপাল–ভুটান ম্যাচ চলছিল। সতীর্থদের নিয়ে দিব্যি আড্ডায় মেতেছেন সাবিনা। সেই রেফারি শেষ বাঁশি বাজাতেই মাঠে নামার তাড়া। উৎসবের মঞ্চ তখনো তৈরি হয়নি, কিন্তু সাবিনার যেন তর সইছিল না!

সাবিনা মালদ্বীপের বিপক্ষে গোলের এমন উদ্‌যাপন করেছেন চারবার
সাফ

মাঠে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে খেলোয়াড়েরা। শুরুতে ডাক পড়ল রানারআপ ভারতের, এরপর চ্যাম্পিয়নদের। সবাই পদক নেওয়ার কয়েক সেকেন্ড পর সাবিনা মঞ্চে ওঠেন। সাফ সভাপতি কাজী সালাহউদ্দিনের কাছ থেকে পদক ও ট্রফিটা নিয়ে চোখের ইশারায় সতীর্থদের ডাকেন, অধিনায়কের ডাকে সবাই মঞ্চে হাজির। শুরু হয় উৎসব। সেখানেও নেতৃত্বে সাবিনা। ট্রফিটা অন্য খেলোয়াড়দের হাত ঘুরে সবশেষ নিজের হাতে রেখেছেন পরম যত্নে।

আরও পড়ুন

সাবিনার কাছে এ ট্রফির মর্যাদা ফুটবলের চেয়ে কম নয়! তা ছাড়া ‎ফুটবলেও এত দ্রুত এমন সাফল্য আসেনি। ২০১০ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা বাংলাদেশ সাফ জেতে ২০২২ সালে। মেয়েদের ফুটসালে বাংলাদেশের যাত্রা ২০১৮ সালে। সে বছর এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেয় বাংলাদেশ। এরপর দীর্ঘ ছয় বছর কার্যক্রম বন্ধ ছিল। গত ডিসেম্বরে নতুন করে গড়া নারী ফুটসাল দল কাল ব্যাংককে জিতল শিরোপা। রচিত হলো সাবিনার আরেকটি প্রথমের গল্প।