এমবাপ্পেকে দেখে মুগ্ধতা বেড়েই চলেছে
বিশ্বকাপ মানেই শুধু ট্রফির লড়াই নয়, এটি আসলে বিশ্বসেরা কোচদের রণকৌশলের দাবার বোর্ডও। প্রতিটি ম্যাচ নতুন নতুন ট্যাকটিক্যাল দিক জন্ম দিচ্ছে। আধুনিক ফুটবল চশমার পাওয়ার বদলানোর মতো দ্রুত পাল্টাচ্ছে। ফ্রান্স বনাম ইরাকের ম্যাচে দেখা গেছে ফুটবল এখন মূলত স্পেস বা জায়গা দখলের এক নিখুঁত দাবা খেলা।
ম্যাচের শুরু থেকেই ফ্রান্সের হাইপ্রেসিং এবং আক্রমণাত্মক চাপের মুখে ইরাক কার্যত রক্ষণাত্মক খোলসে ঢুকে পড়তে বাধ্য হয়েছিল। ইরাকের ৪-১-৪-১ ফরমেশন মাঠে রূপ নিয়েছিল ৬-৩-১ -এ, অর্থাৎ রক্ষণভাগেই ছিল ছয়জন খেলোয়াড়। কোচিংয়ের ভাষায় আমরা একে বলি ‘ডিপ ডিফেন্সিভ লো ব্লক’।
এই ধরনের জমাট দেয়াল ভাঙা যেকোনো দলের জন্যই কঠিন। কিন্তু দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্স এখানে যে কৌশল খাটাল, তা এককথায় দারুণ। পুরো ম্যাচে ফ্রান্স প্রতিপক্ষের বক্সের ভেতরে ৪১টি পাস খেলেছে, যা বিশ্বকাপে নতুন রেকর্ডও বটে! এমনিতে কোনো দল প্রতিপক্ষের বক্সের ভেতর ২০-৩০টির বেশি পাস দিতে পারে না। ফ্রান্স এটি করতে পেরেছে ম্যাচের সময় তাদের ‘২-২-৬ আক্রমণাত্মক শেপ’-এর কারণে। আক্রমণভাগে একই সঙ্গে ছয়জন খেলোয়াড় ওপরে উঠে আসায় ইরাকের ডিফেন্ডাররা পজিশনাল সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করেছে। এই ৪১টি পাস থেকে ফ্রান্স পাঁচটি গোল করার মতো সুযোগ তৈরি করে দুটি কাজে লাগাতে পেরেছে।
এই ম্যাচে ফ্রান্সের মূল শক্তি ছিল ‘হাফ স্পেস’-এর দুর্দান্ত ব্যবহার। ফুটবলের পরিভাষায় হাফ স্পেস হলো, প্রতিপক্ষের ফুলব্যাক এবং সেন্টারব্যাকের মাঝখানের অংশটা। বর্তমান যুগে ৭০ শতাংশের বেশি গোল এই অঞ্চল থেকেই তৈরি হয়। ফ্রান্সের ফরোয়ার্ডরা একই সঙ্গে দুই এবং দুটি এই হাফ স্পেসে জায়গা নেয় এবং উইং ও হাফ স্পেসে জায়গা বদল করে ইরাকের রক্ষণকে দিশাহারা করে দিয়েছিল।
এখানে আলাদা করে আসছে মাইকেল ওলিসের কথা। ওলিসে এবার দলে গ্রিজমানের অভাবটা পূরণ করছেন। তাঁর নাম্বার টেন ভূমিকায় খেলার কারণে এমবাপ্পে এখন অনেক বেশি স্বাধীনতা পাচ্ছেন। ওলিসে ডিফেন্ডারদের নিজের দিকে টেনে নেওয়ায় এমবাপ্পে হাফ স্পেস থেকে সেন্ট্রালে গিয়ে পর্যাপ্ত জায়গা পেয়ে যাচ্ছেন।
বিশ্বকাপে ১৬ গোল করে ফেলা এমবাপ্পে এখন ফুটবলের এক অতিমানব। ইরাকের বিপক্ষে তাঁর দুই গোলের প্রথমটি বক্সের বাইরে থেকে দুরন্ত শটে। এমন গোল দেখা মানে রাত জাগা সার্থক। এমবাপ্পের দুই পা সমান চলে এবং দূরপাল্লার শুটিংয়ে খুবই পারদর্শী। তাঁকে দেখে মুগ্ধতা বাড়ছেই, ‘ক্লিনিক্যাল’ আর ‘ওয়াইল্ড’ ফিনিশারের এক নিখুঁত মিশ্রণ হয়ে উঠেছেন।
তবে এমবাপ্পের বড় শক্তির জায়গা তাঁর গতির সঙ্গে ‘ম্যাচ রিডিং’ ও পূর্বানুমান ক্ষমতা। লিওনেল মেসির খেলা অনেক বেশি চোখধাঁধানো, তবে বল ছাড়া খেলার গতিপ্রকৃতি এবং সময়মতো ঠিক পজিশন থাকার ক্ষেত্রে এমবাপ্পে অনন্য।
আমরা যদি আর্জেন্টিনা ও অস্ট্রিয়ার ম্যাচটি দেখি, তাহলে কৌশলের আরেকটি দিক স্পষ্ট হবে। রালফ রাংনিকের বিখ্যাত ‘গেগেনপ্রেসিং’ কৌশলটি আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খুব একটা কাজে লাগেনি। এর পেছনে প্রধান দুটি কারণ রয়েছে। ইউরোপের তুলনায় আমেরিকার ভেন্যুগুলোতে গরম ও আর্দ্রতা অনেক বেশি। এ ধরনের আবহাওয়ায় টানা হাই–ইনটেনসিটি প্রেসিং করা অসম্ভব।
আধুনিক ফুটবলে মূলত তিন ধরনের প্রেসিং দেখা যায়। যেমন হাইপ্রেসিংয়ে প্রতিপক্ষকে তাদের নিজেদের হাফ থেকে বিল্ডআপ করতে বাধা দেওয়া। গেগেনপ্রেসিংয়ে বল বিপক্ষের পায়ে থাকা অবস্থায় ঝাঁক বেঁধে ২-৩ জন মিলে বল কেড়ে নেওয়া। কাউন্টার প্রেসিংয়ে বল হারানোর পর ৫ সেকেন্ড বা প্রতিপক্ষের দু-তিনটি পাসিংয়ের মধ্যেই পুনরুদ্ধার করা।
অস্ট্রিয়া যখন হাইপ্রেসিং করতে ওপরে উঠে আসছিল, তখন নিজেদের উইংগুলো ফাঁকা রেখে আসছিল। আর্জেন্টিনা ঠিক এই পজিশনাল ভুলের সুযোগটি নিয়েছে। আর্জেন্টিনার ফুলব্যাক এবং মিডফিল্ডাররা সেই ফাঁকা জায়গা ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের প্রেসিং অকেজো করে দেয়। এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার মাঝমাঠকেই আমার কাছে সবচেয়ে সেরা মনে হয়েছে। বিশেষ করে ম্যাক আলিস্টার ও এনজো ফার্নান্দেজদের পজিশনাল রোটেশন এবং ওয়ান-টাচ পাসিং অস্ট্রিয়ার প্রেসিংকে অকেজো করে দিয়েছিল।
লেখক: ফুটবল কোচ ও বিশ্লেষক