কার্ডের ছড়াছড়ি হলেও গোলের বেলায় ব্যাপারটা ছিলো উল্টো। বিশ্বকাপ এলেই জ্বলে ওঠা জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসা মাত্র ৫ গোল দিয়েই সেরা গোলদাতা হন। এত কম গোল দিয়ে ১৯৬২ সালের পর কেউ আর সেরা গোলদাতা হয়নি।

২০০৬ বিশ্বকাপে চরম ব্যর্থ টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ফেবারিট এবং ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। রোনালদিনিও বিশ্বকাপের আগে দুর্দান্ত ছন্দে ছিলেন। কিন্তু জার্মানির রঙ্গশালায় ছিলেন বড্ড ম্লান। আদ্রিয়ানো, কাকা বা রবিনিওরাও সুবিধা করতে পারেননি টুর্নামেন্টে। রোনালদো তো ছিলেন একেবারেই নিষ্প্রভ। অবশ্য গ্রুপ পর্যায়ে তিনটি ম্যাচেই জিতে তারা পরের রাউন্ডে যায়।

সেখানে ঘানার সঙ্গে ৩-০ গোলে জেতে কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে ব্রাজিল। শেষ আটে তাদের থামিয়ে দেয় ফ্রান্স, আরও স্পষ্ট করে বললে জিদান। যদিও স্কোরবোর্ড দেখে তা বোঝার উপায় নেই। কারণ, ব্রাজিল হারে থিয়েরি অঁরির একমাত্র গোলে, কিন্তু সে ম্যাচে জিদান দারুণ কিছু ঝলক দেখালেন। কিছু ড্রিবল, কিছু বডি ডজ আর কিছু রক্ষণচেরা পাস—এত বছর পরও নিশ্চিতভাবেই সেদিনের ম্যাচ যাঁরা দেখেছিলেন, তাঁদের মনে থাকার কথা।

আর্জেন্টিনাকে ফেবারিটের তকমা না দিলেও হোসে পেকেরমানের অধীনে দলটা গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে পরের রাউন্ডে যায় এবং মেক্সিকোকে ২-১ গোলে হারায়। কিন্তু জার্মানির কাছে টাইব্রেকারে হেরে যায় কোয়ার্টার ফাইনালে। বার্লিনের সেই ম্যাচে নির্ধারিত সময়ের খেলা শেষে দুই দলের মধ্যে হাতাহাতি হয়। আর্জেন্টিনার লিয়ান্দ্রে কুরফ্রে, যিনি সেই খেলায় মাঠেই নামেননি, তিনি জার্মানির পার মার্টেসেকারকে লাথি দেওয়ায় লাল কার্ড পান। ম্যারাডোনা-উত্তর আর্জেন্টিনার আরও একটা বিশ্বকাপ শেষ হয় হতাশায়।

একই রকমভাবে হতাশায় শেষ হয় বিশ্বকাপের আগে সদা উত্তেজিত থাকা ইংলিশ মিডিয়ার উচ্ছ্বাস। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া ইংল্যান্ড দ্বিতীয় রাউন্ডে হারায় ইকুয়েডরকে, কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে দলের সেরা খেলোয়াড় ওয়েন রুনি ৬২ মিনিটের মাথায় লাল কার্ড দেখেন। এরপর ১০ জন নিয়েই ইংলিশরা পর্তুগালকে আটকে দেয় ১২০ মিনিট পর্যন্ত। কিন্তু, ওই যে ’৯০–এ ক্যামেরুনকে দুই পেনাল্টিতে হারানোর পর টাইব্রেকারের অভিশাপ, তা আবার ছোবল মারে ইংলিশদের। পেনাল্টি মিস করেন ল্যাম্পার্ড, জেরার্ড আর ক্যারাগার।

পর্তুগালের তথাকথিত সোনালি প্রজন্ম এবার অনেকটা দূর গিয়েও বড় কাপ জেতার স্বপ্ন পূরণে আবারও ব্যর্থ হয়। বছর দুয়েক আগে নিজের দেশে আয়োজিত ইউরোর ফাইনালে গ্রিসের কাছে হারা পর্তুগিজরা সেমিফাইনালে হারে জিদানের একমাত্র গোলে।

জার্মানরা ইতালির কাছে ১১৯ আর ১২১ মিনিটে দুই গোল খেয়ে সেমিফাইনালে হারে। ডাচরা পর্তুগালের সঙ্গে মল্লযুদ্ধে ১-০ গোলে হারে দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচেই। স্প্যানিশরা বড় স্বপ্ন দেখলেও জিদানের আরও একটা জাদুতে তারা ৩-১ গোলে হেরে বিদায় নেয় দ্বিতীয় রাউন্ডে। জিদানের যোগ্য সঙ্গ দেন ২৩-বছর বয়সী ফ্রাঙ্ক রিবেরি।

জুলাইয়ের ৯ তারিখে বার্লিনের ফাইনালে সব বড় ঘটনাতেই ছিলেন মাতেরাজ্জি। খেলার পাঁচ মিনিটে অঁরির একটা লম্বা পাস ক্লিয়ার করতে ব্যর্থ হন মাতেরাজ্জি আর ফ্লোরেন্স মালুদাকে ফাউল করলে রেফারি পেনাল্টির বাশি বাজান। জিদান এগিয়ে দেন ফ্রান্সকে। মাতেরাজ্জির একটি হেড থেকে ফরাসিরা আরেকটু হলেই আত্মঘাতী গোল দিয়ে বসেছিল। তবে এই মাতেরাজ্জিই ১৯ মিনিটে আন্দ্রেয়া পিরলোর কর্নারে দারুন এক হেডে খেলায় সমতা ফেরান। আবার এই মাতেরাজ্জিই টাইব্রেকারে গুরুত্বপূর্ণ গোল দেন।

তবে মাতেরাজ্জির জয়ের পরেও দেশে ফিরে জিদান বীরের সম্মান পান। প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাক যখন এই বীরকে সম্ভাষণ জানাচ্ছিলেন, ক্ষণিকের তরে জিদান মাথা নিচু করায় কেউ কেউ হয়তো আঁতকে উঠেছিল। এই রে! আবার ঢুস দিচ্ছে নাকি!