সার্বিয়ার বিপক্ষে কাল ব্রাজিলের ২-০ গোলের জয়ে দ্বিতীয়ার্ধে তিতের দল যে খেলা দেখিয়েছে, তা প্রতিপক্ষ দলগুলোর জন্য সত্যিই ভয়ংকর। ‘জোগো বনিতো’র পুরো ছাপ হয়তো ছিল না, পূর্ণ মাত্রায় বাজেনি সাম্বার ভয়াল সুন্দর সুরও, কিন্তু স্টাইল, প্যাশন আর প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলার সব চেষ্টাই ছিল।

রিচার্লিসনের দ্বিতীয় গোলটি সেই চেষ্টার ‘বিজ্ঞাপন’—৭৩ মিনিটে ভিনিসিয়ুসের পাসটি প্রথম টাচে শূন্যে তুলে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে চোখ ধাঁধানো বাইসাইকেল কিকে গোল করেন ব্রাজিলের এই নম্বর ৯। সংবাদমাধ্যমে আলোচনা হচ্ছে, এটি কাতার বিশ্বকাপের সেরা গোলগুলোর মধ্যে থাকবে তো বটেই, শেষ পর্যন্ত ‘গোল অব দ্য টুর্নামেন্ট’ হয়ে গেলেও আশ্চর্যের কিছু থাকবে না।

রবার্তো ফিরমিনো বিশ্বকাপ স্কোয়াড থেকে বাদ পড়ার পর অনেকেই তিতের সমালোচনা করেছিলেন। ব্রাজিলের হয়ে গোল করবেন কে—এই প্রশ্ন উঠেছিল। রিচার্লিসন ৯ নম্বর জার্সির আবেদন কতটা পূরণ করতে পারবেন, উঠেছিল সে প্রশ্নও। তিতে রিচার্লিসনের ওপর আস্থা রেখেছিলেন।

টটেনহামের হয়ে এই মৌসুমে ১৫ ম্যাচে মাত্র ২ গোল করলেও ব্রাজিলের হয়ে ৩৯ ম্যাচে রিচার্লিসনের ১৫ গোলে মজেছিলেন তিতে। ব্রাজিল কোচ যে ভুল করেননি তা তো এখন পরিষ্কার। ক্লাবের হয়ে যাই হোক, দেশের ৯ নম্বর জার্সিটা পরলের রিচার্লিসন যে অন্য মানুষ বনে যান, সেটা টের পেয়েছিলেন তিতে।

রিচার্লিসন নিজেও যে মনে মনে এমন কিছু করার স্বপ্ন পুষে রেখেছিলেন, তা জানা গেল ম্যাচ শেষে। দেশের হয়ে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম ম্যাচ সবাই স্মরণীয় করে রাখতে চায়। দলের জয় ও নিজে দুর্দান্ত একটি গোল করতে পেরে রিচার্লিসন নিজেও খুশি। ‘টিভি গ্লোবো’কে বলেছেন, ‘শৈশবের স্বপ্ন পূরণ হলো। আমরা ভালো ম্যাচ খেলেছি, বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে। প্রতিপক্ষ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল এবং আমরা সেই সুযোগ নিয়েছি।’

রাশিয়া বিশ্বকাপে ব্যর্থতার পর নতুন স্ট্রাইকারদের নিয়ে আসার তালিকায় রিচার্লিসনও ডাক পান ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে। চার বছর আগের সেই সময় আর এই সময়ের মধ্যে পার্থক্য দেখেন এই তারকা।

তখনকার চোটের একটি স্মৃতি ভাগ করলেন এভাবে, ‘চার বছর আগে কেঁদেছিলাম, যেদিন চোটের পরীক্ষা করা হলো। এটা ছিল আমার জীবনের দীর্ঘতম দিন। চিকিৎসকেরা এ জায়গা থেকে ও জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করছিলেন। কিন্তু সময় কাটছিল না। এই বিশ্বকাপে খেলতে এমন দুটো পর্যায় পার হতে হয়েছে।’

বিশ্বকাপ খেলতে কাতারে আসার আগে তুরিনে অনুশীলন ক্যাম্প করেছে ব্রাজিল। সেখানে ভলি থেকে গোল করা অনুশীলন করেছেন রিচার্লিসন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর এই অনুশীলনের ভিডিও ব্রাজিলের ভক্তরা ফলাও করে প্রকাশ করেছেন কাল রাতে বাইসাইকেল কিক ভলিতে তাঁর চোখ ধাঁধানো গোলটির পর।

রিচার্লিসন এ নিয়ে বলেছেন, ‘ভলি থেকে সুন্দর একটি গোলের সুযোগ পেয়েছিলাম, সেটা করেছি। এমন আরও সুযোগ পাব। সতীর্থদের বলেছিলাম, স্রেফ একটা পাস দরকার, সেটাও পেয়েছি। তাদের ধন্যবাদ।’

রিচার্লিসন সুযোগ কাজে লাগিয়ে জায়গা করে নিয়েছেন ইতিহাসেও। ফুটবলের পরিসংখ্যান নিয়ে কাজ করা ‘মিস্টারচিপ’ জানাচ্ছে, বিশ্বকাপের ইতিহাসে বাইসাইকেল কিকে ব্রাজিলের খেলোয়াড়েরাই সবচেয়ে বেশি গোল করেছেন—৩টি।

১৯৮২ বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ডান প্রান্ত থেকে উড়ে আসা ক্রসে বাইসাইকেল কিক করে গোল করেছিলেন ‘সাদা পেলে’ জিকো। ২০০২ বিশ্বকাপে সেই স্মৃতি ফেরান এডমিলসন, কোস্টারিকার বিপক্ষে বাইসাইকেল কিকে গোল করে। মজার বিষয়, জিকোর সেই গোলের ২০ বছর পর একইভাবে গোল করেন এডমিলসন। আর রিচার্লিসনও এডমিলসনের সেই গোলের স্মৃতি ফেরালেন কত বছর পর? হ্যাঁ, ২০ বছর! তবে এডমিলসনের গোলের চেয়ে রিচার্লিসনের গোলটাই বেশি সুন্দর।

আশ্চর্যের বিষয়ও আছে। সেই তথ্য বের হওয়ার পর বোঝা গেছে—ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যমে কেন বলাবলি হচ্ছে, রিচার্লিসন ৯ নম্বর জার্সিটা পুনরুজ্জীবিত করেছেন। সেখানেও জড়িয়ে আছে ২০ বছরের হিসেব। ২০০২ জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপের পর থেকে গত চারটি বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে ৯ নম্বর জার্সি পরা কোনো খেলোয়াড়ের কাছ থেকে গোল পায়নি ব্রাজিল। রিচার্লিসন দুই দশকের সেই খরার ইতিটা কালই টেনেছেন।

২০০২ বিশ্বকাপে তুরস্কের বিপক্ষে ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচে গোল করেছিলেন ৯ নম্বর জার্সিকে কিংবদন্তিতে পরিণত করা রোনালদো। তাঁর আগে বিশ্বকাপের যেসব আসরে ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচে ৯ নম্বর জার্সির খেলোয়াড়েরা গোল করেছেন—বালতাজার (১৯৫০ ও ১৯৫৪), রেইনালদো (১৯৭৮) ও ক্যারেকা (১৯৯০)। এর মধ্যে ’৯০ ইতালি বিশ্বকাপে সুইডেনের বিপক্ষে ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচে জোড়া গোল করেন ক্যারেকা। রিচার্লিসন সেই স্মৃতিই ফেরালেন। এই জোড়া গোলে দারুণ একটি ক্লাবেও নাম লিখিয়েছেন টটেনহাম তারকা।

বিশ্বকাপে ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচে জোড়া গোল করা খেলোয়াড়েরা হলেন—লিওনিদাস (১৯৩৮), আদেমির (১৯৫০), পিঙ্গা (১৯৫৪), মাজ্জোলা (১৯৫৮) জর্জিনিও (১৯৭০), কারেকা (১৯৯০) এবং নেইমার (২০১৪)। সর্বশেষ নামটি বাদ পড়েছে—রিচার্লিসন (২০২২)।

মজার বিষয়, এই তালিকায় প্রথম যে খেলোয়াড়টি (লিওনিদাস), ব্রাজিলে তাঁকে ‘বাইসাইকেল কিক’ এর জনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যদিও এই কিকের আবিষ্কার আরও আগে, কিন্তু ব্রাজিলে লিওনিদাসকে এই শটের ‘পারফেকশনিস্ট’ হিসেবে ধরা হয়। আর পেলের দাবি, ‘ব্রাজিলে লিওনিদাসই প্রথম বাইসাইকেল কিক মারেন।’ ইতিহাস বলে, ব্রাজিলে ১৯৩২ সালের ২৪ এপ্রিল ক্যারেওকা-বোনসুকেসো ম্যাচে প্রথম এই শট নিয়েছিলেন লিওনিদাস।

‘ব্ল্যাক ডায়মন্ড’ ও ‘রাবার ম্যান’ নামে পরিচিত লিওনিদাস ১৯৩৮ বিশ্বকাপে সাবেক চেকোশ্লোভাকিয়ার বিপক্ষে বাইসাইকেল কিক নেওয়ার পর চমকে গিয়েছিলেন রেফারিও। শটটি নিয়মের মধ্যে পড়ে কি না, রেফারি তা নিয়ে সন্দেহে ছিলেন! কালের পরিক্রমায় সেই সন্দেহ ঘুচে গেলেও মানুষ এখনো চমকায়। কীভাবে শটটি নিলেন! প্রমাণ চাই? কাল রিচার্লিসনের দ্বিতীয় গোলটির ভিডিও দেখুন।