১৬ বছর পর আবার বিশ্বসেরা স্পেন
স্পেন ১–০ আর্জেন্টিনা
নিউ জার্সি স্টেডিয়ামের প্রকাণ্ড লাউডস্পিকারে তখন তারস্বরে বাজছিল ইউরোপীয় রকের চিরচেনা সেই সুর, ‘দ্য ফাইনাল কাউন্টডাউন’। গানের রেশ কাটতে না কাটতেই আবার বল গড়াল মাঠে। তারপর মাত্র ৩৭ সেকেন্ড।
পেদ্রো পোরোর ক্রস বাঁ দিক থেকে ভেসে এল, নিকো উইলিয়ামস হেড দিয়ে বলটা পেছনের দিকে ঠেলে দিলেন, আর ফেরান তোরেস সেই বলে পা লাগিয়ে জালে জড়ালেন। একটা বিশ্বকাপ ফাইনাল, যা ১০৬ মিনিট ধরে নিজের শ্বাস আটকে রেখেছিল, হঠাৎ যেন বুকভরা নিশ্বাস নিল। স্পেন ১, আর্জেন্টিনা ০। এটাই ছিল ম্যাচের সেই মুহূর্ত, যেখানে ইতিহাস তার সিদ্ধান্ত লিখে ফেলল।
আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ কিংবা গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা অতিমানব এমিলিয়ানো মার্তিনেজ, কারও কিচ্ছু করার ছিল না। গ্যালারির এক প্রান্ত তখন লাল উৎসবে উত্তাল, আর অন্য প্রান্ত ডুবে গেল এক অতলান্তিক নীরবতায়। এই একটি গোলই শেষ পর্যন্ত লিখে দিল ২০২৬ বিশ্বকাপের নিয়তি। ১৬ বছর পর আরও একবার বিশ্বকাপ জিতল স্পেন, এ নিয়ে দ্বিতীয়বার। তাদের জার্সিতে তারাও হবে দুটি। ভেঙে গেল আর্জেন্টিনা ও লিওনেল মেসির টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন।
অবশ্য যে রকম ম্যাচ হয়েছে, তাতে এই ম্যাচটা শেষ পর্যন্ত স্পেন না জিতলে তাদের প্রতি অবিচারই হতো। আর্জেন্টিনা এ রাতে ছিল এক অদ্ভুত দল। শরীরী লড়াইয়ে তারা নির্মম, কিন্তু ছন্দে পিছিয়ে। মাঝমাঠে লিয়ান্দ্রো পারেদেস, রদ্রিগো দি পলরা বলের চেয়ে ফাউল করা নিয়েই বেশি ব্যস্ত। লিসান্দ্রো মার্তিনেজের হলুদ কার্ড, পরে চোট—সব মিলিয়ে রক্ষণও স্থির নয়। তবু এই দলটাই তো নকআউটে বারবার শেষ মুহূর্তে গোল করে ফিরে এসেছে। কিন্তু গতকাল সময়টা তাদের কথা শুনছিল না। ভাবা যায়, পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনা গোলে একটাও শট নিতে পারেনি। বিশ্বকাপ ইতিহাসেই যা বিরল।
অন্যদিকে স্পেনের আক্রমণ ছিল ঢেউয়ের মতো, একটা থামলে আরেকটা আসছে। প্রথম মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই লামিনে ইয়ামাল বলটা বক্সে ঠেলে দিয়েছিলেন দানি ওলমোর দিকে, সেই বল আবার ফিরে এল তরুণের পায়ে। শট নিলেন, লিসান্দ্রো মার্তিনেজের পায়ে লেগে বলের গতিপথ সামান্য বেঁকে গেল। আর সেই সামান্য বাঁকই যেন বাঁচিয়ে দিল এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে, গ্লাভস বাড়িয়ে ঠেকিয়ে দিলেন তিনি। এই একটা মুহূর্তেই যেন গোটা ম্যাচের ভবিষ্যৎ লেখা হয়ে গিয়েছিল। স্পেন আক্রমণ করে যাবে, ঢেউয়ের পর ঢেউ তুলবে, আর এক দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন একজনই মানুষ।
পুরো ৯০ মিনিটজুড়ে স্পেন বলা যায় একতরফা খেলে গেল। ওইয়ারসাবাল ২৮ মিনিটে জোরালো শট নিলেন, মার্তিনেজ নিচু হয়ে বাঁচালেন। কুকুরেয়া বাঁ পায়ের শটে পোস্ট সামান্য এদিক-ওদিক করলেন। লিসান্দ্রো মার্তিনেজ হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লেন চোট নিয়ে, নামলেন নিকোলাস ওতামেন্দি। বিরতির আগে স্কোরবোর্ডে তখনো শূন্য, কিন্তু ছবিটা স্পষ্ট—স্পেন বল দখলে রেখেছে, আর্জেন্টিনা কেবল বাঁচার চেষ্টায় ব্যস্ত।
লিওনেল মেসি এদিন যেন মাঠে থেকেও ছিলেন না। প্রথম ২০ মিনিটে তাঁর পায়ে বল এসেছে মোটে দুবার। যে পা একদিন কাতারে গোটা দেশকে উৎসবে ভাসিয়েছিল, সে পা যেন সেদিন নিউ জার্সির ঘাসে আটকে ছিল। মেসির শরীরী ভাষায় ছিল না সেই পুরোনো তীক্ষ্ণতা, ছিল শুধু ক্লান্ত এক রাজার নীরব উপস্থিতি, যিনি জানেন যুদ্ধ তাঁর হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে।
তবু আর্জেন্টিনা টিকে ছিল একজনের কাঁধে ভর করে। এমিলিয়ানো মার্তিনেজ সেদিন একের পর এক অবিশ্বাস্য সেভ করলেন। তোরেসের হেড, লাপোর্তের হেডার, রদ্রির শট, উইলিয়ামসের আক্রমণ—সব ফিরিয়ে দিলেন একের পর এক। ৯০ মিনিট শেষে তাঁর সেভের সংখ্যা দাঁড়াল দশে, বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে যা রেকর্ড। তারপরও যোগ করা সময়ে এনজো ফার্নান্দেজ কুবারসিকে ফাউল করে লাল কার্ড দেখলেন। আর্জেন্টিনা নেমে এল ১০ জনে। কয়েক সেকেন্ড পরেই ইয়ামালের ফ্রি-কিক বাঁচিয়ে মার্তিনেজ আরেকবার প্রমাণ করলেন, কেন তাঁকে ছাড়া আর্জেন্টিনা এই ফাইনালে এতক্ষণ টিকে থাকতে পারত না।
অতিরিক্ত সময়েও একই ছবি। উইলিয়ামসের হেড আরেকবার ঠেকালেন মার্তিনেজ। তারপর নিকো উইলিয়ামসের গোল বাতিল হলো ফাউলের কারণে, ভিএআর তা নিশ্চিত করল ওতামেন্দির ওপর ফাউল করেছিলেন মেরিনো। কিন্তু কতবার আর বাঁচা যায়? এই আর্জেন্টিনাই তো নকআউট পর্বের পুরোটাজুড়ে শেষ মুহূর্তের নাটকে বেঁচেছে, শেষ মুহূর্তের গোলে জিতেছে। ভাগ্য যেন এবার হিসাব উল্টে দিতে চাইছিল।
১০৬ মিনিটে, বিরতির পরপরই, তোরেসের সেই গোল। তারপর তোরেস আরেকবার জালে বল পাঠালেন, কিন্তু অফসাইডের পতাকা তা কেড়ে নিল। শেষ মুহূর্তে হুলিয়ানো সিমিওনের হেড বারের অনেক ওপর দিয়ে উড়ে গেল, আর্জেন্টিনার শেষ আশাও উড়ে গেল তার সঙ্গে।
রেফারি স্লাভকো ভিনচিচ যখন শেষ বাঁশি বাজালেন, স্পেনের বেঞ্চ দৌড়াল মাঠের দিকে। ২০১০ সালের পর নিজেদের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনাল খেলে দ্বিতীয়বারের মতোই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন।
আর মেসি? ফুটবল তাঁকে সব দিয়েছে অনেক আগেই। তবে এদিন ফেরাল শূন্য হাতে।