ম্যারাডোনাকে বাঁচানোর সুযোগ পেয়েও কাজে লাগায়নি তাঁর চিকিৎসকেরা, দাবি আইনজীবীদের

ম্যারাডোনা এখনো ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে। ছবিটি তাঁর মৃত্যুর পর নেপলসে তোলারয়টার্স

ডিয়েগো ম্যারাডোনার চিকিৎসাতে কি তাহলে সত্যিই গাফিলতি ছিল? মাঠে বল পায়ে যিনি অসম্ভবকে সম্ভব করতেন অনায়াসে, মাঠের বাইরের শেষ লড়াইয়ে তিনি কি তবে স্রেফ একদল ‘অ্যামেচার’ বা অপেশাদার চিকিৎসকের খামখেয়ালির শিকার হলেন?

আর্জেন্টিনার সরকারি কৌঁসুলিদের অভিযোগ অন্তত তেমনই। তাঁদের দাবি, ডিয়েগো ম্যারাডোনার চিকিৎসায় নিয়োজিত দলটি যদি একটুও পেশাদারত্ব দেখাত, তবে আজও হয়তো বেঁচে থাকতেন এই ফুটবল কিংবদন্তি।

আর্জেন্টিনার আদালতে আবারও শুরু হয়েছে ফুটবল কিংবদন্তিরর মৃত্যুর বিচার। সরকারপক্ষের আইনজীবীরা এবার সরাসরি বলেছেন, ম্যারাডোনার চিকিৎসক দল তাঁকে বাঁচানোর সুযোগ পেয়েও কাজে লাগায়নি।

আরও পড়ুন

আর্জেন্টিনার সান ইসিদ্রোর একটি আদালতে প্রায় এক বছর পর নতুন করে এই বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আগেরবার বিচারপ্রক্রিয়া মাঝপথে বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণটাও অদ্ভুত। তখন জানা গিয়েছিল, প্রধান বিচারক নিজেই মামলাটি নিয়ে তৈরি একটি গোপন তথ্যচিত্রে অংশ নিয়েছেন। এরপর তিনি সরে দাঁড়ালে আড়াই মাসের শুনানির পর বিচারকাজ বাতিল হয়ে যায়।

আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনা
রয়টার্স

২০২০ সালের নভেম্বরে মাত্র ৬০ বছর বয়সে মারা যান ম্যারাডোনা। মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বাঁধার কারণে অস্ত্রোপচারের পর বাড়িতেই চলছিল তাঁর সেরে ওঠার প্রক্রিয়া। কিন্তু অস্ত্রোপচারের দুই সপ্তাহ পর হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে এবং ফুসফুসে পানি জমে তাঁর মৃত্যু হয়। এখন বলা হচ্ছে, এই মৃত্যু হয়তো এড়ানো যেত। ম্যারাডোনার চিকিৎসক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ—তাঁরা হাসপাতালে না রেখে তাঁকে বাড়িতে সুস্থ হতে পাঠিয়েছিলেন, যেটি ছিল দায়িত্বে চরম গাফিলতি এবং ভুল সিদ্ধান্ত।

আরও পড়ুন

নতুন করে শুরু বিচারে চিকিৎসক, মনোবিদ ও নার্সসহ মোট সাতজন স্বাস্থ্যকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ‘সম্ভাব্য ইচ্ছাকৃত হত্যা’। অর্থাৎ তাঁরা জানতেন তাঁদের সিদ্ধান্তে ম্যারাডোনার মৃত্যু হতে পারে, তবু তাঁরা সেই পথেই হেঁটেছেন। দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁদের ৮ থেকে ২৫ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

চিকিৎসক লিওপোলদো লুকের সঙ্গে ডিয়েগো ম্যারাডোনা
এএফপি

সরকারপক্ষের আইনজীবী পাত্রিসিও ফেরারি বিচারপ্রক্রিয়ার শুরুতেই আদালতে বলেছেন, ম্যারাডোনার চিকিৎসাসেবা ছিল ‘সব ধরনের অবহেলায়’ ভরা এবং পরিস্থিতি ছিল ‘নিষ্ঠুর’। তিনি আরও বলেন, ‘ম্যারাডোনা তাঁর প্রকৃত মৃত্যুর ১২ ঘণ্টা আগে থেকেই মারা যেতে শুরু করেছিলেন। শেষ সপ্তাহে যদি কেউ তাঁকে গাড়িতে বা অ্যাম্বুলেন্সে করে ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতেন, তাহলে তাঁর জীবন বাঁচানো যেত।’

সান ইসিদ্রোর ঠাসা আদালতকক্ষে ম্যারাডোনার তিন মেয়ে দালমা, জিয়ানিনা ও জানা এবং তাঁর সাবেক সঙ্গী ভেরোনিকা ওহেদা উপস্থিত ছিলেন। ওহেদা পরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের সবার একটাই চাওয়া—ডিয়েগোর জন্য ন্যায়বিচার। আমরা শান্তিতে বাঁচতে চাই, আর চাই ডিয়েগোও যেন শান্তিতে ঘুমাতে পারেন।’

বুয়েনস এইরেসের সান ইসিদরো আদালতে হাজির হয়েছিলেন ম্যারাডোনার মেয়ে দালমা ম্যারাডোনা
এএফপি

দালমা ও জিয়ানিনাকে পাশে নিয়ে ম্যারাডোনার আইনজীবী ফের্নান্দো বুরলান্দো এদিন আদালতে একটি স্তেথোস্কোপ উঁচিয়ে ধরেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘চিকিৎসাবিজ্ঞানের এত গুরুত্বপূর্ণ এই যন্ত্রটি ১১ থেকে ২৫ নভেম্বর—এই দুই সপ্তাহে একবারও ম্যারাডোনার বুকে ঠেকানো হয়নি।’ অর্থাৎ মৃত্যুর আগের দুই সপ্তাহ ম্যারাডোনার ন্যূনতম স্বাস্থ্য পরীক্ষাও করেননি অভিযুক্ত চিকিৎসক, মনোবিদ ও নার্সরা।

অবশ্য অভিযুক্তদের আইনজীবীরা দাবি করছেন, ম্যারাডোনার মৃত্যু ছিল স্বাভাবিক। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আগুস্তিনা কোসাচোভের আইনজীবী ভাদিম মিশানচুক আদালতে বলেছেন, ‘আমরা প্রমাণ করব যে ম্যারাডোনার মৃত্যু হয়েছে তাঁর স্বাস্থ্যের দীর্ঘদিনের অবনতির কারণে, যা এক সময় সীমার বাইরে চলে গিয়েছিল।’

আদালতের বাইরেও এদিন অর্ধ শতাধিক ম্যারাডোনা-ভক্ত আর্জেন্টিনার পতাকা ও পোস্টার হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁদের হাতে ছিল ‘ম্যারাডোনার জন্য ন্যায়বিচার চাই’ লেখা পোস্টার।

আগামী জুলাই মাস পর্যন্ত চলবে এই বিচারপ্রক্রিয়া। এই সময়ের মধ্যে প্রায় ১২০ জন সাক্ষীর জবানবন্দি নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন