বিদায়ের মাঠ মনুমেন্তালই সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছে মেসিকে

লিওনেল মেসির বাঁ পায়ের নিচে বল। আকাশি–সাদা বুটে তাঁকে এভাবে দেখার সময় এখন একদমই শেষের পথেএএফএ ফেসবুক পেজ

আর কোনো স্টেডিয়াম লিওনেল মেসিকে এতটা ভালোবাসেনি। সেই মনুমেন্তালেই আকাশি–সাদায় শেষবারের মতো দেখা দেবেন মেসি। কী এক ভালোবাসার বন্ধনে মনুমেন্তাল তাঁর সোনার ছেলেকে বেঁধেছে, তার আসলে ব্যাখ্যা হয় না। যেমনটা হয় না মেসিকে বল পায়ে দেখলেই বুকের ভেতর বয়ে চলা ঝড়ের ব্যাখ্যা।

রিভার প্লেটের এই মাঠে আগামী বুধবার বাংলাদেশ সময় ভোরে শেষবারের মতো উঠবে সেই আকাশি–সাদা ঝড়। শেষ বাঁশি বাজার পর সেই ঝড় যখন থামবে, তখন কী মনুমেন্তালের প্রাণ জুড়াবে? না, ভালোবাসার সাধ যে কখনো মেটে না।

একটা কংক্রিটের স্থাপনার সঙ্গে মেসির সেই ভালোবাসার সম্পর্ককে বোঝানো যায় একটি বাক্যেই—আর্জেন্টিনায় রিভার প্লেটের এ স্টেডিয়ামে মেসির গোলসংখ্যা (১৯) সবচেয়ে বেশি। মনুমেন্তাল তাঁকে দিয়েছে দুহাত ভরে। বিদায়বেলায় প্রাণহীন সেই কংক্রিটের স্থাপনাকে মেসির তো কিছু ফিরিয়ে দিতেই হবে। স্টেডিয়ামটি কথা বলতে পারলে হয়তো বলে উঠত, ‘কিছুই চাই না আমার গোল ছাড়া!’

মনুমেন্তালে মেসি সর্বশেষ খেলেন গত বছরের সেপ্টেম্বরে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে ভেনেজুয়েলা ম্যাচে। আর্জেন্টিনার ৩–০ গোলের জয়ে তাঁর দুটি। ২১ বছরের আকাশি–সাদা ক্যারিয়ারে আর্জেন্টিনায় অন্য স্টেডিয়ামে মেসি কখনো কখনো সংকট কিংবা বিতর্কের সম্মুখীন হয়েছেন; কিন্তু আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের এই ঘরের মাঠে তাঁর শুধুই সুখস্মৃতি।

আর্জেন্টিনা দলে সতীর্থদের সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল মেসি
এএফএ ফেসবুক পেজ

আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় এই স্টেডিয়ামে জাতীয় দলের হয়ে মেসি কখনো হারেননি। ২৮ ম্যাচে ২২ জয়, ৬ ড্র। ১০ গোল। ম্যাচপ্রতি গড়ে গোল ০.৬৭। বিদায়ী ম্যাচে ৮৫ হাজার আসনের মনুমেন্তালের নিশ্চয়ই কোনো বিশেষ চাওয়া থাকবে। সেটা এমন হতে পারে—জাতীয় দলে মেসির ক্যারিয়ার যেহেতু ২১ বছরের, সে কারণে বিদায়ী ম্যাচে মেসি দুটি গোল করলেই মনুমেন্তালে তাঁর গোলসংখ্যা ওই সময়ের সমার্থক হয়ে যায়!

আরও পড়ুন

প্রথম স্পর্শ

এই অক্টোবরেই! সঠিক দিন–তারিখ বললে ২০০৫ সালের ৫ অক্টোবর। ২০০৬ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে পেরুর বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ২–০ গোলে জয়ের ম্যাচটি ছিল মনুমেন্তালে জাতীয় দলে মেসির প্রথম ম্যাচ। গোল না পেলেও কোচ হোসে পেকারম্যানের অধীনে দুর্দান্ত খেলেছিলেন। ১৮ বছর বয়সী মেসি পেনাল্টি আদায় করেছিলেন পেরুর কাছ থেকে। স্পটকিক থেকে গোলটি হোয়ান রোমান রিকেলমের। অন্য গোলটি আত্মঘাতী।

বুয়েনস এইরেসে মনুমেন্তাল স্টেডিয়াম
উইকিপিডিয়া

প্রথম গোল

সেটাও এই অক্টোবরেই! ২০০৮ সালের ১১ অক্টোবর। ২০১০ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ছিল উরুগুয়ে। জয়খরায় ভোগা আলফি বাসিলের আর্জেন্টিনার হয়ে ৫ মিনিটে হেডে গোল করেছিলেন মেসি। মনুমেন্তালে সেটাই তাঁর প্রথম জাল স্পর্শের স্বাদ। অন্য গোলটি ছিল সের্হিও আগুয়েরোর।

প্রথম আলো

২ জুন, ২০১২। সেদিনই প্রথম সত্যিকারের মেসি–আলো দেখেছিল মনুমেন্তাল। ২০১৪ বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ম্যাচে ইকুয়েডরকে ৪–০ গোলে হারায় আলেহান্দ্রো সাবেয়ার আর্জেন্টিনা। চারটি গোলেই অবদান ছিল মেসির। প্রথমে আগুয়েরোর গোলটির সুযোগ তৈরি করেন। এরপর গঞ্জালো হিগুয়েনকে দিয়ে গোল করান। নিজেও একটি গোল করেন। শেষ গোলটি করান আনহেল দি মারিয়াকে দিয়ে।

প্রথম রক্ষাকর্তা

মনুমেন্তালে মেসিকে এ ভূমিকায়ও দেখা গেছে। ২০১৭ সালে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে চিলির বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল করে আর্জেন্টিনাকে জেতান মেসি। সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনা দলে শুধু মেসিই চিলির মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ান। পেনাল্টি থেকে গোল করে দলের জয় নিশ্চিত করেন। সেই জয়ে পয়েন্ট তালিকায় আবারও লড়াইয়ে ফিরেছিল আর্জেন্টিনা।

প্রথম আলো গ্রাফিকস

প্রথম হ্যাটট্রিক

২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর। কোভিড মহামারি পেরিয়ে সেদিনই আর্জেন্টাইনরা প্রথম এই স্টেডিয়ামে ফেরার সুযোগ পান। ব্রাজিলে কোপা আমেরিকা জয়ের পর ঘরের মাঠে সেটা ছিল আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচ। মাত্র ৩০ শতাংশ দর্শক প্রবেশের অনুমতি থাকলেও সেদিন মেসির অসাধারণ খেলাটা নিশ্চয়ই আজও মনে রেখেছেন অনেকেই।
বলিভিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩–০ গোলের জয়ে সব কটি গোলই ছিল মেসির। সেই ম্যাচেই দক্ষিণ আমেরিকান জাতীয় দলের হয়ে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে পেলের রেকর্ড ভেঙে দেন মেসি। ৭৯ গোলে ছাড়িয়ে যান ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তিকে।

আরও পড়ুন

ট্রফি উদ্‌যাপন

কাতার থেকে ফেরা আর্জেন্টিনা তখন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। তাদের বরণ করে নিতে ২০২৩ সালের ২৩ মার্চ সেজেছিল মনুমেন্তাল স্টেডিয়াম। মেসি ছিলেন মধ্যমণি। ছিল পানামার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচও। ২–০ গোলের জয়ে ফ্রি–কিক থেকে একটি গোল করেন। আর্জেন্টিনার জার্সিতে তা ছিল মেসির ৯৯তম ম্যাচ এবং ক্যারিয়ারের ৮০০তম। ম্যাচ শেষে দর্শকদের সঙ্গে বিশ্বকাপ জয় উদ্‌যাপন করেন মেসি।

শেষ পয়েন্টের ম্যাচ

২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ভেনেজুয়েলার মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা। দেশের মাটিতে সেটাই ছিল মেসির সর্বশেষ অফিশিয়াল ম্যাচ। জোড়া গোল করে আর্জেন্টিনাকে ৩–০ গোলে জেতান মেসি।