লিভারপুলে ‘নির্মম’ হয়ে ওঠা কে এই কিশোর

মাঠ ছেড়ে উঠে আসার পর লিভারপুল কোচ ইরাওলার সঙ্গে হাত মেলান এনগোমোহারয়টার্স

সাত গোলের ম্যাচ। একটি গোলও করতে পারেননি। তবু অ্যানফিল্ডের রাতটা ১৮ বছর বয়সী রিও এনগোমোহার। এমন এক রাত—এনগোমোহার পারফরম্যান্স দেখে যে রাতে লিভারপুলের একটু বয়স্ক সমর্থক স্মৃতি হাতড়েছেন। ক্লাব ফুটবলে সবচেয়ে বড় মঞ্চে লিভারপুলের হয়ে এতটা কম বয়সে এর আগে এত ভালো খেলেছেন কে?

‘দ্য অ্যাথলেটিক’ এর উত্তর, কেউ না!

অ্যানফিল্ডে গতকাল রাতের একটি মুহূর্ত দেখে ব্যাপারটা আন্দাজ করে নেওয়া যায়। প্রথমে ফ্লোরিয়ান ভির্টৎস, তারপর আলেকসান্দার ইসাক এবং তারপর ৭৪ মিনিটে এনগোমায়ার বদলি হিসেবে ব্র্যাডলি বারকোলাকে নামান লিভারপুলের কোচ আন্দনি ইরাওলা। এই তিন বদলি খেলোয়াড়ের একেকজনের দাম ১০ কোটি পাউন্ডের বেশি। তবু তাঁরা কেউই আলো কাড়তে পারেননি, যতটা ৭৪ মিনিটে বদলি হয়ে উঠে যাওয়ার আগেই কেড়েছেন এনগোমোহা।

তাঁর উঠে যাওয়ার সময় ‘রিও, রিও, রিও’ স্লোগানে প্রকম্পিত অ্যানফিল্ডের গ্যালারি। শেষ বাঁশি বাজার পর স্পিকারেও বাজল ব্রিটিশ ব্যান্ড ‘ডুরান ডুরান’ এর ‘রিও’ গান। ম্যাচসেরা এনগোমোহাকে মাঠে জড়িয়ে ধরেন লিভারপুল গোলকিপার আলিসন বেকার। অ্যানফিল্ডের গ্যালারিও পারলে সেটাই করত।

তার কারণ শুধু এনগোমোহার দুটো অ্যাসিস্ট (গোল বানানো) নয়, যেভাবে খেলেছেন সেই ঝলকানিটুকু চোখে লেগে ছিল লিভারপুল সমর্থকদের। ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে ২–০ গোলে পিছিয়ে পড়া লিভারপুল তাঁর ওই দুটো অ্যাসিস্টে ৩–২ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর ম্যাচও জেতে ৪–৩ গোলে। মজার বিষয়, অ্যালেক্সিস–ম্যাক অ্যালিস্টার, আরাউহো এবং ভির্টৎসরা গোল পেলেও তাঁদের নিয়ে তেমন আলোচনা নেই। কারণ হয়তো কিশোর বয়সী এই উইঙ্গারের প্রতিপক্ষের জন্য ‘আনপ্লেয়েবল’ হয়ে ওঠা।

বড় তারকা হয়ে উঠতে পারবেন তো এনগোমোহা
এএফপি

দ্বিতীয়ার্ধে উইংয়ে তাঁকে ঠেকাতে রীতিমতো হিমশিম খেয়েছে ভিয়ারিয়াল রক্ষণ। তার আগে লিভারপুলের আক্রমণেও তাঁর নেতৃত্ব ছিল। সিনিয়র তারকা খেলোয়াড়েরা তাঁর বানানো খেলায় খেলেছেন। সব মিলিয়ে ২ অ্যাসিস্ট, ৩টি গোলের সুযোগ তৈরি ও ৭টি সফল ড্রিবলিংয়ে রীতিমতো আলো ছড়িয়েছেন। ১৯৯৮ সালে মাইকেল ওয়েনের রেকর্ড ভেঙে ইউরোপিয়ান টুর্নামেন্টে লিভারপুলের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে গোল করানোর রেকর্ড এখন এনগোমোহার। তবে একাধিক গোল করানো সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়দের তালিকায় তৃতীয়।

আরও পড়ুন

বল পায়ে এলে নিজের দর্শনটা এনগোমোহা খোলাসা করলেন ম্যাচ শেষে, ‘বল পেয়ে ওয়ান-অন-ওয়ান কিংবা টু-অন-ওয়ানের সুযোগ তৈরি হলে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখি। আমি শুধু সামনে এগিয়ে যেতে চাই এবং আরও বেশি নির্মম হতে চাই।’

এই বয়সী একটি ছেলের মুখ থেকে ‘নির্মম’ শব্দটা শুনতে কেমন লাগে! আসলে এনগোমোহার কিছু করার নেই। বাস্তবতা তাঁকে নির্মম হয়ে ওঠার পথে টেনেছে। লিভারপুলে মূল দলে জায়গা পান গত মৌসুমে বাঁ উইংয়ে। কিন্তু বারকোলা আসার পর নিজের পছন্দের পজিশনে খেলাটা তাঁর জন্য কঠিন হয়ে ওঠে। ভিক্টর মুনোজের আসা ও কোডি গাকপোর ফর্মে ফেরা তাঁর পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। এমন পরিস্থিতিতে তাঁর বয়সী সাধারণ কোনো ফুটবলারের রণে ভঙ্গ দেওয়ার কথা। কিন্তু এনগোমোহা অন্য ধাতে গড়া কিশোর। এই মৌসুমে কিছু করে দেখানোর তাড়না ছিল তাঁর মধ্যে। সেই জিদের বশেই গতকাল রাতে আলো জ্বেলেছেন ডান প্রান্তে।

উইংয়ে ছুটতে পছন্দ করেন এনগোমোহা। ড্রিবলিংয়েও পারদর্শী
এএফপি

সেখানেও এনগোমোহার দর্শন সেই একই, যেটা ইএসপিএনকে বলেছিলেন মৌসুমের শুরুতে, ‘যেকোনো পজিশন, ডান উইং বা বাঁ উইং—আমি শুধু নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করি, বিশেষ করে বল পায়ে থাকলে ডিফেন্ডারকে যতটা সম্ভব ভালোভাবে কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি।’

লিভারপুলও তাঁর এই বহুমুখী প্রতিভার সুফল পাচ্ছে। গত সপ্তাহে লাস্ক লিনজের বিপক্ষে ডান প্রান্তে শুরুর একাদশে নেমে ভালো খেলেন এবং তারপর ব্রেন্টফোর্ডের বিপক্ষেও বদলি নেমে ছিলেন দুর্দান্ত। আর কাল রাতে ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে? চ্যাম্পিয়নস লিগে কোনো ম্যাচে পাঁচ বা তার বেশি ড্রিবল (৭টি), প্রতিপক্ষের বক্সে ১০ বা তার বেশিবার বল স্পর্শ (১২টি) এবং অ্যাসিস্ট (দুটি) করা সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় এখন এনগোমোহা।

তবে লিভারপুল কোচ ইরাওলার বিশ্বাস, এটুকু এনগোমোহার পুরোটা নয়, ‘রিওর বয়স এখনো মাত্র ১৮ বছর, সে এখনো পরিণত নয়। নিজের খেলায় আরও উন্নতি করতে পারবে এবং আমি আশা করি সে এভাবেই এগিয়ে যাবে।’

কে এই এনগোমোহা

জন্ম ইংল্যান্ডে। বাবা নাইজেরিয়ান, মা ফ্রান্সের অধীন গুয়াদেলুপিয়ান নাগরিক। নাইজেরিয়ান ও ফরাসি জাতীয়তা থাকলেও ইংল্যান্ডের বয়সভিত্তিক দলগুলোর ধাপ পাড়ি দিয়ে এ বছর জাতীয় দলেও জায়গা পান। তিনটি ম্যাচ খেলেছেন ইংল্যান্ডের হয়ে। ওয়েইন রুনি ও জুড বেলিংহামের পর তৃতীয় সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে ইংল্যান্ডের হয়ে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলেন এনগোমোহা।

ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতিতে ভয়ংকর এনগোমোহা
এএফপি

ক্লাব ফুটবলে এনগোমোহার যাত্রা শুরু আট বছর বয়সে চেলসি একাডেমিতে। ১৬তম জন্মদিনের কয়েক দিন পর চেলসি ছেড়ে এনগোমোহা যোগ দেন লিভারপুলের একাডেমিতে। এ দলবদলে দুই ক্লাবের মধ্যে সম্পর্কও খারাপ হয়। লিভারপুল স্কাউটদের তাদের একাডেমি ম্যাচগুলোতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে চেলসি। ধারণা করা হয় সেটা এনগোমোহাকে ‘হারানোর প্রতিক্রিয়া’।

এনগোমোহার জীবনে ফুটবল খেলার প্রথম স্মৃতি তাঁর ভাইয়ের বদৌলতে। ইংল্যান্ড ফুটবলের ওয়েবসাইটে গল্পটা উঠে এসেছে তাঁর নিজের লেখায়, ‘ফুটবলে আমার প্রথম স্মৃতি হলো স্থানীয় দলের হয়ে আমার ভাইয়ের খেলা দেখা। ভাই বার্কিং এফসি নামের একটা দলের হয়ে খেলত। মনে আছে, আমি স্থানীয় দলের হয়ে একটা ম্যাচে খেলেছিলাম এবং একটা অ্যাসিস্টও করি। কিন্তু কান্নাকাটি শুরু করে দিই, কারণ আমার চেয়ে বড় ছেলেদের সঙ্গে খেলছি এবং ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। এটাই ফুটবলে আমার প্রথম স্মৃতি।’

এনগোমোহা অ্যাসিস্ট করেছেন কাল রাতেও। অর্থাৎ ফুটবলে তাঁর প্রথম স্মৃতির মতো সর্বশেষ স্মৃতিতেও অ্যাসিস্ট!