অবসরের পর মেসির সময় কাটবে কীভাবে
শেষ হলো আর্জেন্টিনার ফুটবলে লিওনেল মেসি পর্ব। মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে হাজার হাজার দর্শকের সামনে বিদায় নিয়েছেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক। জাতীয় দলের হয়ে ২০৮তম ম্যাচ খেলে বিদায় নিলেন সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। তবে ক্লাব ফুটবলে মেসির পথচলা এখনো চলবে।
ইন্টার মায়ামির সঙ্গে মেসির চুক্তির মেয়াদ ২০২৮ সালের শেষ পর্যন্ত। তবে চুক্তিটি প্রতিবছর পর্যালোচনা করা হয়। মেসির ঘনিষ্ঠজনেরা মনে করেন, মানসিক ও শারীরিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত মনে করলে এই চুক্তি নবায়নের সম্ভাবনাই বেশি।
কিন্তু এরপর কী করবেন? উত্তরটা এখনই দিয়ে দেওয়া কঠিন। কারণ, মেসি খুব বেশি ভবিষ্যৎ-পরিকল্পনার করেন না বলেই দাবি তাঁর কাছের মানুষদের। তারপরও সামনে কী হতে পারে, তার একটা চিত্র এখনই দেখা যাচ্ছে।
মেসি আসলে ফুটবলের সঙ্গেই থাকবেন। ফুটবল ছাড়া জীবন কাটানো তাঁর জন্য কঠিন হবে। তবে তাঁর অন্যান্য ব্যবসায়িক আগ্রহ ফুটবলের গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত।
একসময় মেসির কাছে স্পোর্টিং ডিরেক্টর হওয়া কিংবা ক্লাব সভাপতির উপদেষ্টা হওয়ার ধারণাটি ভালো লাগত। অর্থাৎ যেখানে ভ্রমণের ক্লান্তি ও একের পর এক ফোনকলের ঝক্কি না নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো বসে নেওয়া যায়।
সম্প্রতি মেসিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ভবিষ্যতে কোচ হতে চান নাকি ক্লাবের মালিক? মেসি বেছে নিয়েছেন মালিকের ভূমিকা। তাঁর মতে, একজন কোচের ভাগ্য ম্যাচের ফলাফলের ওপর ঝুলে থাকে। মেসির মতো মানুষের জন্য এত কিছু নিয়ে মাথা ঘামানো বেশ কঠিন।
কিন্তু একজন মালিক কিছুটা নেপথ্যে থেকে ক্লাবের দিকনির্দেশনা ঠিক করেন। তবে তিনি এমন মালিক হবেন না, যিনি শুধু কোচ নিয়োগের ফাইলে সই করেই হাত গুটিয়ে নেবেন। মেসি চান সবকিছুর ভেতরে থাকতে।
এরই মধ্যে স্পেনে মেসির এই পরিকল্পনার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়ে গেছে। গত এপ্রিলের বার্সেলোনার কাছে স্পেনের পঞ্চম বিভাগের দল ইউই কর্নেয়া ক্লাবটি কিনে নেন মেসি। এরপর অক্টোবর স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগের দল সিডি এলদেন্সের নতুন মালিক হিসেবে মেসির নাম ঘোষণা করা হয়, যা এখন স্প্যানিশ স্পোর্টস কাউন্সিলের (সিএসডি) চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।
মেসির ফুটবল সাম্রাজ্যের নেতৃত্ব দেবে এই এলদেন্সই। তবে চলতি মৌসুমে দলের মূল লক্ষ্য রেলিগেশন বা অবনমন এড়ানো। তাই নতুন মালিক আসার পরই ক্লাবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ভিয়ারিয়ালের সাবেক কোচ হাভি কায়েহাকে।
পরিকল্পনা হলো নিজের বিশ্বস্ত মানুষদের দিয়ে আপাতত দুটি ক্লাব পরিচালনা করা। যতক্ষণ মেসি নিজে পুরোপুরি সময় দিতে পারছেন না, তারা মেসি ও ক্লাব দুটির মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে চলবেন।
এখন দূর থেকেই এলদেন্সের প্রতিটি ম্যাচ গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখেন মেসি। রিয়াল ওভিয়েদোকে ৪-১ গোলে হারানোর পর মালিক হিসেবে তাঁর প্রথম সোশ্যাল মিডিয়া বার্তা ছিল—ইনস্টাগ্রামে লেখা ‘আউপা দেপোর্তিভো’ , যাঁর বাংলা ‘এগিয়ে যাও দেপোর্তিভো।’
মালিক হওয়ার মাত্র দু-এক দিনের মধ্যে অন্তত ডজনখানেক পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এসেছে মেসির ক্লাবের জন্য। এর মধ্যে কিছু ব্র্যান্ড আগের মালিকদের সঙ্গে দরদাম করেও চুক্তি করেনি, আর কিছু ব্র্যান্ড আগে থেকেই মেসির সঙ্গে যুক্ত।
শুধুই স্পেনেই নয়, ২০২৫ সালের মে মাসে উরুগুয়েতে লুইস সুয়ারেজকে সঙ্গে নিয়ে মেসি প্রতিষ্ঠা করেন ‘দেপোর্তিভো এলএসএম’। প্রথম মৌসুমেই দলটি দেশের তৃতীয় বিভাগে উন্নীত হয়। শুরুতে আরও কয়েকটি ক্লাব নিয়ে বড় একটি নেটওয়ার্ক তৈরির আলোচনা হয়েছিল।
তবে নিচের সারির দলগুলোকে ওপরের দিকে তুলতে যে বিপুল অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন, তা দেখে সেই ভাবনা আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। মেসির মূল মনোযোগ এখন এলদেন্সকে স্পেনের শীর্ষস্তর লা লিগায় প্রতিষ্ঠিত করা।
যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টার মায়ামির সঙ্গেও তার একটি যোগাযোগ আছে। মায়ামির সঙ্গে চুক্তির অংশ হিসেবে অবসর নেওয়ার পর ক্লাবটির কিছু শেয়ার পাবেন তিনি। তবে আলাদা কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি খোলার ইচ্ছে আপাতত তাঁর নেই।
শৈশবের ক্লাব নিউয়েলস ওল্ড বয়েজে কি তিনি কখনো ফিরে যাবেন? আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো আলোচনা কখনোই হয়নি। তাঁর ঘনিষ্ঠদের কেউই এমন কিছু আশা করছেন না। মেসির সবকিছু এখন ইউরোপ আর মায়ামিকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। আর পরিবারের জন্যও আসল ঠিকানাও মেসির জন্য সব সময় বার্সেলোনা।
তবে নিউয়েলসের সঙ্গে যোগাযোগটা একদম বিচ্ছিন্নও হয়ে যায়নি। এবার ‘মেসি কাপ’ নামে টুর্নামেন্ট যে ১৬টি ক্লাব অংশ নিয়েছিল, তাঁর মধ্যে ছিল তারাও। ক্লাবের মালিক হওয়ার পাশাপাশি তরুণ ফুটবলারদের গড়ে তোলার প্রতি মেসির আলাদা ভালোবাসা আছে। নিজের ছেলের ম্যাচগুলো নিয়মিত দেখা কিংবা মেসি কাপে সার্বক্ষণিক উপস্থিতিতে সেটি টের পাওয়া যায়।
অনূর্ধ্ব-১৬ একাডেমিগুলো নিয়ে আয়োজিত ‘মেসি কাপে’ তিনি নিজের অর্থ ও সময় দুটোই বিনিয়োগ করছেন। ২০২৫ সালে মাত্র ৮টি দল নিয়ে এটি শুরু হয়েছিল। প্রথম বছর আয়োজকেরা ভেবেছিলেন মেসি হয়তো দু-একটি ম্যাচ বা কেবল ফাইনাল দেখতে আসবেন। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে টুর্নামেন্টের প্রতিদিন প্রতিটি ম্যাচ তিনি মাঠে বসে উপভোগ করেছেন।
মাঠের বাইরেও মেসি বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। গত জুনে ফোর্বস জানিয়েছে, তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ১.১ বিলিয়ন ডলার। গত এক বছরেই ফুটবল ও ব্যবসা থেকে তাঁর আয় প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ডলার।
২০১৭ সালে ‘অ্যাডিডাস’-এর সঙ্গে করা আজীবন মেয়াদি চুক্তি করেছেন। তবে এখন তাঁর সবচেয়ে দৃশ্যমান চুক্তি ‘এমআইএম হোটেলস’। ইবিজা থেকে অ্যান্ডোরা পর্যন্ত বিস্তৃত এই ছয়টি বুটিক হোটেল ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর থেকে ভাড়ার চুক্তিতে পরিচালনা করছেন মেসিও। মেসি এবং ম্যাজেস্টিক হোটেল গ্রুপের নাম মিলিয়ে এর নামকরণ করা হয়েছে ‘মিএম’।
নিজের জন্মশহরের প্রতি টান থেকেও বিনিয়োগ থামেনি। রোজারিওতে পারানা নদীর তীরে ‘কারাসকো এম’ নামে ২৪টি বিলাসবহুল বাড়ির আবাসন প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে তাঁর পারিবারিক প্রতিষ্ঠান। আর এই বাড়ি বিক্রির দায়িত্বে আছে মেসির সাবেক সতীর্থ ও বন্ধু আনহেল দি মারিয়ার রিয়েল এস্টেট এজেন্সি।
স্পেনে জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ চেইন ‘এল ক্লাব দে লা মিলাইনেসা’র অংশীদারও মেসি। কাতালোনিয়ায় পাঁচটি নতুন শাখা খোলার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের, যার প্রথমটি চালু হচ্ছে কাসতেলদেফেলসে।
বিখ্যাত ড্রিংকওয়্যার ব্র্যান্ড ‘স্ট্যানলি’র সঙ্গেও চুক্তি আছে মেসির। কোনো ক্রীড়াবিদের সঙ্গে এটিই ব্র্যান্ডটির প্রথম বহু বছরের চুক্তি, যেখানে কাপের উপাদান থেকে শুরু করে রং নির্বাচনের মতো বিষয়েও মেসি নিজে মতামত দিয়েছেন।
মেসির এই ব্যবসায়িক সফরের সূচনা হয়েছিল তাঁর বাবা হোর্হে মেসির হাত ধরে, যিনি গত আগস্ট ৬৮ বছর বয়সে মারা যান। শুরু থেকেই তিনি ছেলের সবকিছু দেখাশোনা করতেন। তবে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার আগে টিভি প্রডাকশন, মার্কেটিং, মিডিয়া, কমার্শিয়াল পার্টনারশিপসহ নানা শাখায় ছড়িয়ে এক শক্ত ভিত্তি দিয়ে যান ব্যবসাকে।
মেসি এখন তাঁর বিশ্বস্ত টিম দিয়ে এসব পরিচালনা করেন। বার্সেলোনায় শুরুর দিনগুলো থেকে যাঁরা সঙ্গে আছেন, তাঁরাই সবকিছু নিখুঁতভাবে যাচাই-বাছাই করে মেসির সামনে আনেন। আর মেসি কেবল তা-ই বেছে নেন, যা নিয়ে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
ব্যবসায়িক দুনিয়ায় মেসির নিজস্ব কিছু নীতি রয়েছে, সেখানে কেউ তাঁর ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না। গত নভেম্বরে মায়ামিতে ‘আমেরিকা বিজনেস ফোরাম’-এ মেসি নিজেই বলেছিলেন, ‘ব্যবসা এমন একটা বিষয় যা আমাকে সত্যিই টানে। আমি আরও শিখতে চাই, কারণ সবেমাত্র শুরু করেছি এবং এখনো অনেক কিছুই জানি না।’