ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে ‘১১৫’ অভিযোগ: কেন থমকে আছে প্রিমিয়ার লিগের সবচেয়ে আলোচিত বিচার

ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে আর্থিক নীতিমালা ভাঙার গুরুতর অভিযোগ রয়েছেম্যানচেস্টার সিটি ওয়েবসাইট

তিন বছরের বেশি সময় কেটে গেছে। তবু ঝুলে আছে ইংলিশ ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত মামলা।
ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে প্রিমিয়ার লিগ কর্তৃপক্ষের আনা সেই বহুল আলোচিত ‘১১৫ অভিযোগের’ বিচার যেন কোনো দিনই শেষ হওয়ার নয়! আসলে কোন অবস্থায় আছে এই বিচার প্রক্রিয়া? ইএসপিএনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সেই উত্তরই খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে।

সিটির বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো কী কী

অভিযোগের তালিকাটা দীর্ঘ—আর্থিক অনিয়ম, ভুয়া হিসাব দাখিল, তথ্য গোপন করে অর্থ লেনদেন, আর তদন্তে অসহযোগিতা। সবই মূলত আর্থিক নিয়ম এড়ানোর কৌশল। সিটি অবশ্য সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

‘১১৫ অভিযোগ’—আসলে কত

এ মামলাকে অনেকে ‘১১৫ অভিযোগ’ বলেন। কারণ, প্রাথমিক নথিতে ছিল ১১৫টি বুলেট পয়েন্ট। কিন্তু একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিটির প্রকৃত নিয়মভঙ্গের সংখ্যা ১৩০-ও হতে পারে। কিছু অভিযোগ একে অপরের সঙ্গে ওভারল্যাপও করতে পারে।
শুনানির পর আরও অভিযোগ যুক্ত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়। তবে শোনা যায়, তদন্তে সহযোগিতা না করার অভিযোগ বাড়তে পারে।

সিটি তাদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
রয়টার্স

কী শাস্তি হতে পারে

অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তির পরিধি বিশাল। জরিমানা থেকে শুরু করে পয়েন্ট কাটা, শিরোপা কেড়ে নেওয়া, এমনকি প্রিমিয়ার লিগ থেকে বহিষ্কার পর্যন্ত হতে পারে। অন্য ক্লাবগুলো ক্ষতিপূরণ চাইলে সিটিকে সেটাও দিতে হতে পারে।

আরও পড়ুন

তদন্ত শুরু হয়েছিল কবে

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে জার্মান সাময়িকী ডের স্পিগেল প্রকাশিত ‘ফুটবল লিকস’ নথি থেকেই তদন্তের সূত্রপাত। তবে বিষয়টা জনসমক্ষে আসে ২০২১ সালের মার্চে, উচ্চ আদালত সিটির আপত্তি খারিজ করে তদন্তকারীদের নথি দেখার অনুমতি দেওয়ার পর। শুনানি শুরু হয় ২০২৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর, লন্ডনের ইন্টারন্যাশনাল ডিসপিউট রেজল্যুশন সেন্টারে। শেষ হয় একই বছরের ডিসেম্বরে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিটি কোচ পেপ গার্দিওলা বলেছিলেন, তাঁর প্রত্যাশা এক মাসের মধ্যে রায় আসবে।

ম্যানচেস্টার সিটির কোচ পেপ গার্দিওলা।
এএফপি

এত দেরি কেন

শুনানি শেষ হওয়ার পর এক বছরের বেশি সময় কেটে গেছে, তবু রায় আসেনি। কারণ? মামলাটি অতিজটিল। প্রতিটি অভিযোগ আলাদাভাবে প্রমাণ করতে হবে। সিটির বিরুদ্ধে শুধু নিয়মভঙ্গ নয়, ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্ত করা ও তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগও আছে। ফলে অভিযোগ আনা প্রিমিয়ার লিগ কর্তৃপক্ষকে এসবের প্রমাণ দিতে হবে, যা সহজ নয়।

এ মামলার রায় দেবে তিন সদস্যের একটি স্বাধীন প্যানেল। গোপনীয়তা এতটাই কঠোর যে বিচারক প্যানেলের তিন সদস্যের নাম পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কেউ জানে না! তবে কমিশনের সদস্যরা পূর্ণকালীনভাবে এ মামলায় কাজ করছেন না। তাঁদের অন্য দায়িত্বও আছে। তাই সময় লাগছে। প্যানেল শুধু রায় দেবে না, দেবে ‘লিখিত কারণ’ও। কেন, কীভাবে তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন—সব ব্যাখ্যা থাকবে সেখানে। এই লিখিত ব্যাখ্যাই ভবিষ্যতের আপিলের ভিত্তি হতে পারে। সিটি আপিল করতে পারে। করতে পারে প্রিমিয়ার লিগও। তাই সিদ্ধান্ত হতে হবে নিখুঁত।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রিমিয়ার লিগ থেকে বহিষ্কার হতে পারে সিটি
এএফপি

লন্ডনভিত্তিক আইন সংস্থা ম্যাকার্থি ডেনিংয়ের ক্রীড়া বিভাগের প্রধান স্টেফান বরসন ইএসপিএনকে বলেছেন, ‘ম্যানচেস্টার সিটির মামলাটি জটিল—এতে সন্দেহ নেই। ক্রীড়া প্রেক্ষাপটে এটি অনন্যও। কিন্তু এ ধরনের বাণিজ্যিক মামলার রায় সাধারণত ১৫ মাসের অনেক আগেই হয়ে যায়। এত দেরি হওয়ার পেছনে কোনো যুক্তিযুক্ত অজুহাত নেই।’

সমঝোতার সম্ভাবনা কতটুকু

আরেকটি সম্ভাবনার কথা শোনা যায়। খুব ক্ষীণ, কিন্তু একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ধরা যাক, প্রিমিয়ার লিগ ও সিটি গোপনে সমঝোতার চেষ্টা করছে। মনে রাখতে হবে, প্রিমিয়ার লিগ মানে ২০টি সদস্য ক্লাবের সম্মিলিত সংগঠন। সবাই একমত হলে সমাধান সম্ভব। সমঝোতা হলে কেমন হতে পারে? সিটিকে আংশিক দোষ স্বীকার করতে হবে। শাস্তিও মেনে নিতে হবে। অন্য ক্লাবগুলো ক্ষতিপূরণের দাবি থেকে সরে আসবে। হয়তো বড় অঙ্কের জরিমানা হবে। পয়েন্টও কাটা হবে, তবে সেটা এমনভাবে হবে, যাতে লিগের মাঝামাঝি সময়ে প্রতিযোগিতামূলক কাঠামো ভেঙে না পড়ে।

শেষ কথা

রায় যা-ই হোক, আপিলের সম্ভাবনা প্রবল। অর্থাৎ এ মামলা আরও দীর্ঘায়িত হবে। প্রিমিয়ার লিগের জন্য যা হবে, নিঃসন্দেহে অস্বস্তিকর।
আসলেই কি অন্তহীন এই প্রক্রিয়া?

আরও পড়ুন