অস্ট্রিয়া-আলজেরিয়া ম্যাচে মহানাটকীয় ড্র, বাদ পড়ল ইরান
আলজেরিয়া ৩ : ৩ অস্ট্রিয়া
কানসাস সিটির গ্যালারিতে বসে থাকা দর্শকেরা বুঝতে পারছিলেন, কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু কী? তা কেউ জানত না।
শেষ পর্যন্ত যা ঘটল, তা শুধু একটি ম্যাচ নয়—মহানাটক। আর সেই নাটকের শেষ দৃশ্য লিখল সময়, ৯৬ মিনিটে। অস্ট্রিয়া ৩, আলজেরিয়া ৩। আর দূরে কোথাও, টিভির সামনে বসে ইরান নিঃশব্দে বিদায় নিল।
ম্যাচের আগে হিসাব ছিল সহজ। দুই দলেরই সমান ৩ পয়েন্ট। ড্র হলেই দুজনেরই শেষ ৩২ নিশ্চিত। এই সরল সমীকরণই যেন ম্যাচটার ওপর একটা অস্বস্তিকর ছায়া ফেলেছিল।
অনেকেই মনে করছিলেন, হয়তো ‘সমঝোতার ড্র’ হবে, ফুটবলের ইতিহাসে বহুবার দেখা সেই অদৃশ্য চুক্তি। ১৯৮২ সালের ‘ডিসগ্রেস অব গিহন’-এর ভূতও যেন ভেসে বেড়াচ্ছিল। কিন্তু মাঠে নামার পর অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়া যেন সেই সন্দেহকে অপমান করে তাড়িয়ে দিল। সমঝোতা নয়, এটা ছিল যুদ্ধ।
প্রথম আঘাতটা এল অস্ট্রিয়া থেকে। ২৮ মিনিটে, ম্যাচের প্রথম শট অন টার্গেটেই গোল। ডেভিড আলাবার লম্বা পাস, নিখুঁত তিরের মতো—ছুটে গেল সামনে। মার্কো আরনাউতোভিচ দৌড়ের সময়টুকু এমনভাবে মেপেছিলেন, যেন ঘড়ির কাঁটা তাঁর পায়ের সঙ্গে তাল মিলিয়েছে। প্রথম টাচটা নিখুঁত ছিল না। কিন্তু উসামা বেনবোতের দ্বিধা, এক সেকেন্ডের ভুল আর সেই সুযোগেই বল জালে।
গ্যালারি তখনও পুরো গর্জে ওঠেনি, এর মধ্যেই আলজেরিয়া ফিরল।
প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্ত। রিয়াদ মাহরেজ ডান প্রান্তে বল বাঁচিয়ে রাখলেন। তারপর রফিক বেলগালি। একজন ডিফেন্ডার, কিন্তু সেই মুহূর্তে যেন তিনি এক শিল্পী। তিনজনকে কাটিয়ে ভেতরে ঢুকে বাঁ পায়ে এমন এক শট নিলেন, ১-১।
একটা ম্যাচ তখন গল্প হয়ে উঠছে। দ্বিতীয়ার্ধে আবার এগিয়ে যায় অস্ট্রিয়া। ৫৫ মিনিটে কনরাড লামেরের হেড থেকে বল নামল মার্সেল সাবিটসারের সামনে। ১৮ মিটার দূর থেকে প্রথম টাচেই শট, ২-১।
কিন্তু এই ম্যাচে ‘লিড’ মানে কিছুই না।
মাত্র পাঁচ মিনিট পর, হুসেম আউয়ার বাঁ দিক দিয়ে দৌড়ালেন। তাঁর পায়ের ছন্দে ছিল মরুভূমির হাওয়া। কাটব্যাক পেয়ে মাহরেজের একটা বাঁকানো শট, যেন ক্যালিগ্রাফির আঁচড়, বল ঢুকে গেল টপ কর্নারে। ২-২।
এবার স্টেডিয়ামে অদ্ভুত শব্দ। হুইসেল, গুঞ্জন, কিছু দর্শক বেরিয়ে যাচ্ছেন—ভাবছেন, হয়তো এই ম্যাচ আর এগোবে না। কিন্তু ফুটবল মাঝে মাঝে মানুষের ধারণাকে উপহাস করে।
সময় তখন শেষের দিকে। অতিরিক্ত সময়, হঠাৎই বিস্ফোরণ। মাহরেজ গোল করলেন। আলজেরিয়ার অধিনায়ক হাত ছড়িয়ে দৌড়াচ্ছেন। সতীর্থরা তাঁকে ঘিরে ধরছেন। ৩-২। মনে হচ্ছিল, এটাই শেষ দৃশ্য।
কিন্তু গল্প তখনো শেষ হয়নি।
অস্ট্রিয়া শেষ আক্রমণে উঠল। যেন শেষ ট্রেনটা ধরতে দৌড়াচ্ছে কেউ। বদলি হিসেবে নামা সাসা কালাইজিচ। মাত্র কয়েক সেকেন্ড মাঠে। একটা হেড, বল জালে। ৩-৩। ম্যাচের ঘড়িতে তখন ৯৬ মিনিট।
এই এক মিনিটেই বদলে গেল তিনটি দেশের ভাগ্য।
অস্ট্রিয়া গেল নকআউটে, মুখোমুখি হবে স্পেনের। আলজেরিয়াও টিকে গেল, সেরা তৃতীয় দল হিসেবে—তাদের সামনে সুইজারল্যান্ড। আর ইরান? তাদের জন্য রয়ে গেল শুধু দীর্ঘশ্বাস আর আক্ষেপ।
এই ম্যাচটা প্রমাণ করে, ফুটবল কখনো শুধু হিসাবের খেলা নয়। এখানে সমীকরণ ভেঙে যায়, পরিকল্পনা ছিন্নভিন্ন হয়। ৯০ মিনিটের পরেও খেলা বেঁচে থাকে। একটা হেডে, একটা ভুলে, একটা দৌড়ে। আর সেই বেঁচে থাকার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে নিষ্ঠুরতা।
কেউ উদ্যাপন করে। কেউ চুপচাপ টিভি বন্ধ করে দেয়। ফুটবল ঠিক সেখানেই সবচেয়ে সত্য।