মারগাঁও শহরের প্রাণকেন্দ্রে বিখ্যাত কদম্ব বাসস্ট্যান্ড থেকে হেঁটে মিনিট দশেকের দূরত্ব। এইটুকু পথ পেরিয়ে গতকাল জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে এসে এলাকাটাকে মনে হলো নির্জন কোনো গ্রাম। সুনসান রাস্তাঘাট, লোকজন নেই বললেই চলে। ম্যাচের তখনো দেড় ঘণ্টা বাকি, অথচ অষ্টম নারী সাফের ফাইনালের উত্তেজনার লেশমাত্র নেই কোথাও!
স্টেডিয়ামের ভেতরে ঢুকে অনুমিত দৃশ্যটাই দেখা গেল। ১৯ হাজার ধারণক্ষমতার বিশাল গ্যালারি পুরোপুরি শূন্য। গ্যালারির এ মরুভূমির মতো দশা দেখে মনে পড়ল ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবরের কথা। সেদিন কাঠমান্ডুর আকাশে–বাতাসে বাজছিল শুধুই ফুটবলের সুর। দুপুর গড়াতেই বাংলাদেশ-নেপাল নারী সাফের ফাইনাল দেখতে দশরথ রঙ্গশালায় নেমেছিল মানুষের ঢল। ম্যাচ শুরুর ঘণ্টাখানেক আগেই ২০ হাজারি গ্যালারিতে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। মাঠের বাইরেও ছিল মানুষ আর মানুষ।
এর ঠিক দুই বছর পর আজ গোয়ায় তার পুরো উল্টো ছবি। অবশ্য ম্যাচ শুরু হওয়ার পর গ্যালারি একেবারে ফাঁকা পড়ে থাকেনি। খেলা শুরুর আধা ঘণ্টা আগে দেখা গেল ‘ভিভা ব্লু টাইগ্রেস’ লেখা ব্যানার টানিয়ে ৭০ থেকে ৮০ জন দর্শক মাঠে প্রবেশ করেছেন। সঙ্গে করে তাঁরা নিয়ে এসেছেন ব্যান্ড দল।
ম্যাচ যত এগোতে লাগল, দর্শকের সংখ্যাও কিছুটা বাড়তে থাকল। তবে সব মিলিয়েও তা মেরেকেটে ৫০০ জনের বেশি হবে বলে মনে হয় না। ভারতের একটি আক্রমণের সময় স্থানীয় এই সমর্থকেরাই উচ্চ স্বরে আওয়াজ তুলে দলকে অনুপ্রেরণা দেওয়ার চেষ্টা করল। ম্যাচের বয়স যখন ৩৭ মিনিট, তখন গ্যালারির এক কোণ থেকে ‘ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া’ বলে দু-তিনবার স্লোগান উঠল। কিন্তু ক্রিকেটের মাঠে ভারতীয় সমর্থকদের যে আকাশ কাঁপানো গর্জন দেখা যায়, ফুটবল মাঠের এই আওয়াজ তার এক শ ভাগের এক ভাগও ছিল না!
স্থানীয় সংবাদকর্মীরা বলাবলি করছিলেন, তাঁরা গ্যালারির করুণ দশা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশের পর নাকি ফাইনালের আগে আয়োজকদের পক্ষ থেকে তড়িঘড়ি করে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, যাতে অন্তত গ্যালারি একেবারে শূন্য না দেখায়। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের ফাইনালে যে এমন শূন্য গ্যালারি দেখতে বড্ড খারাপ লাগে।
দর্শক–খরার মধ্যেও প্রেসবক্সের পাশের গ্যালারিতে লাল-সবুজ পতাকা হাতে একাই গর্জন তুলে চলেছেন বাংলাদেশের সমর্থক খোরশেদ মাতবর। ঢাকার আশুলিয়া থেকে গোয়ায় এসেছেন মারিয়াদের লড়াই দেখতে। স্থানীয় এক সাংবাদিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে রিলস পোস্ট করে ক্যাপশনে লিখেছেন, ‘মিস্টার মাতবর একাই এক শ।’
প্রথমার্ধ ১–১ গোলে শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ভারত এগিয়ে যায় ২-১ গোলে। মাঠে আসা অল্পসংখ্যক দর্শকও তাতে চাঙা হয়ে উঠলেন। পরে তো বাংলাদেশের মেয়েদের ৩–১ গোলে হারিয়ে শিরোপাই জিতলেন ভারতের মেয়েরা। অবশ্য দর্শক নিয়ে ভারতের কোচের আক্ষেপ তাতেও কমার কথা নয়। সেমিফাইনালে ভুটানের বিপক্ষে ১-০ গোলের জয়ের পর সংবাদ সম্মেলনে এই প্রতিবেদকের এক প্রশ্নের জবাবে স্বাগতিক কোচ ক্রেস্পিন ছেত্রী হতাশ কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘গ্যালারিতে ভারতের কোনো সমর্থক দেখেছেন! দেখেননি তো? এটা সত্যিই খুব হতাশার যে ঘরের মাঠে খেলা হওয়া সত্ত্বেও গ্যালারিতে লোক নেই।’ ঘরের মাঠে খেলেও তাই তাঁর মনে হয়েছে ভারতের মেয়েরা বুঝি ‘নিরপেক্ষ ভেন্যু’তেই খেলছেন!
দক্ষিণ এশিয়ার এত বড় একটি নারী ফুটবল টুর্নামেন্ট নিয়ে গোয়ায় ন্যূনতম কোনো প্রচার-প্রচারণা দেখা যায়নি। স্টেডিয়ামের আশপাশেও সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের কোনো ব্যানার ছিল না, তারকা খেলোয়াড়দের কোনো বিলবোর্ডও দেখা যায়নি। সাফ কর্তৃপক্ষ বা গোয়া ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন কেউই এই টুর্নামেন্টকে জমিয়ে তুলতে দৃম্যমান কোনো উদ্যোগ নেয়নি, যা একটু বিস্ময়করই।