জাভির রিয়ালকে বদলে আরবেলোয়া কীভাবে নিজের রিয়াল বানালেন
শুরুটা মোটেও রূপকথার মতো ছিল না। বরং বড় ধাক্কাই খেতে হয়েছিল শুরুতে।
গত জানুয়ারিতে যখন জাভি আলোনসো বিদায় নিলেন, রিয়াল মাদ্রিদ ডাগআউটের দায়িত্বটা পড়ল আলভারো আরবেলোয়ার কাঁধে। ক্লাবের তৃতীয় বিভাগের রিজার্ভ টিম থেকে উঠে আসা এক কোচ, যাঁর কিনা বড়দের ফুটবলে কোচিং করানোর অভিজ্ঞতা সাকল্যে মাস ছয়েকের।
প্রথম ম্যাচেই কোপা দেল রেতে দ্বিতীয় স্তরের দল আলবাসেতের কাছে হার। লা লিগায় লেভান্তের সঙ্গে ২-০ গোলে জয়ে শুরু। তবে বার্সেলোনার চেয়ে ২ পয়েন্টে এগিয়ে থাকা রিয়াল একটা সময় উল্টো ৪ পয়েন্টে পিছিয়ে পড়ল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে। স্প্যানিশ মিডিয়া তো তখন খড়্গহস্ত—উনাই এমেরি, মরিসিও পচেত্তিনো কিংবা ইয়ুর্গেন ক্লপদের নাম বাতাসে ভাসছে আরবেলোয়ার বিকল্প হিসেবে।
কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহে মাদ্রিদের আকাশ থেকে মেঘ সরতে শুরু করেছে। ম্যানচেস্টার সিটিকে দুই লেগেই হারিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা আরবেলোয়ার পায়ের তলার মাটি শক্ত হয়েছে অনেক। যে আরবেলোয়াকে নিয়ে সংশয় ছিল, সেই তিনিই এখন বার্নাব্যুর ড্রেসিংরুমে নতুন এক সুবাতাস বইয়ে দিচ্ছেন।
আলোনসো বনাম আরবেলোয়া: সম্পর্কের রসায়ন
জাভি আলোনসো কেন টিকতে পারলেন না? উত্তরটা যতটা না কৌশলের, তার চেয়ে বেশি খেলোয়াড়দের সঙ্গে সম্পর্কের রসায়নের। আলোনসোর ফুটবল দর্শনে ভিডিও অ্যানালাইসিসের আধিক্য, অনুশীলনের প্রচণ্ড তীব্রতা আর কঠোর শৃঙ্খলাবোধ দলের বড় একটা অংশের কাছে ‘বিরক্তির’ কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
আরবেলোয়া ঠিক এখানেই বাজিমাত করেছেন। তিনি খেলোয়াড়দের কাছে অনেক বেশি সহজলভ্য। আরবেলোয়ার নিজের ভাষায়, তাঁর অফিসের সেই চেয়ারটা এখন রিয়াল তারকাদের আড্ডার জায়গা। খেলোয়াড়েরা সেখানে আসেন, মন খুলে কথা বলেন। ব্রাহিম দিয়াজের কথাই ধরা যাক। একাদশে অনিয়মিত দিয়াজ সেই চেয়ারে বসে কোচের সঙ্গে মতবিনিময় করলেন আর এর কয়েক দিন পরই সফলতা—ফিগো ও ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে ম্যাচে তিনি খেললেন, দুর্দান্ত পারফর্মও করলেন।
আলোনসোর আমলে অনুশীলনে প্রবেশাধিকার ছিল সীমিত। আরবেলোয়া সেই বেড়াজাল ভেঙে দিয়েছেন। এখন পরিবেশ অনেক বেশি ফুরফুরে, অনেকটা ঘরোয়া আড্ডার মতো। অবশ্য সবাই যে খুশি, তা নয়। যাঁরা অনিয়মিত, তাঁদের মনে ক্ষোভ থাকাই স্বাভাবিক। তবে সেটা আরবেলোয়ার কোচিং পদ্ধতির চেয়েও নিজেদের সাইডবেঞ্চে বসে থাকা নিয়ে বেশি।
কৌশলের খেলায় ‘মাস্টারমাইন্ড’
সমালোচকেরা বলেন, আরবেলোয়া সংবাদ সম্মেলনে কৌশল নিয়ে কথা বলতে চান না। কিন্তু মাঠের লড়াই বলছে অন্য কথা। ইতিহাদে গার্দিওলার আক্রমণাত্মক রণকৌশল আরবেলোয়া রুখে দিয়েছেন নিখুঁত পরিকল্পনায়। ট্রেন্ট আলেকজান্ডার-আর্নল্ডকে সাহায্য করতে ফেদে ভালভারদেকে নামিয়ে দেওয়া কিংবা কর্নারের সময় আর্দা গুলের ও ফ্রান গার্সিয়ার মতো খাটো ফুটবলারদের দিয়ে আর্লিং হলান্ডকে মার্ক করা—সবই ছিল ছক কষা।
অনেকে অবাক হয়েছিলেন, ৬ ফুট ৪ ইঞ্চির হলান্ডকে কেন গুলেররা পাহারা দিচ্ছেন? রিয়ালের ট্যাকটিক্যাল রুমের হিসাবে ছিল, হলান্ড মূলত রিবাউন্ড বলের জন্য ওত পেতে থাকেন। তাই তাঁকে শুধু ব্যস্ত রাখলেই চলে। আসল বিপদ রুবেন দিয়াজ কিংবা রদ্রিদের সামলানো। আরবেলোয়ার এই নিখুঁত ছক দেখে খোদ পেপ গার্দিওলাও মুগ্ধ। ম্যাচ শেষে পেপ বলেই দিলেন, ‘আরবেলোয়ার কাজ দেখে আমার ভালো লেগেছে। ও অনেক দূর যাবে।’
সংকট ও উত্তরণ
ফেব্রুয়ারির শেষে ওসাসুনা আর হেতাফের কাছে টানা হারে যখন ক্লাবজুড়ে চরম হতাশা, তখন ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ক্লাবের জেনারেল ম্যানেজার হোসে আনহেল সানচেজ। ড্রেসিংরুমে গিয়ে তিনি অভয় দিয়ে এসেছিলেন আরবেলোয়া ও তাঁর শিষ্যদের। এরপরই যেন ভোজবাজির মতো সব বদলে গেল।
জুড বেলিংহাম, এদের মিলিতাও, এমবাপ্পে কিংবা রদ্রিগোর মতো তারকাদের ছাড়াই রিয়াল টানা চার ম্যাচ জিতেছে। ইনজুরি যখন দলকে কোণঠাসা করে দিচ্ছিল, আরবেলোয়া তখন সাহসের সঙ্গে টেনে তুলেছেন ১৮ বছরের থিয়াগো পিটার্চের মতো তরুণদের। মাঝমাঠে পিটার্চের পারফরম্যান্স এখন মাদ্রিদ সমর্থকদের মুখে মুখে।
সাদা জার্সিতে আরবেলোয়ার ভবিষ্যৎ কী? উত্তরটা তোলা থাকল মে মাসের শেষ বিকেলের জন্য। তবে আপাতত ম্যানচেস্টার সিটিকে স্তব্ধ করে দিয়ে আরবেলোয়া প্রমাণ করেছেন—তিনি শুধু তাত্ত্বিক কোচ নন, তিনি জানেন প্রতিকূল স্রোতে কীভাবে তরি বাইতে হয়।
শেষ পর্যন্ত আরবেলোয়া টিকে যাবেন কি না, তা শিরোপার ওপর নির্ভর করছে ঠিক; তবে আরবেলোয়া এরই মধ্যে বুঝিয়ে দিয়েছেন—তিনি শুধুই এক ‘সাবেক ফুলব্যাক’ নন, ডাগআউটের এক চতুর মাস্টারমাইন্ডও বটে!