দীর্ঘ বিরতিতে ক্লান্ত বাংলাদেশ ফুটবল লিগ

ছবি: সংগৃহীত

গত ২৬ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া ১০ দলের বাংলাদেশ ফুটবল লিগ প্রথম থেকেই খুঁড়িয়ে চলছে। জাতীয় দলের ম্যাচ আর জাতীয় নির্বাচনের লম্বা বিরতিতে মাঠের খেলার চেয়ে ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন ফুটবলাররা।

৩ জানুয়ারি প্রথম পর্ব শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় পর্ব শুরু নিয়ে ছিল দীর্ঘ অনিশ্চয়তা। অবশেষে কাল ঘোষিত বাফুফের নতুন সূচিতে আগামী ৬ মার্চ লিগের দ্বিতীয় পর্ব শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ফেডারেশন কাপ শুরু হবে ১০ মার্চ থেকে। লিগ নিয়ে এই দীর্ঘসূত্রতার প্রভাব পড়ছে ক্লাব এবং খেলোয়াড়দের মধ্যে। দ্বিতীয় পর্বের সূচি ঘোষণা হলেও তাই এ নিয়ে অসন্তোষ থাকছেই।

আর্থিক সংকটে ক্লাবগুলো

লম্বা বিরতির ফাঁদে পড়ে ৯০ শতাংশ ক্লাবেরই দিশাহারা অবস্থা, ক্লাবগুলো পড়ছে আর্থিক সংকটে। প্রথম পর্বে চমক দেখিয়ে পয়েন্ট টেবিলের দুইয়ে থাকা ফর্টিস এফসির ম্যানেজার রাশেদুল ইসলাম বলেছেন, ‘প্রথম পর্ব শেষ হওয়ার ৬১ দিন পর লিগের দ্বিতীয় পর্বের প্রথম ম্যাচ খেলব আমরা। এর ৬ দিন পর দ্বিতীয় ম্যাচ খেলে আবার তৃতীয় ম্যাচ খেলতে অপেক্ষা করতে হবে ২৪ দিন। এতে ফুটবলে অর্থায়ন করা ব্যক্তিরা নিরুৎসাহিত হন, খেলোয়াড়েরাও অনুশীলনে উৎসাহ পান না। ফুটবলের উন্নয়ন করতে চাইলে এ সমস্যাগুলোর সুরাহা হওয়া উচিত।’

একই সুর ব্রাদার্স ইউনিয়নের ম্যানেজার আমের খানের কণ্ঠেও, ‘মাসের পর মাস খেলোয়াড়দের বসিয়ে রেখে বেতন আর আনুষঙ্গিক খরচ চালানো অনেক ক্লাবের জন্যই অসম্ভব হয়ে পড়ছে। লিগে লম্বা লম্বা বিরতি পড়ায় ক্লাবগুলোর মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে।’

ফর্টিস এফসির খেলোয়াড়রা
প্রথম আলো

বিপাকে কোচ–খেলোয়াড়েরাও

ঘন ঘন বিরতিতে ফুটবলারদের বড় চ্যালেঞ্জ এখন ফিটনেস আর ছন্দের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। প্রতিবার নতুন করে শুরু করতে গিয়ে উদ্যমেও ভাটা পড়ছে। আবাহনীর ফরোয়ার্ড মোহাম্মদ ইব্রাহিম হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘এ রকম লম্বা বিরতি পড়লে পারফরম্যান্স ও মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন। সূচি না থাকায় গত দেড় মাস আমরা জানতামই না কবে খেলা। আবাহনীকেও তিন-চারবার ক্যাম্প ডেকে বন্ধ করতে হয়েছে।’
বিশ্বের আর কোথাও এমন দীর্ঘ বিরতির লিগ আছে কি না, তা গবেষণার বিষয়। প্রতিটি বিরতির পর কোচদের কাজ শুরু করতে হয় একদম শূন্য থেকে। মোহামেডানের কোচ আলফাজ আহমেদের মতে, ‘এভাবে একটা লিগ চলতে পারে না। বারবার বিরতিতে পরিকল্পনা সাজাতে হোঁচট খেতে হয়, যা কোচের জন্য কাজটা খুব কঠিন করে তোলে।’

আরও পড়ুন

বিদেশি ফুটবলার নিয়ে অনিশ্চয়তা

লিগের দীর্ঘসূত্রতা বিদেশি খেলোয়াড়দের মনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিদেশ থেকে খেলোয়াড় আনা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়তে হচ্ছে ক্লাবগুলোকে। অনেক দলই সময়মতো বিদেশি খেলোয়াড় আনতে পারেনি। দ্বিতীয় পর্বের সূচি ঘোষণার পর এখন ব্রাদার্স ইউনিয়ন তাদের পাঁচজন এবং পিডব্লিউডি দুজন পাকিস্তানি ফুটবলারকে আনার প্রস্তুতি শুরু করেছে।

বাফুফে ভবন
প্রথম আলো

সামনে আরও বিরতি

দ্বিতীয় পর্ব শুরুর তারিখ পাওয়া গেলেও সামনে আছে আরও দীর্ঘ বিরতির ফাঁদ। ১৪ মার্চ ১১তম রাউন্ড শেষে প্রায় এক মাস বন্ধ থাকবে লিগ। ৩১ মার্চ সিঙ্গাপুরে জাতীয় দলের এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের ম্যাচ শেষে ১০ এপ্রিল শুরু হবে ১২তম রাউন্ড। এপ্রিলের বদলে লিগ এখন শেষ হবে ২৩ মে। অর্থাৎ প্রতিটি দলের ১৮টি করে ম্যাচ খেলতেই পার হয়ে যাচ্ছে প্রায় আট মাস। বাংলাদেশ ফুটবল লিগ যেন এক দীর্ঘসূত্রতার নাম।
লিগ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল প্রথম রাউন্ড শেষেই। ১৯ অক্টোবর দ্বিতীয় রাউন্ড শুরু হলেও জাতীয় দলের ম্যাচের কারণে ফের লম্বা বিরতি পড়ে। ২৪ নভেম্বর তৃতীয় রাউন্ড শুরু হয়ে ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত চলে প্রথম পর্ব। এই পর্বের ৪৫টি ম্যাচ শেষ করতে লেগেছে তিন মাসের বেশি সময়, যেখানে প্রতি দল খেলেছে ৯টি করে ম্যাচ।
লিগের ধারাবাহিকতা না থাকায় ফুটবলের নিয়মিত খোঁজ রাখা মানুষেরাও জানেন না কবে, কখন, কার খেলা। লিগ নিয়ে কোনো আকর্ষণই তৈরি হচ্ছে না।

এভাবেই কী চলবে

আপাতত সে রকমই পরিস্থিতি, অর্থাৎ বিরতির ফাঁদ থেকে শিগগিরই বের হতে পারছে না বাংলাদেশ লিগ। বাফুফের পেশাদার লিগ কমিটির কো–চেয়ারম্যান জাকির হোসেন চৌধুরীও মানছেন, লিগে বিরতি একটু বেশিই লম্বা হয়ে গেছে। তবে তাঁর প্রতিশ্রুতি, ‘আগামীতে বড় বিরতি যেন না পড়ে সেদিকে লক্ষ রাখা হবে।’

আরও পড়ুন