বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডস চ্যাম্পিয়ন, পর্তুগালের কাছে হারবে আর্জেন্টিনা

নেদারল্যান্ডস অধিনায়ক ফন ডাইকফিফা

২০১০ বিশ্বকাপে জার্মানির সব ম্যাচের ফল সঠিকভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করে আলোচনায় আসে পল নামের অক্টোপাস। তখন তাকে বিশ্বজুড়ে একধরনের ‘অলৌকিক ভবিষ্যদ্বক্তা’ হিসেবে দেখা হয়েছিল।

এরপর জার্মান অর্থনীতিবিদ ইয়াকিম ক্লেমেন্ট একটি জটিল পরিসংখ্যানভিত্তিক পূর্বাভাস মডেল তৈরি করেন। ২০১৪ সাল থেকে তাঁর এই মডেল বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন দল সঠিকভাবে অনুমান করে আসছে। এই মডেল অনুযায়ী, জুলাইয়ে বিশ্বকাপ জিততে যাচ্ছে ভার্জিল ফন ডাইক-কোডি গাকপোদের নিয়ে গড়া নেদারল্যান্ডস দল।

শুধু জয়ী দল নয়, এই মডেল পুরো ৪৮ দলের টুর্নামেন্টের চিত্রও বিশ্লেষণ করে। এতে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় রাউন্ডে ব্রাজিলকে হারাতে পারে জাপান এবং একই পর্যায়ে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে বাদ পড়তে পারে স্কটল্যান্ড। এ ধরনের নানা সম্ভাব্য ফলও এতে দেখানো হয়েছে।

এই মডেল অনুযায়ী ইংল্যান্ডের সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে। তবে ২০০৬ সালের পর আবারও তাদের পথ আটকে দিতে পারে পর্তুগাল। অর্থাৎ বিশ্বকাপ ফাইনাল হতে যাচ্ছে পর্তুগাল ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে। তবে এই মডেলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণী হচ্ছে কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগালের আর্জেন্টিনার হেরে যাওয়া।

আরও পড়ুন

জার্মান অর্থনীতিবিদ ক্লেমেন্ট নিজেকে একজন ‘নৈরাশ্যবাদী’ বলে মনে করেন এবং ১০ বছর ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। তাঁর মতে, এই গবেষণার উদ্দেশ্য কখনোই কাউকে নির্দিষ্ট ফল জানিয়ে দেওয়া বা বাজিতে জেতার উপায় বের করা ছিল না। বরং তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন, ফলাফল আগেভাগে অনুমান করার চেষ্টা কতটা হাস্যকর হতে পারে।

ক্লেমেন্ট বলেন, ‘এটা শুরু হয়েছিল অর্থনীতিবিদদের সেই অহংকার দেখানোর জন্য, যাঁরা মনে করেন, তাঁরা এমন বিষয়ও ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারেন, যেগুলো সম্পর্কে তাঁদের আসলে কোনো ধারণাই নেই।’

ভবিষ্যদ্বানী মতে মেসিকে হারাবেন রোনালদো
গ্রাফিকস: প্রথম আলো

ক্লেমেন্ট আরও যোগ করেন, ‘আর এখন এটা এমন অবস্থায় এসেছে, যেখানে কেউ যদি ভাগ্যগুণে বারবার ঠিক হয়ে যায়, মানুষ তাকে একজন “গুরু” ভাবতে শুরু করে।’ নিজের প্রথম পূর্বাভাস ২০১৪ বিশ্বকাপে জার্মানির জয় দিয়ে সত্যি হলেও তিনি ভেবেছিলেন, ২০১৮ সালে আবার হিসাব করলে সেটি হয়তো ভুল প্রমাণিত হবে এবং আগেরটা কেবলই একটি আকস্মিক ঘটনা হিসেবে ধরা পড়বে।

কিন্তু বাস্তবে তাঁর পূর্বাভাস ২০১৮ সালে ফ্রান্স এবং ২০২২ সালে আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রেও সঠিক হয়। তিনি বলেন, ‘আমি পরপর তিনবার ঠিক হওয়ার কারণে এখন মানুষ মনে করে এই মডেলকে হারানো সম্ভব নয়, আর পরেরবারও আমাকে অবশ্যই ঠিক হতে হবে।’

তবে সত্য হলো, বিশ্বকাপে সাফল্য কিছু ‘সিস্টেমিক’ বা কাঠামোগত কারণের ওপর আংশিকভাবে নির্ভর করে—যেমন দেশের জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক শক্তি, আবহাওয়া এবং ফিফা র‍্যাঙ্কিং। তবু ক্লেমেন্ট পাঠকদের সতর্ক করে বলেন, তাঁর প্রতি চার বছর পরপর প্রকাশিত এই পূর্বাভাসকে খুব বেশি গুরুত্ব দিয়ে না দেখাই ভালো। কারণ, এসব উপাদান শুধু ফলাফলের একটি অংশ ব্যাখ্যা করতে পারে, পুরো চিত্র নয়।

জাপানের কাছে হারবে ব্রাজিল
রয়টার্স

ক্লেমেন্টের মতে, এখানে ‘বাকি ৫০ শতাংশ হলো ভাগ্য’। বিশেষ করে যখন সমান শক্তির দুটি দল মুখোমুখি হয়, তখন ফলাফল অনেকটাই নির্ভর করে সেদিনের ফর্ম, রেফারির একটি সিদ্ধান্ত বা ভাগ্যের ছোট কোনো ঘটনায়। যেমন, বল পোস্টে লেগে ফিরে আসবে নাকি গোল হবে—এ ধরনের বিষয়গুলোই অনেক সময় ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেয়। ফলে এসব ঘটনা পুরোপুরি অনিশ্চিত এবং আগে থেকে অনুমান করা প্রায় অসম্ভব।

আরও পড়ুন

প্রতিবার বিশ্বকাপ সামনে এলে ক্লেমেন্টের এই মডেল তাঁর দৈনন্দিন কাজের বাইরে একধরনের স্বস্তি ও বিনোদনের জায়গা হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, ‘২০২৬ সালে যখন বিশ্বজুড়ে এত সংকট চলছে, যুদ্ধসহ নানা অস্থিরতা চলছে, তখন এটা আমাকে ভালো অনুভূতি দিয়েছে। আশা করি, পাঠকেরাও এটা উপভোগ করবেন এবং বিশ্বের নানা দুঃসংবাদ থেকে কিছুটা হলেও মনোযোগ সরিয়ে নিতে পারবেন।’

তবে প্রতিটি সঠিক পূর্বাভাসের পর ক্লেমেন্টের ওপর প্রত্যাশার চাপও বাড়তে থাকে। তিনি এখন বিনিয়োগ ব্যাংক প্যানমুর লাইবেরামে কৌশলবিদ (স্ট্র্যাটেজিস্ট) হিসেবে কাজ করেন। অফিসে সহকর্মী অর্থনীতিবিদেরা প্রায়ই তাঁকে নানা প্রশ্ন করেন। যেমন নেদারল্যান্ডসের টটেনহাম মিডফিল্ডার জাভি সিমন্সের এসিএল ইনজুরি কীভাবে তাঁর মডেলে প্রভাব ফেলবে?

চূড়ান্ত পর্যায়ে বিশ্বকাপ শুরুর আগমুহূর্তে সব ধরনের সতর্কতা ও ব্যাখ্যা সত্ত্বেও প্রস্তুত আছেন ক্লেমেন্ট। তিনি বলেন, ‘আমার কয়েকজন সহকর্মী আমার সেই নোট দেখে নেদারল্যান্ডসের ওপর বাজি ধরেছেন। আর নেদারল্যান্ডস যদি বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ে যায়, তাহলে পরের দিন আমাকে সম্ভবত বাসা থেকে কাজ করতে হবে।’