বিশ্বকাপের একাল–সেকাল

আমি প্রায়ই বলি, ফুটবল–ভক্তদের খেলাটার সঙ্গে যে মানসিক সম্পৃক্ততা, তা অনেকটা উচ্চাঙ্গসংগীতের সাধকদের মতো। তাঁরা যখন খেলায় ডুবে যান, তখন বাইরের জগতের কোনো হুঁশ থাকে না।

প্রথম আলো গ্রাফিকস

বিশ্বকাপে দল বাড়ছে। এই বিবর্তনকে আমি ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখি। ফিফা ফুটবলকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার যে চিন্তা করেছে, সেটাকে সাধুবাদ জানাই।

ফুটবল আসলে এমনই এক খেলা, যা শুরু হলে দেশের কোটি কোটি মানুষের মধ্যে দারুণ উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আমার তো মাঝেমধ্যে মনে হয়, খেলার এ সময়টাতে সমাজে অপরাধের হারও অনেক কমে যায়। সবাই তখন খেলা নিয়েই ব্যস্ত থাকে।

প্রথম দিকে ফুটবল নিয়ে আমার ধারণা ছিল সীমিত। আমি মনে করতাম ফুটবল মানেই শুধু ঢাকা স্টেডিয়ামে খেলা বা ফার্মগেটের গ্রিনফিল্ড মাঠের প্র্যাকটিস। আমি তখন ঢাকা স্টেডিয়ামে কবির ভাই, আশরাফ ভাই বা মারি ভাইদের খেলা দেখতে যেতাম এবং ওটাকেই মহাজাগতিক কিছু মনে করতাম। 

ফুটবল যে বিশ্বব্যাপী একটা ব্যাপার, তা প্রথম বুঝতে পারি ১৯৬৪ সালের দিকে, যখন আমি ঢাকার সিটি কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে পড়ি। ১৯৬২ সালের বিশ্বকাপ আমি ফলো করিনি, এমনকি তখন জানতামও না যে বিশ্বকাপ নামে কিছু আছে।

১৯৬৪ সালে আমার ডাক্তার মামার বিয়ের তিন-চার দিন পর মামা-মামি ফুলবাড়িয়া স্টেশন থেকে ট্রেনে করে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহে যাবেন। ট্রেনে সময় কাটানোর জন্য আমি তাড়াহুড়ো করে মামিকে ভারতের একটা রম্য ম্যাগাজিন কিনে দিলাম। যেখানে ছিল সিনেমা, গান আর খেলার খবর।

মামি পাতা ওল্টান, উত্তম সুচিত্রা...এগুলো দেখেন। তারপর হঠাৎ দেখলেন ফুটবল নিয়ে ফিচার। মামি জানতেন আমি ফুটবল খেলি। মামা আমাকে খুব পছন্দ করতেন ফুটবল খেলি বলে। মামা বললেন, ‘টিপু, তুমি কি এই ভদ্রলোকের ছবির জন্য ম্যাগাজিনটা দিয়েছ?’ ভদ্রলোক মানে
পেলের একটা ছবি, সাদা–কালো। জার্সিতে লম্বা স্ট্রাইপ। সম্ভবত সান্তোসের জার্সি। তিনি ফুটবলের ওপর বসে। নিচে লেখা ছিল, ‘কপর্দকহীন থেকে কোটিপতি।’

আরও পড়ুন

১৯৬২ বিশ্বকাপে হিরো হয়ে যান পেলে। তাঁর বিশাল ভাবমূর্তি গড়ে ওঠে। মামি বললেন, ‘তুমিই এটা নিয়ে যাও।’ ম্যাগাজিনটা নিয়ে গুলিস্তান থেকে দুই আনা বাস ভাড়ায় এলাম ফার্মগেটে। বাসেই ফিচারটা পড়ে ফেললাম।

পেলে
এক্স

সেই প্রথম জানলাম, দুই বছর আগে বিশ্বকাপ হয়েছে। ভাবলাম ‘কপর্দকহীন থেকে কোটিপতি’ হয় কীভাবে? তখন ১৯৬৬-এর বিশ্বকাপের প্রস্তুতি চলছে। সত্যি বলতে সেই লেখাটি পড়ার পরই বুঝতে পারলাম বিশ্বকাপ কী এবং বিশ্বজুড়ে এর অবস্থান কোথায়। সেই থেকে আমি ব্রাজিলের পাঁড় সমর্থক হয়ে গেলাম।

এত বছরেও বিশ্বকাপের প্রতি আকর্ষণ এতটুকু কমেনি। বিশ্বকাপে কয়েক লাখ মানুষের ছোট্ট দেশও উঠে আসছে। ওসব দেশের ফুটবল দর্শক, খেলোয়াড়দের জন্য এটা বিরাট প্রেরণা। তবে এবার দর্শকদের জন্য এত বেশি খেলা দেখা কিছুটা ক্লান্তিকর হয়ে উঠতে পারে।
স্পনসরদের জন্যও খুব ভালো না হওয়ার শঙ্কা থাকছে। এসব কারণে টুর্নামেন্ট শুরুতে কিছুটা ঝুলে যাওয়ার ভয় থাকলেও একটা সময় আবার চাঙা হবে ঠিকই। বিশেষ করে নকআউট পর্বে।

আরও পড়ুন

১৯৩০ সালে মাত্র ১৩টি দল নিয়ে এই টুর্নামেন্ট শুরু হয়েছিল, তখন ফুটবল খেলুড়ে দেশগুলোর মধ্যেও এটা সফল হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় ছিল। কিন্তু এরপর টুর্নামেন্টে ১৬টি দল হলো, ১৯৮২ সালে ২৪ দল, ১৯৯৮ সালে হলো ৩২ দল। সেটি এবার ৪৮ দলে এসে দাঁড়িয়েছে। আমার ধারণা, এবার ইউরোপের কোনো দলই শিরোপা জিতবে।

এবার তিনটি দেশে (আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকো) বিশ্বকাপ হচ্ছে। এতে খেলোয়াড়দের যাতায়াতের ধকল পোহাতে হবে, অনুশীলনেও ব্যাঘাত ঘটতে পারে। ২০০২ সালে যখন জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া যৌথভাবে আয়োজন করল, তখনো কিছু সমন্বয়ের সমস্যা হয়েছিল।

গোলাম সারোয়ার টিপু, সাবেক ফুটবলার ও জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক কোচ
শামসুল হক

বিশ্বকাপের বিবর্তনের কথা ভাবতে গেলে পুরোনো স্মৃতি চলে আসে। ১৯৭৪ সালের ফাইনাল ম্যাচ (পশ্চিম জার্মানি বনাম নেদারল্যান্ডস) আমরা আবাহনী ক্লাবে বসে নতুন টেলিভিশনে রেকর্ডেড দেখেছিলাম। তখন বিটিভিতে সরাসরি খেলা দেখানো হতো না। ১৯৭৮ সালেও কিছু ম্যাচ দেখেছি, ১৯৮২ থেকে তো নিয়মিতই সরাসরি খেলা দেখা শুরু হলো।

সময়ের সঙ্গে খেলার ধরন বদলেছে। আগে লাতিন আমেরিকান আর ইউরোপীয় স্টাইলের মধ্যে পরিষ্কার পার্থক্য বোঝা যেত।

ইউরোপিয়ানরা লম্বা পাসে বেশি খেলত। এখন পার্থক্য করা কঠিন। কারণ, লাতিন খেলোয়াড়েরা ইউরোপের লিগে খেলছে এবং তাদের স্টাইলের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে।

২০২২ বিশ্বকাপের পরপর আমি ইংল্যান্ডে গিয়েছিলাম। আমার ছেলের কল্যাণে মাঠে বসে লিভারপুল বনাম চেলসি ম্যাচ দেখি। ছেলে লিভারপুলের সমর্থক। আমার সামনে এক বৃদ্ধ উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে যান বারবার, এ কারণে পুরো ম্যাচ আমাকেও প্রায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই দেখতে হয়েছে। গোলশূন্য ড্র ম্যাচ ছিল সেটি, যা ছিল অবিশ্বাস্য রকমের উত্তেজনাপূর্ণ। গোল না হলেও গ্যালারিতে ৯০ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার যে রোমাঞ্চ, তা শুধু ফুটবলই দিতে পারে।

ফুটবল নিয়ে উম্মাদনা কখনো কমবে না কারণ, এটিই বিশ্বের এক নম্বর খেলা। আমি প্রায়ই বলি, ফুটবল–ভক্তদের খেলাটার সঙ্গে যে মানসিক সম্পৃক্ততা, তা অনেকটা উচ্চাঙ্গসংগীতের সাধকদের মতো। তাঁরা যখন খেলায় ডুবে যান, তখন বাইরের জগতের কোনো হুঁশ থাকে না।

আরও পড়ুন

মাঝেমধ্যে ভাবি, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার মতো ছোট এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ যদি বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে পারে, তবে তাদের জাতীয় সংস্কৃতিতে এর প্রভাব কতটা গভীর হয়! যদি আমাদের বাংলাদেশও কোনো দিন বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারত, গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, দেশে তখন অন্য কোনো আলোচনা থাকত না। 

আবার শুরু হয়েছে বিশ্বকাপ উন্মাদনা
এএফপি

ফুটবল দেখার সময় মানুষের শারীরিক ও মানসিক সম্পৃক্ততা চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। গ্যালারিতে দর্শক নিজের অজান্তেই খেলোয়াড়ের মুভমেন্টের সঙ্গে শরীর বা পা নাড়াতে থাকে। মাঠে যখন আমাদের সালাহউদ্দিন হেড করার জন্য মাথা ঝাঁকাত, আমি দেখেছি গ্যালারিতে বসে দর্শকেরাও একইভাবে মাথা ঝাঁকাচ্ছে!

এই যে দর্শক নিজেই খেলোয়াড় হয়ে ওঠার চেষ্টা করে, এটাই ফুটবলের সার্থকতা। ফুটবল তার ভক্তদের অন্য এক জগতে নিয়ে যেতে পারে। আর সেখানেই খেলাটার আসল জাদু লুকিয়ে।

লেখক: সাবেক ফুটবলার ও জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক কোচ