ফুটবলে কেন ও কীভাবে বিশ্বসেরা স্পেন

২০২৬ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন স্পেনরয়টার্স

ওয়েলসের রেক্সহ্যাম, বসনিয়া-হার্জেগোভিনার সারায়েভো কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি—জুলাই মাসে ভেন্যু বদলেছে, কিন্তু ফল বদলায়নি। প্রতিবারই আন্তর্জাতিক শিরোপা জিতেছে স্পেন।

গত রোববার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় স্পেন। ম্যাচে ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেসের গোল স্প্যানিশ ফুটবলে আরেকটি সোনালি গ্রীষ্মের পূর্ণতা দিয়েছে। এর আগে চলতি মাসেই ওয়েলসে অনূর্ধ্ব-১৯ পুরুষ ইউরো এবং বসনিয়া-হার্জেগোভিনায় অনূর্ধ্ব-১৯ নারী ইউরোও জিতেছে স্পেন। তবে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড় অর্জন বিশ্বকাপই। ইতিহাসে প্রথম দেশ হিসেবে পুরুষ ও নারী বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে স্পেন।

তিন বছর আগে সিডনির ফাইনালে ইংল্যান্ডকে ১-০ গোলে হারিয়ে স্পেনের মেয়েদের প্রথম বিশ্বকাপ জেতান ওলগা কারমোনা। এবার ফেরান তোরেসের গোলে পুরুষদের বিশ্বকাপেও দ্বিতীয় শিরোপা যোগ হলো স্পেনের ঝুলিতে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ইউরোও জেতে স্পেনের পুরুষ দল।

ব্যাপারটা মোটেও কাকতালীয় নয় যে পুরুষ ও নারী—দুই বিভাগেই ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে স্পেন। কোচিং, খেলোয়াড় তৈরির ধাপ এবং কৌশলগত দর্শনের এমন সমন্বয় বিশ্বের আর কোনো দেশের ফুটবলে সম্ভবত নেই, যেটা রয়েছে স্পেনে।

স্পেন সব সময়ই ফুটবলের এমন পরাশক্তি ছিল না। ২০০০ সালের আগে পুরুষদের ফুটবলে তাদের একমাত্র বড় শিরোপা ছিল ১৯৬৮ ইউরো। বড় টুর্নামেন্টগুলোতেও দলটি প্রায়ই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হতো। তবে ২০০৪ ইউরোর পর প্রধান কোচ হিসেবে লুইস আরাগোনাস দায়িত্ব নেওয়ার পর বদলে যেতে শুরু করে স্পেনের ফুটবল। এর পর থেকে পুরুষদের ফুটবলে সর্বশেষ পাঁচ ইউরোর মধ্যে তিনটি (২০০৮, ২০১২ ও ২০২৪) এবং দুটি বিশ্বকাপ (২০১০ ও ২০২৬) জিতেছে তারা।

আরও পড়ুন

পুরুষ ও নারী—দুই বিভাগেই স্পেনের ধারাবাহিক সাফল্যের পেছনে রয়েছে খেলোয়াড় গড়ে তোলার সুসংগঠিত প্রক্রিয়া। বর্তমান জাতীয় দলের অনেক খেলোয়াড়ই বয়সভিত্তিক পর্যায়ে একসঙ্গে খেলেছেন এবং ধাপে ধাপে উঠে এসেছেন।

২০২৬ বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় রদ্রি, গোলরক্ষক উনাই সিমন ও মিডফিল্ডার মিকেল মেরিনো—তিনজনই ২০১৫ সালে বর্তমান স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে অনূর্ধ্ব-১৯ ইউরো জিতেছিলেন। চার বছর পর একই কোচের অধীনেই অনূর্ধ্ব-২১ ইউরো জেতেন সিমোন, মেরিনো, ফাবিয়ান রুইজ, দানি ওলমো ও মিকেল ওইয়ারসাবাল।

নারী ফুটবলেও একই চিত্র। ২০১৭ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ ইউরোজয়ী দলে ছিলেন ওনা বাতিয়ে, পাত্রি গুইহারো ও আইতানা বোনমাতি। বর্তমান কোচ সোনিয়া বারমুদেস ২০২৩ ও ২০২৪ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ ইউরো জিতেছেন এমন ফুটবলারকে নিয়ে, যাঁদের অনেকেই আগামী কয়েক বছরে তাঁর অধীনেই সিনিয়র জাতীয় দলে জায়গা করে নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

এই শতকে বয়সভিত্তিক ফুটবলেও স্পেনের আধিপত্য ছিল চোখে পড়ার মতো। এবার অনূর্ধ্ব-১৯ পুরুষ ইউরোতে তারা পাঁচটি ম্যাচই জিতেছে, করেছে ১৯ গোল, ১টি গোলও হজম করেনি। সব মিলিয়ে এ প্রতিযোগিতায় স্পেনের শিরোপা এখন সর্বোচ্চ ১৩টি। স্পেন অনূর্ধ্ব-১৯ নারী ইউরো জিতেছে ৮ বার। ২০২২ সাল থেকে সর্বশেষ পাঁচ আসরে শিরোপাও উঠেছে তাদের হাতেই।

স্পেনের মেয়েরাও ফুটবলে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন
এএফপি

তবে নারী ফুটবলে এ সাফল্যের গল্পকে একপেশেভাবে তুলে ধরা ঠিক হবে না। কারণ, এ অগ্রগতি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক সময়ের। অনেক ক্ষেত্রেই এটি স্পেনের ফুটবল ফেডারেশনের সহায়তায় নয়; বরং নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই এসেছে।

তারপরও একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই, বয়সভিত্তিক দল থেকে শুরু করে স্পেনের বর্তমান পুরুষ ও নারী বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দলের সবাই একই ধরনের ফুটবল খেলেন, যা সহজেই চেনা যায়। গত দুই দশকে নিজেদের শক্তির জায়গায় আস্থা রেখে এবং সেই দর্শনের ওপর ধারাবাহিকভাবে কাজ করার ফলেই এ সাফল্য এসেছে।

স্পেনের সাফল্যের ভিত্তি হলো, উন্নত কোচিংয়ের মাধ্যমে দক্ষ ফুটবলার তৈরি করা এবং সুযোগ থাকলে খেলোয়াড়দের বয়সভিত্তিক পর্যায় থেকেই একসঙ্গে গড়ে তোলা। এ কারণেই জাতীয় দলের দায়িত্বে লুইস দে লা ফুয়েন্তে ও সোনিয়া বারমুদেসের মতো নিজেদের ফুটবলকাঠামো থেকে উঠে আসা কোচদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

২০১৩ সালের সর্বশেষ তথ্য বলছে, স্পেনে উয়েফার ‘এ’ ও ‘প্রো’ লাইসেন্সধারী কোচ ছিলেন ১৫ হাজার ৪২৩ জন। একই সময়ে জার্মানিতে এ সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৯৩৭, ফ্রান্সে ৩ হাজার ৩০৮, ইতালিতে ২ হাজার ২৮১ এবং ইংল্যান্ডে মাত্র ১ হাজার ৩৯৫।

কোচ তৈরির ক্ষেত্রেও স্পেনের গুরুত্ব অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি। উয়েফা এখন আর দেশভিত্তিক লাইসেন্সধারী কোচের পরিসংখ্যান প্রকাশ করে না। তবে ২০১৩ সালের সর্বশেষ তথ্য বলছে, স্পেনে উয়েফার ‘এ’ ও ‘প্রো’ লাইসেন্সধারী কোচ ছিলেন ১৫ হাজার ৪২৩ জন। একই সময়ে জার্মানিতে এ সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৯৩৭, ফ্রান্সে ৩ হাজার ৩০৮, ইতালিতে ২ হাজার ২৮১ এবং ইংল্যান্ডে মাত্র ১ হাজার ৩৯৫। এ পরিসংখ্যান কোচিং শিক্ষায় স্পেনের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের চিত্র তুলে ধরে।

এর প্রভাব দেখা যায় ইউরোপের শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলেও। প্রিমিয়ার লিগে কয়েকটি বড় ক্লাবের দায়িত্বে স্প্যানিশ কোচ। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্সেনালের কোচ মিকেল আরতেতা, অ্যাস্টন ভিলায় উনাই এমেরি, চেলসির জাবি আলোনসো এবং লিভারপুলের আন্দোনি ইরাওলা স্প্যানিশ। ম্যানচেস্টার সিটিকে ১০ বছরে ছয়টি লিগ শিরোপা জেতানোর পর সম্প্রতি দায়িত্ব ছেড়েছেন স্পেনের কিংবদন্তি কোচ পেপ গার্দিওলা।

নারী ফুটবলেও স্প্যানিশ কোচদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। উইমেনস সুপার লিগে লন্ডন সিটি লায়নেসের কোচ এদের মায়েস্ত্রে এবং অ্যাস্টন ভিলার কোচ নাটালিয়া আরোয়ো স্প্যানিশ। ইউরোপের অন্য শীর্ষ ক্লাবগুলোর মধ্যেও রয়েছেন স্প্যানিশ কোচ।

দেশে ফিরে বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে স্পেন অধিনায়ক রদ্রি
রয়টার্স

প্রত্যেক স্প্যানিশ কোচের নিজস্ব ধরন ও বৈশিষ্ট্য থাকলেও তাঁদের ফুটবলে একটি সাধারণ ছাপ স্পষ্ট। সেটি গড়ে উঠেছে তিনটি ‘পি’-এর দর্শনের ওপর: পজেশন (বল দখলে রাখা), পজিশনিং (সঠিক অবস্থান নেওয়া) এবং প্রেসিং (প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা)। ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত বার্সেলোনার কোচের দায়িত্ব পালন করা ডাচ কিংবদন্তি ইয়োহান ক্রুইফ এ দর্শনের ভিত্তি স্থাপন করেন।

এ কারণেই বার্সেলোনার বিখ্যাত ‘লা মাসিয়া’ একাডেমি স্পেনের সবচেয়ে সফল দলগুলোর মেরুদণ্ড হয়ে উঠেছে। ২০০৮ ও ২০১২ সালের টানা দুটি ইউরো এবং ২০১০ সালের বিশ্বকাপজয়ী দলে কার্লোস পুয়োল, জেরার্ড পিকে, জর্দি আলবা, জাভি হার্নান্দেজ, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, পেদ্রোসহ লা মাসিয়া থেকে উঠে আসা বেশ কয়েকজন ফুটবলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এবারের বিশ্বকাপেও স্পেন দলে বার্সেলোনার আটজন খেলোয়াড় ছিলেন। ফারমিন লোপেজ চোটে না পড়লে সেই সংখ্যা হতো ৯। নারী দলেও বার্সেলোনার প্রভাব চোখে পড়ার মতো।

আরও পড়ুন

তবে স্পেনের সাফল্যকে শুধু বার্সেলোনার অবদান বলে ব্যাখ্যা করলে অন্য একাডেমিগুলোর প্রতি অবিচারই করা হবে। স্পেনের ফুটবল–দর্শন বার্সেলোনা থেকে অনুপ্রাণিত হলেও সেটি জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে উন্নত কোচিং, ধারাবাহিক বয়সভিত্তিক উন্নয়ন, ফুটবল ফেডারেশনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং অন্যান্য ক্লাবের অবদানে। যেখানে বাকি সব ক্লাবের একই রকম অবদান আছে।

ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের বদলে দলগত শক্তির ওপর আস্থা রাখাও স্পেনের সাফল্যের অন্যতম কারণ। যেমন এবারের বিশ্বকাপে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন লিওনেল মেসি, নরওয়ের আর্লিং হলান্ড, ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে ও ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহামের মতো তারকা ফুটবলাররা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শিরোপা জিতেছে দলগত ফুটবলের ওপর ভরসা করা স্পেন।