২০০২ বিশ্বকাপ
এশিয়ায় বিশ্বকাপ, রোনালদোর পাপমোচন এবং ব্রাজিলের ‘পেন্টা’
১৯৩০ সালে মন্টেভিডিওর সেই ধূসর বিকেলে বিশ্বকাপ নামে যে মহাযাত্রার শুরু হয়েছিল, তা আজ শতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। এই যাত্রার কোথাও পেলে-গারিঞ্চার সাম্বার ছন্দ, কোথাও ম্যারাডোনার ঈশ্বরপ্রদত্ত জাদুকরি ছোঁয়া, আবার কোথাও জিনেদিন জিদান কিংবা লিওনেল মেসির অমরত্বের পথে হেঁটে যাওয়া—সব মিলিয়েই তো এই ফুটবল-পুরাণ। ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে বিশ্বকাপের সব রোমাঞ্চকর স্মৃতি ফেরানোর আয়োজন—ফিরে দেখা বিশ্বকাপ।
শুরু থেকেই ইউরোপ আর আমেরিকার চেনা আঙিনাতেই ঘুরপাক খেয়েছে বিশ্বকাপ। ৭২ বছরের সেই আধিপত্য ভেঙে সেবারই প্রথম বিশ্বকাপ পা রাখল এশিয়া মহাদেশে। শুধু তা–ই নয়, ইতিহাসের প্রথম যৌথ আয়োজক হিসেবে হাত মেলাল দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান। ২০টি ঝকঝকে স্টেডিয়ামে প্রযুক্তির এক চোখধাঁধানো প্রদর্শনী দেখল বিশ্ব। এর চেয়ে বেশি স্টেডিয়ামে কোনো বিশ্বকাপ হয়নি আর।
তবে মাঠের বাইরে দুই আয়োজকের সম্পর্কটা কিন্তু পুরোপুরি ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ ছিল না। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে কোরিয়া দখল করেছিল জাপান। সেই পুরোনো রাজনৈতিক তিক্ততার মেঘ হুট করেই যেন আকাশে ভেসে উঠল। সিউল স্টেডিয়ামের ভিআইপি বক্সে জাপানি সম্রাট আকিহিতোর আসনটি খালিই পড়ে রইল। কোরিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি চুং মং জুন এই অনুপস্থিতিকে তুলনা করেছিলেন এক অদ্ভুত উপমায়, ‘বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান তো অনেকটা বিয়ের বন্ধনের মতো। বর বা কনের কেউ একজন যদি বিয়েতে না আসে, ব্যাপারটা ঠিক তেমন হলো। এটা রুচির ব্যাপার নয়, এটা ছিল দায়বদ্ধতা।’
তবে মাঠের খেলা শুরু হতেই এই রেষারেষি ম্লান হয়ে গেল, টুর্নামেন্ট এগিয়ে চলল আপন গতিতে।
নতুন নিয়ম
ফিফা এই বিশ্বকাপে বেশ কিছু বড় পরিবর্তন নিয়ে এল। স্কোয়াডে খেলোয়াড়ের সংখ্যা ২২ থেকে বাড়িয়ে করা হলো ২৩। আর আগের চ্যাম্পিয়নদের জন্য সরাসরি পরের বিশ্বকাপে খেলার যে নিয়ম ছিল, তা বাতিল করা হলো। ঠিক হলো, চ্যাম্পিয়নদেরও বাছাইপর্ব পেরিয়ে আসতে হবে!
ট্র্যাজেডি ও বিদায়
সেই বিশ্বকাপের আগেই সবাই বলতে শুরু করেছিল, ফাইনাল হবে ফ্রান্স-আর্জেন্টিনার মধ্যে।
কিন্তু ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের জন্য ওই বিশ্বকাপ ছিল চরম এক হতাশার নাম। ১৯৬৬ সালে ব্রাজিলের পর এই প্রথম কোনো বর্তমান চ্যাম্পিয়ন প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নিল। পুরো টুর্নামেন্টে একটা গোলও করতে পারল না ফরাসিরা! উরুগুয়ের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে গ্রুপ ‘এ’-র তলানিতে থেকে বিদায় নিলেন জিদান-অঁরিরা।
আর্জেন্টাইন সমর্থকদের বুকেও শেল বিঁধেছিল সেবার। লাতিন আমেরিকার বাছাইপর্বে ঝড় তুলে আসা মার্সেলো বিয়েলসার দল গ্রুপ অব ডেথ-এ পড়ে নাইজেরিয়াকে হারালেও ইংল্যান্ডের কাছে হেরে এবং সুইডেনের সঙ্গে ড্র করে প্রথম পর্বেই বাক্সপ্যাটরা গুটিয়ে নেয়। হলো না স্বপ্নের সেই ফাইনাল।
রেকর্ড বইয়ে ওলট-পালট
তুরস্কের অধিনায়ক হাকান শুকুরকে মনে আছে? দেগুতে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে বাঁশি বাজার ঠিক ১০.৮ সেকেন্ডের মাথায় গোল করে বসেন তিনি। ওটাই এখনো বিশ্বকাপের ইতিহাসের দ্রুততম গোল।
ওদিকে সুইডেনের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে আর্জেন্টিনার ফরোয়ার্ড ক্লদিও ক্যানিজিয়া বেঞ্চে বসেই লাল কার্ড দেখেন! ম্যাচের ৪৭ মিনিটে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রেফারি আলি বুজসাইমকে গালি দেওয়ার অপরাধে রেফারি সরাসরি লাল কার্ড দেখান ‘এল পাজারো’কে। নিজের শেষ বিশ্বকাপে এক মিনিটও মাঠে না নেমে এভাবে লাল কার্ড দেখার রেকর্ড বোধ হয় ক্যানিজিয়াই প্রথম গড়লেন।
অধিনায়কের নির্বাসন
আয়ারল্যান্ড দল যখন বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন দলের প্রাণভোমরা ও অধিনায়ক রয় কিনকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন কোচ মিক ম্যাককার্থি। অপরাধ? রয় কিন সংবাদমাধ্যমে দলের অনুশীলনের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। পরে অবশ্য কিন দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু কোচের মন গলেনি। ম্যাককার্থি কড়া গলায় বললেন, ‘আমি যত দিন কোচ আছি, ও এই দলে ফিরবে না।’
আইরিশ ফেডারেশন কিনের জায়গায় কলিন হিলিকে দলে নিতে চেয়েছিল, কিন্তু ফিফা তা নাকচ করে দেয়। কারণ, দল দেওয়ার সময় পার হয়ে গিয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী কেবল চোট বা পরিবারের কারও মৃত্যুর কারণ ছাড়া খেলোয়াড় বদলানো যায় না। ফলে একজন কম নিয়েই বিশ্বকাপ খেলতে হয়েছিল আয়ারল্যান্ডকে।
ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনার ভুল
ওই বিশ্বকাপের পর চীনের সার্বিয়ান কোচ বোরা মিলুতিনোভিচ জার্মান একটি পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এক মজার গল্প শোনালেন। বিশ্বকাপে যাওয়ার আগে তিনি নাকি এক গির্জায় গিয়ে ঈশ্বরের সঙ্গে কথা বলছিলেন। ঈশ্বর জিজ্ঞেস করলেন, ‘বোরা, তুমি কী চাও?’ বোরা উত্তর দিলেন, ‘ফ্রান্সের মতো সাফল্য চাই।’ ঈশ্বর তাঁর কথা রেখেছিলেন! সেবার ফ্রান্স আর চীন—এই দুটি দেশই বিশ্বকাপে কোনো গোল করতে পারেনি। বোরা আফসোস করে বললেন, ‘আসলে আমি ১৯৯৮ বিশ্বকাপের ফ্রান্সের কথা বুঝিয়েছিলাম, যারা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। কিন্তু বলতে ভুল করে ফেলেছিলাম!’
তার মানে, ঈশ্বরের কাছে কিছু চাইলে একদম নিখুঁতভাবে চাইতে হয়।
বেকহামের প্রতিশোধ
বিশ্বকাপের ঠিক দুই মাস আগে, চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচে দেপোর্তিভো লা করুনিয়ার আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার আলদো দুশারের এক সহিংস ট্যাকলে ভেঙে যায় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ইংলিশ মিডফিল্ডার ডেভিড বেকহামের বাঁ পায়ের মেটাটারসাল হাড়। তাঁর বিশ্বকাপে খেলাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তবে বেকহাম অলৌকিকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠেন এক বিশেষ ‘বোন রিকনস্ট্রাকশন থেরাপি’র মাধ্যমে, যা সাধারণত রেসের ঘোড়াদের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হতো। আর নিয়তির কী অদ্ভুত খেলা, সেই চোট কাটিয়ে ফিরেই গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে জয়সূচক গোলটি করে দারুণ এক প্রতিশোধ নেন বেকহাম।
ন্যাড়া মাথার গোলকধাঁধা
তুরস্কের বিপক্ষে সেমিফাইনালের আগে ব্রাজিলের স্ট্রাইকার রোনালদো এক অদ্ভুত ছাঁটে চুল কাটলেন। মাথার চারপাশ পুরো ন্যাড়া, শুধু কপালের ওপর ইঞ্চি চারেকের এক টুকরা চুল রেখে দিলেন ত্রিভুজ আকারে। সংবাদমাধ্যমকে রোনালদো বলেছিলেন, ‘বিশেষ কোনো কারণ নেই। ট্রিমার নিয়ে নিজেই একটু বদল আনার চেষ্টা করলাম। আশা করি ফাইনালে ওঠার জন্য এই ছাঁট ভাগ্য বয়ে আনবে।’
তবে আসল কারণটা জানা গেল কিছুদিন পর। ২১ জুন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচের সময় রোনালদোর দেড় বছরের ছেলে রোনালদ্ টেলিভিশনের পর্দার সামনে গিয়ে ‘পাপা, পাপা’ বলে স্ক্রিনে চুমু খাচ্ছিল। কিন্তু স্ক্রিনে তখন রোনালদো নন, ছিলেন ব্রাজিলের ন্যাড়া মাথার ডিফেন্ডার রবার্তো কার্লোস! তখন রোনালদো ও কার্লোস—দুজনেরই মাথা পুরোপুরি ন্যাড়া ছিল। নিজের প্রথম সন্তানকে এমন গোলকধাঁধায় আক্রান্ত দেখে রোনালদো ঠিক করলেন, মাথায় এমন এক স্টাইল রাখতে হবে, যেন ছেলে ভুল করে অন্য কোনো ন্যাড়া মাথার ‘পরপুরুষকে’ বাবা মনে না করে!
রোনালদোর পাপমোচন এবং ব্রাজিলের ‘পেন্টা’
নতুন শতাব্দীর প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি ফুটবল ইতিহাসের দুই পরাশক্তি—ব্রাজিল ও জার্মানি। ব্রাজিল তখন চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, জার্মানি তিনবারের। অবাক করা তথ্য হলো, এর আগে বিশ্বকাপে এই দুই পরাশক্তির কখনো দেখাই হয়নি! অথচ ফাইনালের আগে ব্রাজিল খেলে ফেলেছে ৮৬টি ম্যাচ আর জার্মানি ৮৪টি। ব্রাজিল একমাত্র দেশ, যারা প্রতিটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে। আর জার্মানি কেবল দুটি বিশ্বকাপ খেলেনি—১৯৩০ সালের প্রথম আসরে তারা আটলান্টিক পাড়ি দিতে রাজি হয়নি, আর ১৯৫০ বিশ্বকাপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অপরাধের কারণে তাদের নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
আগের বিশ্বকাপের (১৯৯৮) ট্র্যাজিক হিরো রোনালদো ‘দ্য ফেনোমেনন’ যেন বিধাতার লিখে রাখা পাণ্ডুলিপি মেনে রাজকীয় পারফর্ম করলেন। তাঁর জোড়া গোলে জার্মানিকে হারিয়ে পঞ্চমবারের মতো বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরল সেলেসাওরা। বাছাইপর্বে ধুঁকতে ধুঁকতে আসা ব্রাজিল মূল আসরের প্রতিটি ম্যাচ জিতে চ্যাম্পিয়ন হলো। ১৯৩০ সালে উরুগুয়ে, ১৯৩৮ সালে ইতালি এবং ১৯৭০ সালে পেলের ব্রাজিলের পর এই কীর্তি গড়ল কাফুর ব্রাজিলও।