বিশ্বকাপের মালিকানা বিক্রির পরিকল্পনা: মূল্য কত, কেন এ পথে হাঁটছে ফিফা

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোরয়টার্স

বিশ্বকাপ, ক্লাব বিশ্বকাপসহ নিজেদের প্রধান ফুটবল আসরগুলো পরিচালনা করতে নতুন একটি কোম্পানির কাছে বড় আকারের সংখ্যালঘু শেয়ার বিক্রির পরিকল্পনা করেছে ফিফা। মূলত ২১১টি সদস্যসংস্থাকে দেওয়া উন্নয়ন তহবিলের পরিমাণ তিন গুণ করার বড় উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) নামে নতুন এ প্রতিষ্ঠান সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। তবে ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বহাল থাকবে ফিফাই এবং এফএফইয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ার বা মালিকানাও তাদের হাতেই থাকবে। তবে এ প্রস্তাবের বাস্তবায়ন নির্ভর করছে ফিফার ৩৭ সদস্যের কাউন্সিল ও বেশির ভাগ জাতীয় অ্যাসোসিয়েশনের অনুমোদনের ওপর।

গত মঙ্গলবার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এ পরিকল্পনার নানা দিক প্রকাশিত হতে শুরু করলে ফিফা তড়িঘড়ি করে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানাতে বাধ্য হয়। বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি নিশ্চিত করে, নতুন প্রতিষ্ঠান ‘এফএফই’র সর্বোচ্চ ২১ শতাংশ শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করতে চায় তারা। ‘ফিফা ফাস্ট ফরওয়ার্ড প্রোগ্রাম’ (এফএফএফপি) নামে নতুন একটি অর্থায়ন প্রকল্পের আওতায় সদস্যসংস্থাগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে দেওয়ার জন্য ৪২০ কোটি ডলার তোলাই এ পদক্ষেপের লক্ষ্য।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও নিশ্চিত করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক জেপি মরগান এ প্রকল্পে ফিফার প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই জশুয়া কুশনারের বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ‘থ্রাইভ ইটারনাল’ এফএফইর ‘প্রস্তাবিত এই বিনিয়োগকারী দলের নেতৃত্ব দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে’।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বেশ ভালো সম্পর্ক রয়েছে ইনফান্তিনোর
এএফপি

এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আগামী চার বছরে ফিফার মোট উন্নয়ন তহবিলের পরিমাণ ১০০ কোটি ডলার ছড়িয়ে যাবে। নতুন ‘এফএফএফপি’ প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি সদস্যসংস্থা ‘বিশেষ ও জরুরি প্রকল্পের’ জন্য ‘ঐচ্ছিক’ হিসেবে ২ কোটি ডলার করে তুলে নিতে পারবে। এই অর্থ আসবে সংখ্যালঘু শেয়ার বিক্রির টাকা থেকে।
তবে এটি বড় অর্থ পাওয়ার কেবল শুরু। কারণ, আগামী চার বছরের চক্রে প্রতিটি সদস্য সংস্থা নিয়মিত ‘ফরোয়ার্ড প্রোগ্রাম’ অনুদান হিসেবে বর্তমানে ৮০ লাখ ডলারের জায়গায় ২ কোটি ডলার করে পাবে। বরাদ্দের পরিমাণ ২০৩১-৩৪ সময়ে দেশপ্রতি বেড়ে দাঁড়াবে ২ কোটি ২০ লাখ ডলার এবং ২০৩৫-৩৮ মেয়াদে ২ কোটি ৪০ লাখ ডলার, যা বর্তমান অঙ্কের তিন গুণ।

এ পরিকল্পনার পেছনে কে

এটি ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর মস্তিষ্কপ্রসূত পরিকল্পনা। সংবাদমাধ্যম দ্য অ্যাথলেটিক জানিয়েছে, এ বিষয়ে তিনি কয়েক মাস ধরে কাজ করেছেন।

ফিফা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ইনফান্তিনো বলেন, ‘আমাদের পরবর্তী ধাপের প্রবৃদ্ধির জন্য এমন একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো প্রয়োজন, যেখানে ফুটবলের বাণিজ্যিক দিকটি একনিষ্ঠ ও নিবেদিত ব্যবসা হিসেবে পরিচালিত হবে এবং এর থেকে অর্জিত মূল্য সারা বিশ্বে আরও ভালোভাবে ও সমবণ্টনের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়বে। এটি মূলত বিশ্বজুড়ে ফুটবলের গণতান্ত্রিকীকরণেরই একটি প্রয়াস।’

বেশির ভাগ জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনই যেখানে আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে ফিফা অনুদানের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে ফিফার এ প্রস্তাব যে তাদের কাছে সমাদৃত হবে, তা বলাই বাহুল্য।

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো পরিকল্পনাটি করেছেন
ইনস্টাগ্রাম/ইফান্তিনো

বাইরের বিনিয়োগ এনে ফিফার সম্পত্তিকে ব্যবসায়িকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা এই প্রথম করছেন না ইনফান্তিনো। ২০১৮ সালেও সৌদি অর্থায়নে পরিচালিত জাপানি প্রতিষ্ঠান সফটব্যাংক থেকে ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার এনে বড় আকারের ক্লাব বিশ্বকাপ ও গ্লোবাল নেশনস লিগ আয়োজনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন ফিফা সভাপতি।

দ্য অ্যাথলেটিককে ফিফার এক মুখপাত্র নিশ্চিত করেন, জেপি মরগান এই প্রকল্পে ফিফাকে উপদেষ্টা হিসেবে পরামর্শ দিয়ে যাবে। সেই সঙ্গে রোমভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘ওপেনইকোনমিকস’ এবং ‘ব্যান ভেঞ্চার্স’-এর প্রধান নির্বাহী গ্রেগ মাফেই এ প্রকল্পে উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন।

প্রতিক্রিয়া কেমন

বিশ্বকাপের সময় ও তার আগে কিছু বিতর্কের কথা বিবেচনা করলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক থাকা জোশুয়া কুশনারের মতো কারও যুক্ত হওয়ার বিষয়টি বিশ্ব ফুটবলে নিশ্চিতভাবেই ভুরু কোঁচকানোর মতো পরিস্থিতির জন্ম দেবে। এমনিতেই ফুটবলের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলো বেসরকারি বিনিয়োগকারী ও সার্বভৌম তহবিলের কাছে বিক্রি করার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা।

ফিফা তাদের পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর আগে এক বিবৃতিতে উয়েফার পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘এটি এমন একটি সীমানা পেরোবে, যা ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কখনোই অতিক্রম করা উচিত নয়।’ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘বিষয়টিকে উয়েফা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। প্রতিটি জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনেরও বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। ফুটবল লিগ, ক্লাব, খেলোয়াড়, সমর্থক, সরকার এবং বিশ্ব ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন—এমন প্রতিটি অংশীদারেরও এটি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত।’

সুইজারল্যান্ডের নিওনে উয়েফার সদরদপ্তর
রয়টার্স

বিবৃতিতে কড়া ভাষায় উয়েফা বলেছে, ‘ফুটবলের আত্মা এবং এর পরিচালনা ব্যবস্থা কোনো কেনাবেচার জিনিস নয়—বিশেষ করে আর্থিক লাভের টাকা কার পকেটে যাচ্ছে, সে বিষয়ে যেখানে কোনো স্বচ্ছতা নেই। আমরা কেউই ফুটবলের মালিক নই। ফুটবল বেচে দেওয়ার এখতিয়ার ফিফার নেই।’

ফুটবল অনুরাগী হিসেবে পরিচিত যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘বিশ্বকাপ কোনো পণ্য নয়। এটি বিশ্বের ক্রীড়াঙ্গনে সেরা প্রতিযোগিতা এবং বেচে দেওয়ার জন্য কখনোই কারও সম্পত্তি ছিল না। এই চুক্তিকে যেভাবে ইচ্ছা সাজিয়ে-গুছিয়ে উপস্থাপন করুন না কেন, একবার আপনি এর একটি অংশ বিক্রি করে দেওয়া মানেই আপনি এর সঙ্গে প্রতারণা করলেন।’ পোস্টে বার্নহাম যোগ করেন, ‘ফুটবল সমর্থকদের সম্পত্তি। ফুটবল সব সময়ই সমর্থকদের ছিল এবং সব সময় থাকবে।’

আরও পড়ুন

তবে উল্টো কথা বলার মানুষের সংখ্যাও কম হবে না, হয়তো বেশিই হবে। তাঁরা বলতে পারেন, ফরাসি ও স্প্যানিশ লিগগুলো যেভাবে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করে প্রাইভেট-ইকুইটি ফান্ডগুলোর কাছে শেয়ার বিক্রি করেছে, ফিফার এই প্রস্তাব তার চেয়ে আলাদা কিছু নয়। এমনকি জার্মানি ও ইতালির লিগগুলোও কয়েক বছর ধরে একই ধরনের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করছে। এ ছাড়া অন্যান্য খেলাধুলার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও লিগও এ কৌশল বাস্তবায়ন করেছে, যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ফর্মুলা ওয়ান ও গলফের পিজিএ ট্যুর।

ফিফার কি অর্থের খুব দরকার

বাইরের সাহায্য ছাড়াই রেকর্ড পরিমাণ অর্থ আয় করছে ফিফা। কিছুদিন আগে শেষ হওয়া বিশ্বকাপ এবং সর্বশেষ ক্লাব বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে শেষ হওয়া চার বছরের চক্রে ফিফার আয় ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি তাদের ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রাকেও ছড়িয়ে গেছে, যা ২০১৯-২২ মেয়াদে অর্জিত আয়ের দ্বিগুণ।

ফিফার তাদের টুর্নামেন্টগুলোর নিয়ন্ত্রণ যদি শুধু ব্যবসায়িক মুনাফা বাড়ানোর লক্ষ্যে গঠিত কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেয়, তবে এই আয়ের অঙ্ক যে আরও অনেক বাড়বে, তা নিশ্চিত। আর এর ফল হিসেবে ভবিষ্যতে দেখা যেতে পারে ৬৪ দলের বিশ্বকাপ। এর পাশাপাশি নারী ফুটবলেও একই ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফিফার সদরদপ্তর
এএফপি

প্রশ্ন উঠেছে, নতুন এই ‘এফএফই’ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে কারা থাকবেন? ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস দাবি করেছে, প্রতিষ্ঠানটির প্রধান হবেন ইনফান্তিনো নিজেই। সেখানে তাঁর বেতন হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ফুটবল লিগের (এনএফএল) কমিশনার রজার গুডেলের সমান। ২০২১ সালের তথ্যানুযায়ী গুডেল বছরে ৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার পেয়েছেন। ইনফান্তিনোর ক্ষেত্রে সেটা হবে তাঁর বর্তমান বেতনের প্রায় ১০ গুণ বেশি।

দ্য অ্যাথলেটিককে ফিফার এক মুখপাত্র বলেন, ‘এ বিষয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি। তবে প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে ফিফার বিধিবিধান মেনে এবং সদস্যসংস্থাগুলোর স্বার্থ সুরক্ষায় সংস্থাটির সভাপতি ও প্রশাসনকে অবশ্যই এই নতুন প্রতিষ্ঠানে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে, যাতে ফিফার প্রতিটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান সব সময় তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকে।’

আরও পড়ুন