বাবাকে মেসি—‘আর একটু অপেক্ষা করতে পারলে না?’

বাবার উদ্দেশে লেখা চিঠির সঙ্গে এই ছবিটি পোস্ট করেছেন লিওনেল মেসিইনস্টাগ্রাম/মেসি
দীর্ঘ অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে ৮ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান লিওনেল মেসির বাবা হোর্হে মেসি। বিশ্বকাপ ফাইনালের পর আর্জেন্টিনায় কিছুদিন কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরেছিলেন মেসি। বাবার মৃত্যুর খবরে আবার আর্জেন্টিনায় ফিরে যান। বাবার প্রয়াণের চার দিন পর ইনস্টাগ্রামে আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন মেসি। সদ্য প্রয়াত বাবার উদ্দেশে বলা কথাগুলোয় আছে অবসরের ইঙ্গিতও। পাঠকদের জন্য মেসির বাবাকে লেখা খোলাচিঠির অনুবাদ দেওয়া হলো।

‘বাবা, এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না তুমি আর নেই। কথাটা আমি মেনে নিতে পারছি না, অথবা বলা ভালো, মানতেই চাই না। ভাবতে খুব কষ্ট হয় যে তোমাকে আর কখনো দেখতে পাব না, তোমার সঙ্গে আর কখনো কথা বলতে পারব না। আমি জানি তুমি অনেক কষ্ট পাচ্ছিলে এবং হয়তো এটাই তোমার জন্য ভালো হয়েছে। কিন্তু তুমি বড্ড তাড়াতাড়ি আমাদের ছেড়ে চলে গেলে। আমাদের একসঙ্গে উপভোগ করার মতো কত কিছু যে বাকি রয়ে গেল!

তুমি আমাকে বারবার বলেছিলে, আরেকটি বিশ্বকাপ খেলতে। বিশ্বকাপ শুরুর কয়েক দিন আগে তোমার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলো। এই প্রথম কোনো টুর্নামেন্টে তুমি আমার সঙ্গে থাকতে পারছিলে না। কিন্তু মা আমাকে বারবার বলছিলেন, তুমি সুস্থ হয়ে উঠবে এবং ভ্রমণ করার মতো অবস্থায় চলে আসবে। আমি তোমাকে বলতাম, আমরা ফাইনালে উঠব, যাতে তুমি সেখানে আসতে পারো।

প্রতিটি ম্যাচের পর আমি তোমার বার্তার অপেক্ষায় থাকতাম, আর তোমার এসএমএস খুব মিস করতাম। তখনই বুঝতে পারলাম, পরিস্থিতি আসলে কতটা গুরুতর। তারপরও ভেবেছি, যতটা সম্ভব সামনে এগিয়ে যেতে হবে, যাতে তুমি আরও কিছু সময় পাও এবং অন্তত একটি ম্যাচ দেখার সুযোগ হয়।

আমরা ফাইনালে উঠলাম, কিন্তু তুমি সেখানে থাকতে পারোনি। আমি টুর্নামেন্টটা জিততে চেয়েছিলাম, যাতে ট্রফিটা তোমার কাছে নিয়ে যেতে পারি, তোমাকে আরেকটি ট্রফি দেখাতে পারি। কিন্তু পারলাম না। আমার পা আর আমাকে সঙ্গ দেয়নি। আমার শরীর যতটা সহ্য করতে পারে, তার চেয়েও বেশি চেষ্টা করেছি এবার। কিন্তু পারিনি। শারীরিকভাবে কখনোই নিজেকে ঠিকঠাক মনে হয়নি।

আমি ফিরে আসার পর তুমি ভেবেছিলে, আমরা টাইব্রেকারে ফাইনাল হেরেছি। বিশ্বকাপে কী ঘটেছিল, সে নিয়ে আমরা কোনো কথাই বলতে পারিনি। তুমি সেসবের কিছুই উপভোগ করতে পারোনি। আমরা চ্যাম্পিয়ন হতে পারিনি, কিন্তু তুমি জানো না, প্রতিটি ম্যাচ আমরা কতটা উপভোগ করেছি। আবারও তুমিই সঠিক প্রমাণিত হলে—আমার বিশ্বকাপে থাকা এবং খেলা উচিত ছিল।

তোমাকে এসব বলছি, কারণ এটাই ছিল একমাত্র বিষয়, যেটা নিয়ে আমাদের কথা বলার সুযোগ হয়নি। বাকি সবকিছু তুমি জানো। আমরা প্রতিদিন কথা বলতাম, আমার ব্যস্ততার মাঝে যখনই সুযোগ পেতাম, ততবারই দেখা করতাম।

তোমাকে ছাড়া আমি কী করব, জানি না। কীভাবে সামনে এগিয়ে যাব, তা–ও জানি না। আমি সারা জীবন শুধু ফুটবলই খেলেছি। এখন আর কত দিন এটা চালিয়ে যেতে পারব, তা নিয়েও আমার মনে সন্দেহ জাগছে। একদম শুরু থেকেই তুমি আমার পাশে ছিলে। শেষ সময়টার তো আর সামান্যই বাকি ছিল। কেন আর একটু অপেক্ষা করতে পারলে না? তাহলে আমরা দুজন একসঙ্গে শেষটা দেখতে পারতাম।

ছবিটি ২০১৬ সালের। যখন কর মামলায় স্পেনের আদালতে ছেলের সঙ্গে হাজিরা দিয়েছিলেন হোর্হে মেসি
এএফপি

আমি জানি, তোমার আনন্দ ছিল পরিবারের ভালো থাকার মধ্যে—তোমার স্ত্রী, তোমার সন্তানদের ভালো থাকা। আর সবার অজান্তে, সবচেয়ে বেশি সুখ পেতে আমাকে খেলতে দেখে…

ছোটবেলা থেকেই এমনটা ছিল। তুমি কাজ থেকে ফিরেই আমাকে অনুশীলনে নিয়ে যেতে। তুমি কাজে থাকলে মা আমাকে অনেক অনুশীলনে নিয়ে যেতেন।

আর হ্যাঁ, তুমি কখনোই আমার একটা ম্যাচও বাদ দিতে না। আমার খেলা দেখার সময় তুমি কতটা না কষ্ট পেতে, আবার কতটাই–না আনন্দ পেতে, যদিও তুমি কখনোই আমাকে সরাসরি অত বেশি প্রশংসা করতে না!

তুমি ছিলে আমার বাবা, আমার বন্ধু, আমার এজেন্ট। কোন মুহূর্তে তোমার ভূমিকা কী হওয়া উচিত, তা তুমি খুব ভালো করেই জানতে। আর তোমার হিসাব কখনোই ভুল হতো না। আমাদের মধ্যে তর্ক বা মতের অমিল হলেও শেষ পর্যন্ত তুমিই ঠিক হতে। শেষ পর্যন্ত সবকিছু সেভাবেই হতো, যেভাবে তুমি বলতে।

আমি তোমাকে খুব মিস করব বাবা। কিন্তু তুমি সব সময় আমাদের সঙ্গেই থাকবে। বিশেষ করে আমি যেভাবে আমার সন্তানদের বড় করব, তাতে তোমার উপস্থিতি থাকবে। কারণ, তুমি আর মা আমাকে যেভাবে শিখিয়েছ, যেভাবে মানুষ করেছ, আমিও তাদের সেভাবেই বড় করব।

শান্তিতে থেকো, বাবা। ওপর থেকে আমাদের দেখে রেখো, যেমনটা এখানে থাকতে সব সময় রেখেছ। সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ।

আমি তোমাকে ভালোবাসি, বাবা।’

আরও পড়ুন