অ্যানাকোন্ডার প্যাঁচে এমবাপ্পেদের ‘শ্বাস রোধ’ করেছে স্পেন

বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার পর সতীর্থদের সঙ্গে রদ্রির উদ্‌যাপনএএফপি

‘অ্যানাকোন্ডা গ্রিপ।’

বাংলায় খুব কাছাকাছি অর্থ হতে পারে, অ্যানাকোন্ডার মতো আষ্ঠেপৃষ্ঠে কুণ্ডলী পাকিয়ে ধরা। দক্ষিণ আমেরিকার এ সাপ ভীষণ শক্তিতে শিকারকে শরীর দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে। তাতে ধীরে ধীরে শিকারের দম আটকে আসে, ভেতরের হাড়গোড়ও আস্ত থাকে না। শিকার যত শক্তিশালীই হোক না কেন, এক পর্যায়ে শ্বাস রোধ হয়ে মারা যায়।

বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ফ্রান্স কি এভাবেই হারল? বার্তা সংস্থা রয়টার্স তেমনই মনে করছে—স্পেনের ‘অ্যানাকোন্ডা গ্রিপ’–এর চাপে চূর্ণ হয়েছে ফরাসিদের বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন।

ডালাসের সেমিফাইনাল দেখলে কথাটির অর্থ বুঝে নেওয়া সহজ। ফ্রান্সের খেলোয়াড়দের পায়ে বল থাকতে এমন প্যাঁচ দিয়ে ধরেছে স্প্যানিশ মিডফিল্ড ও ডিফেন্স। যেন পাসে পাসে ফ্রান্স বক্সে ঢুকতে না পারে। মাইকেল ওলিসে, অঁরেলিয়ে চুয়ামেনিদের পাসের প্রবাহ বন্ধ করতে সরু করে এনেছে ফাঁকা জায়গাগুলো। রদ্রি, পাউ কুবারসি, মার্ক কুকুরেয়ারা চাপ তৈরি তারপর কেড়েছেন বল। এ কারণে বেশির ভাগ সময়ই মাঝমাঠ থেকে পাস না পেয়ে হাঁসফাঁস করতে হয় কিলিয়ান এমবাপ্পে–উসমান দেম্বেলেদের।

স্পেনের ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের দুই প্রাণভোমরা—রদ্রি ও পাউ কুবারসি
এএফপি

অথচ সেমিফাইনালের আগেও প্রশ্ন ছিল, ফ্রান্সের এই আক্রমণভাগকে ঠেকাবে কে? কারণ শেষ চারে ওঠার আগপর্যন্ত ফরাসি আক্রমণের জবাব ছিল না কারও কাছে। স্প্যানিশ ফুটবল বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিক গিলেম বালাগ জানিয়েছেন, এ ম্যাচটি জয়ের প্রস্তুতি বহু আগেই নিয়ে রেখেছিল স্পেন। তাঁর ভাষায়, ওইয়ারসাবাল, রদ্রি, ওলমোদের নিয়ে ১০ বছর আগেই এই অভিযাত্রা শুরু করেছিলেন স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। তিনি কোচ থাকতে অনূর্ধ্ব–১৯ ও অনূর্ধ্ব–২১ ইউরো জিতেছেন সিমন–রদ্রিরা। বোঝাপড়াটা তখন থেকেই।  

বালাগের ভাষায়, সেই বোঝাপড়ার ফসল হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে দেখা গেল ‘অনবদ্য দলীয় পারফরম্যান্স। ম্যাচের সবকিছুই ছিল পুরোপুরি তাদের নিয়ন্ত্রণে। ফুটবল শেখার প্রতিটি একাডেমিতেই এটি উদাহরণ হিসেবে দেখানো উচিত।’

সেই উদাহরণে ফ্রান্স কোথায় থাকবে? অবশ্যই পরাজিত দলের কাতারে। কিন্তু স্প্যানিশ মাঝমাঠ ও রক্ষণ অ্যানাকোন্ডার এমন পেঁচিয়ে ধরার জবাব কি ছিল না দিদিয়ের দেশমের দলের কাছে? টুর্নামেন্টজুড়ে যেকোনো রক্ষণের বিপক্ষে তারাই তো ত্রাসের সঞ্চার করেছে সবচেয়ে বেশি। ৮ গোল করা কিলিয়ান এমবাপ্পের ভূমিকা তাতে সর্বাগ্রে। স্পেনের এই কৌশলের জালে ফ্রান্স কীভাবে ফেঁসেছে, সেটা বলেছেন এমবাপ্পে।

ফাইনালে ওঠার পর স্পেনের খেলোয়াড়দের উদ্‌যাপন
এএফপি

ফরাসি সম্প্রচারক ‘এম৬’কে এমবাপ্পে বলেন, ‘কৌশলগত কিংবা সামগ্রিক পারফরম্যান্স—কোনো দিক থেকেই আমরা ম্যাচটি যেভাবে খেলতে চেয়েছিলাম, সেভাবে পারিনি। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মতো ম্যাচে যা করা উচিত, তা যদি করতে না পারেন, তবে জেতা অসম্ভব। আমাদের লক্ষ্য ছিল একদম ওপর থেকে চাপ সৃষ্টি করা, যাতে ওরা ধীরগতির ও নিয়ন্ত্রিত ছন্দে ম্যাচ গুছিয়ে নিতে না পারে। কারণ, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় ওরা আমাদের চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু আমরা সেই পরিকল্পনা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছি।’

আরও পড়ুন

ফ্রান্স কেন ব্যর্থ হয়েছে সেটা, কেন অ্যানাকোন্ডার মতো পেঁচিয়ে ধরা রক্ষণের জাল ছিঁড়তে পারেনি সেটা বোঝা যায় বালাগের কথায়, ‘ম্যাচটি কীভাবে জিততে হবে, স্পেন তা আগেই ঠিক করে রেখেছিল। তারা ভেবেছে, ‘‘আমাদের শক্তির জায়গা কোনগুলো?’’ বল পজিশন ধরে রাখা, ম্যাচের পরিস্থিতি বোঝা এবং টেকনিক্যালি দারুণ দক্ষ হওয়া। এরপর তারা এমন কোচদের দায়িত্ব দেয়, যাঁরা এই দর্শনটা বোঝেন ও ফুটিয়ে তুলতে পারেন। আর খেলোয়াড়দেরও বেছে নেওয়া হয় ঠিক সেই ছাঁচে।’

এমবাপ্পেকে এভাবেই কড়া মার্কিংয়ে রেখেছিল স্প্যানিশ রক্ষণ ও মাঝমাঠ। রদ্রি (১৬ নম্বর জার্সি) এর পুরোধা
এএফপি

রদ্রি, ওলমো এবং রুইজরা সেই ছাঁচে কতটা ভালোভাবে মানিয়ে নিতে পেরেছেন, সেটা একটু অন্যভাবে বুঝিয়ে দেন এমবাপ্পে। ফরাসি মিডফিল্ডে চুয়ামেনি ও আদ্রিয়ান রাঁবিও বারবার রদ্রি–ওলমোদের সামনে অসহায় হয়ে পড়েছেন। এমবাপ্পের ভাষায়, ‘মাঝমাঠে আমরা বারবার দুজনের বিপরীতে তিনজন হয়ে পড়েছি। স্পেনের মতো দলের বিপক্ষে এটা অনেক বড় সমস্যা...সব মিলিয়ে তাই এমন পরাজয়। এটি অত্যন্ত হতাশাজনক।’

এমবাপ্পের জন্য এই হার হতাশার হলেও স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের জন্য ভীষণ আনন্দের। একটি দর্শনকে পুঁজি করে শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত জায়গায় স্বপ্নটা পূরণ করতে পেরেছেন দে লা ফুয়েন্তে। ম্যাচ শেষে বলেন, ‘প্রায় চার বছর আগে আমরা একটি দর্শন নিয়ে পথচলা শুরু করে সেই দর্শনে অবিচল ছিলাম এবং সেটিই আমাদের এখানে নিয়ে এসেছে।’

সেমিফাইনালে হারের পর বিমর্ষ এমবাপ্পে। পেছনে তাঁর সতীর্থরাও বিমর্ষ
এএফপি

খেলোয়াড়দের প্রশংসা করে দে লা ফুয়েন্তে বলেন, ‘মনে হচ্ছে আমরা অজেয়। ওরা (খেলোয়াড়) বিশ্বের সেরা দলের মুখোমুখি হয়েছিল। এই খেলোয়াড়দের সবকিছু প্রাপ্য। দিনের পর দিন তারা একাগ্রতা, উদারতা, সংহতি ও অসাধারণ প্রতিভা প্রমাণ রেখে চলছে।’

সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ২–০ গোলে হারিয়ে ফাইনালে ওঠা স্পেনের সামনে এখন প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা অথবা ইংল্যান্ড। নিউ জার্সিতে আগামী রোববার রাতে অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বকাপের ফাইনাল।

আরও পড়ুন