ভিনিসিয়ুসকে ‘পাঁচবার বানর’ বলার অভিযোগ আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে
চ্যাম্পিয়নস লিগ প্লে-অফে গতকাল রাতে প্রথম লেগে বেনফিকার মাঠে ১–০ গোলে জেতে রিয়াল মাদ্রিদ। গোলটি করেন রিয়াল তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। কিন্তু ম্যাচের ৫০ মিনিটে করা ভিনির গোলের উদ্যাপনকে ঘিরে ঘটেছে তুলকালাম কাণ্ড।
গোল উদ্যাপনের সময় কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে বেনফিকার আর্জেন্টাইন উইঙ্গার জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ান্নির সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা হয় ভিনিসিয়ুসের। এতে রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়েরের কাছে বর্ণবাদের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন রিয়ালের এই ব্রাজিলীয় তারকা। এরপর বর্ণবাদবিরোধী নিয়ম প্রয়োগে খেলা ১০ মিনিটের বেশি সময় বন্ধ রাখেন রেফারি। পরে রিয়ালের মিডফিল্ডার অঁরেলিয়ে চুয়ামেনি জানান, ভিনি তাঁর সতীর্থদের বলেছেন প্রেস্তিয়ান্নি তাঁকে ‘বানর’ বলেছেন।
টিভি ফুটেজে দেখা যায়, প্রেস্তিয়ান্নি নিজের জার্সি দিয়ে মুখ ঢেকে ভিনিসিয়ুসের সঙ্গে কথা বলছেন। এরপর ব্রাজিলিয়ান তারকা আঙুল তুলে তাঁকে দেখিয়ে রেফারির কাছে ছুটে যান। রেফারি লেতেক্সিয়ের দুই হাত বুকের সামনে ক্রস করে ‘বর্ণবাদী আচরণের অভিযোগ’ জানানোর সংকেত দেন। এর আগেও বিভিন্ন সময় বর্ণবাদী আক্রমণের মুখে পড়েছিলেন ভিনি।
গতকাল রাতের ম্যাচের পর ইনস্টাগ্রামে ভিনিসিয়ুস লেখেন, ‘বর্ণবাদীরা কাপুরুষ। তারা নিজেদের দুর্বলতা ঢাকতেই মুখে জার্সি তুলে কথা বলে।’
অন্যদিকে ম্যাচের প্রায় চার ঘণ্টা পর ইনস্টাগ্রামে দেওয়া পোস্টে প্রেস্তিয়ান্নি বর্ণবাদের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি স্পষ্ট করতে চাই, কোনো সময়ই ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে বর্ণবাদী মন্তব্য করিনি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সে কথাটি ভুল বুঝেছে। আমি কখনো কারও প্রতি বর্ণবাদী ছিলাম না।’
ঘটনার পর বিচলিত ভিনিসিয়ুস কথা বলেন রিয়ালের কোচ আলভারো আরবেলোয়া, বেনফিকার কোচ জোসে মরিনিও ও সতীর্থদের সঙ্গে। রিয়াল কোচ আলভারো আরবেলোয়া পরে জানান, ভিনিসিয়ুস চাইলে দল মাঠ ছাড়তেও প্রস্তুত ছিল। তবে আলোচনার পর তারা খেলা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
ম্যাচ–পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে রিয়াল কোচ আরবেলোয়া বলেন, ‘বর্ণবাদের ব্যাপারে শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) দেখাতে হবে। ২০২৬ সালে এসে মাঠে এমন ঘটনা ঘটতে পারে না। আমি ভিনিকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, সে খেলা চালিয়ে যেতে চায় কি না। তাকে বলেছি, আমরা তার পাশে আছি। সব সময়ই থাকব।’
আরবেলোয়া আরও বলেন, ‘রেফারি আমাকে বলেছেন, তিনি কিছু শোনেননি, তাই এ পরিস্থিতিতে কিছু করতে পারছেন না। ভিনি যা–ই বলত, আমরা তার সঙ্গেই থাকতাম। এ বিষয়ে শূন্য সহনশীলতা বজায় রাখতে হবে।’
গোল করার পর কর্নার ফ্ল্যাগের পাশে নেচে উদ্যাপন করেন ভিনিসিয়ুস। এরপর বেনফিকার কয়েকজন খেলোয়াড় তাঁকে ঘিরে ধরেন। এ ঘটনার পর তাঁকে হলুদ কার্ডও দেখানো হয়। ইনস্টাগ্রামে ভিনিসিয়ুস লেখেন, ‘গোল উদ্যাপনের জন্য আমাকে হলুদ কার্ড দেওয়া হয়েছে, এখনো বুঝতে পারছি না কেন। আর যে প্রটোকল আছে, সেটাও ঠিকভাবে প্রয়োগ হয়নি—কোনো কাজেই আসেনি।’
ম্যাচ শেষে মিক্সড জোনে কথা বলতে গিয়ে কিলিয়ান এমবাপ্পে দাবি করেন, প্রেস্তিয়ান্নি একাধিকবার ভিনিসিয়ুসকে বর্ণবাদী মন্তব্য করেছেন। এমবাপ্পের ভাষায়, ‘বেনফিকার ২৫ নম্বর (প্রেস্তিয়ান্নি)...আমি তার নাম উচ্চারণ করতে চাই না। কারণ, সে এর যোগ্য নয়...সে বাজে কথা বলেছে। এটা অগ্রহণযোগ্য। সে জার্সি মুখে নিয়ে ভিনিকে পাঁচবার বানর বলেছে। বেনফিকার খেলোয়াড়েরাও এটা শুনেছে।’
রিয়ালের ডিফেন্ডার ট্রেন্ট আলেক্সান্ডার-আরনল্ড সিবিএসকে বলেন, ‘পুরো রাতটাই নষ্ট হয়ে গেছে। এটা খেলাধুলার জন্য লজ্জাজনক; সমাজের জন্যও লজ্জার। এর কোনো জায়গা নেই। তবে এমন ঘটনা ঘটলে আমাদের আজ যেভাবে মোকাবিলা করেছি, সেভাবেই সামলাতে হবে। দল, ক্লাব ও স্কোয়াড—সবাই যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তাতে আমি খুবই গর্বিত।’
রিয়ালের মিডফিল্ডার ফেদেরিকো ভালভের্দে বলেন, ‘যারা কাছাকাছি ছিল, সেসব সতীর্থদের কাছ থেকে শুনেছি খুবই বাজে কিছু বলা হয়েছিল। এত ক্যামেরা থাকার পরও সেটা রেকর্ড না হওয়া দুঃখজনক।’
চুয়ামেনি মুভিস্টারকে বলেন, ‘এটা হতে পারে না। ভিনি আমাদের বলেছে, তাকে “বানর” বলা হয়েছে…ভিনি নিজেই বলেছিল, আমাদের খেলা চালিয়ে যেতে হবে। আমি বলেছিলাম, সমস্যা হলে আমরা দল হিসেবে মাঠ ছাড়ব। কিন্তু আমরা কথা বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, জিততেই হবে।’
তবে ভিন্ন কথা বলেছেন বেনফিকার মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো বারেইরো বলেন, ‘আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। সে বলেছে, ম্যাচের মধ্যে খেলোয়াড়দের স্বাভাবিক উসকানিই ছিল। বর্ণবাদী কিছু নয়।’
এদিকে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ফেডারেশন (সিবিএফ) এক বিবৃতিতে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের পাশে দাঁড়িয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘লিসবনে বেনফিকার বিপক্ষে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে গোল করার পর আবারও বর্ণবাদের শিকার হওয়া ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের প্রতি সংহতি জানাচ্ছে সিবিএফ। বর্ণবাদ একটি অপরাধ। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ফুটবলে বা অন্য কোথাও এর স্থান নেই। ভিনি, তুমি একা নও। প্রটোকল সক্রিয় করে তুমি সাহস ও মর্যাদার উদাহরণ স্থাপন করেছ। আমরা তোমাকে নিয়ে গর্বিত। সব ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমরা অটল থাকব। আমরা তোমার পাশে আছি—সব সময়।’
ম্যাচ–পরবর্তী সাক্ষাৎকারে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের ঘটনা নিয়ে কথা বলেছেন বেনফিকা কোচ জোসে মরিনিও। অ্যামাজন প্রাইমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মরিনিও বলেন, ‘কিছু একটা তো ভুল আছেই, কারণ ভিনিসিয়ুস যেখানে খেলতে যায়, প্রায় প্রতিটি স্টেডিয়ামেই কিছু না কিছু ঘটনা ঘটে। আমি বলছি, প্রথম ৫০ মিনিট দারুণ ফুটবল হয়েছে। সারা বিশ্বের লাখো মানুষ দেখেছে। এরপর একটা অবিশ্বাস্য গোল, তারপর যেন ম্যাচটাই শেষ। আমি দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় দেখেছি। আমি নিরপেক্ষ থাকতে চাই, তাই এ নিয়ে মন্তব্য করতে চাই না। ভিনিসিয়ুসকেও সেটাই বলেছি।’
মরিনিও আরও বলেন, ‘আমি তাকে বলেছি, এমন গোল করলে উদ্যাপন করবে, তারপর নিজের জায়গায় ফিরে যাবে। যখন সে বর্ণবাদের প্রসঙ্গ তুলছিল, তখন আমি তাকে বলেছি—এই ক্লাবের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিত্ব ইউসেবিও ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ। এই ক্লাবকে বর্ণবাদী বলা একেবারেই ঠিক হবে না। ভিনিসিয়ুস ও জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ান্নি আমাকে ভিন্ন ভিন্ন কথা বলেছে। কিন্তু আমি কারও পক্ষ নিচ্ছি না, নিরপেক্ষ থাকতেই চাই।’
মরিনিও আক্ষেপ করে বলেন, ‘এ ধরনের প্রতিভাবান খেলোয়াড়েরা অসাধারণ কিছু করতে পারে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সে শুধু দুর্দান্ত গোল করেই সন্তুষ্ট থাকেনি। এমন গোল করলে সম্মানজনকভাবেই উদ্যাপন করা উচিত।’
২৫ ফেব্রুয়ারি প্লে-অফের দ্বিতীয় লেগে মাদ্রিদের মাঠে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে মুখোমুখি হবে দুই দল।