৩৯ বছর বয়সী মেসি বিশ্বকাপে কেমন করবেন
আরও একটি বিশ্বকাপে লিওনেল মেসি। ২০২৬ বিশ্বকাপ চলাকালে তাঁর বয়স হবে ৩৯। কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পরই আন্তর্জাতিক ফুটবল ছাড়তে পারতেন। গুঞ্জনও ছিল তেমনই। তবে ওসব কথার এখন আর মূল্য নেই।
বাস্তবতা হচ্ছে, উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপের মঞ্চেও তিনিই আর্জেন্টিনার প্রধান কান্ডারি। শিরোপা ধরে রাখার মিশন এখন মেসির কাঁধে।
মেসির থাকাটা আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কোলোনির জন্য বড় এক স্বস্তি। সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলারের বিকল্প খোঁজার কোনো তাগিদ অন্তত এই মুহূর্তে স্কালোনির নেই।
গত সেপ্টেম্বরে ফ্ল্যাশস্কোরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্কালোনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ‘মেসির কোনো বিকল্প হতে পারে না। তেমন কেউ আসবেও না। নিশ্চিতভাবেই মেসির কোনো উত্তরসূরি তৈরি হবে না।’
২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ শেষে অবশ্য অনেকেই মেসির শেষ দেখেছিলেন। এমন ইঙ্গিত দেন মেসিও। ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে জোড়া গোল করে দলকে বিশ্বকাপ জেতানোর পর মেসি বলেছিলেন, ‘ট্রফি জিতেই ক্যারিয়ার শেষ করতে চেয়েছিলাম। এর চেয়ে বেশি কিছু আর চাওয়ার নেই।’
তাঁর এই কথাতে তখন অবসরের স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল। তবে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে আরও কিছুদিন খেলার লোভ সামলাতে পারেননি। সেই লোভই মেসিকে নিয়ে এসেছে রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপের সামনে।
তবে দুশ্চিন্তার জায়গাও আছে। কাতার বিশ্বকাপের মেসি আর এই মেসির মধ্যে অবশ্য পার্থক্য আছে। ২০২২ বিশ্বকাপের পরের বছর পিএসজিতে কাটানো হতাশার দুই মৌসুম শেষে ইউরোপ ছাড়েন মেসি। ফলে আগের সেই ধার যে কিছুটা কমেছে, তা বলাই বাহুল্য।
এখন আর শীর্ষ স্তরের ফুটবলে দেখা যায় না তাঁকে। এমনকি ২০২০ সালের পর উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের নকআউট পর্বে মেসি কোনো জয়ের স্বাদও পাননি।
তবে মেজর লিগ সকারে (এমএলএস) ইন্টার মায়ামির হয়ে দুর্দান্ত ফর্মে আছেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। গত বছর ক্লাবটিকে এমএলএস কাপ জেতানোর পর ২০২৬ মৌসুমে ১৬ ম্যাচে ইতিমধ্যেই ১৩টি গোল করেছেন তিনি। সম্প্রতি ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের বিপক্ষে হ্যামস্ট্রিংয়ের সামান্য চোটের কারণে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে। তবে সেটি গুরুতর কিছু নয়।
কাতার বিশ্বকাপের পর যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ২০২৪ কোপা আমেরিকায় আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দিয়ে শিরোপা জিতিয়েছেন মেসি। দক্ষিণ আমেরিকান অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বেও তিনি ছিলেন সর্বোচ্চ গোলদাতা। খেলাটা যে এখনো ভালোবাসেন, তা সম্প্রতি তাঁর এক কথাতেও বোঝা গেছে, ‘আমি ফুটবল খেলতে ভালোবাসি এবং যত দিন পারব, এটা চালিয়ে যাব।’
মেসির বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের শুরুটা হয়েছিল ২০০৬ সালে। তাঁর হাত ধরেই ২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছিল আর্জেন্টিনা, যেখানে অতিরিক্ত সময়ের গোলে জার্মানির কাছে হারতে হয়েছিল তাদের।
আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সর্বোচ্চ এই গোলদাতা দেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ডও নিজের করে রেখেছেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ২০০ ম্যাচের মাইলফলক স্পর্শ করা থেকে আর মাত্র দুই ম্যাচ দূরে আছেন তিনি। বিশ্বকাপের মূল পর্ব শুরুর আগে টেক্সাসে হন্ডুরাস এবং আলাবামায় আইসল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ রয়েছে আর্জেন্টিনার। ফলে মূল আসর শুরুর আগেই মেসি ২০০ ম্যাচের মাইলফলকে পৌঁছে যেতে পারেন।
গ্রুপ ‘জে’–তে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া ও জর্ডান। ক্যানসাস সিটিতে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরুর পর বাকি দুই ম্যাচ হবে টেক্সাসের আর্লিংটনে। এর মধ্যে জর্ডানের বিপক্ষে ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে মেসির ৩৯তম জন্মদিনের ঠিক তিন দিন পর।
গত বিশ্বকাপে গুঞ্জন থাকলেও হয়নি, তবে এটাই যে মেসির শেষ বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে, সেটা নিশ্চিতই বলা যায়। মেসির সতীর্থ হুলিয়ান আলভারেজও বিষয়টা মাথায় রাখছেন। ফিফা ডটকমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘লিওর (মেসি) বয়স বিবেচনায় এটিই যে তাঁর শেষ বিশ্বকাপ হতে পারে, তা আমরা সবাই ভালো করেই জানি। তবে শেষ সিদ্ধান্তটি একান্তই তাঁর। এটি নিশ্চিতভাবেই এক বিশেষ বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে। শুধু আমাদের বা আর্জেন্টিনার মানুষের জন্যই নয়, বিশ্বজুড়ে যারা তাঁকে অনুসরণ করে, তাদের সবার জন্যই এটি আবেগের বিষয়। কারণ, তিনি সর্বকালের সেরা এবং বিশ্ব ফুটবলে তাঁর প্রভাব অতুলনীয়।’
তবে ২৬ বছর বয়সী আতলেতিকো মাদ্রিদ ফরোয়ার্ড আলভারেজের উপস্থিতি প্রমাণ করে, বয়স বেড়ে যাওয়া মেসির ওপর আর্জেন্টিনা এখন আর পুরোপুরি নির্ভরশীল নয়।
দলে আলভারেজের মতো বিশ্বমানের তারকা ছাড়াও আছেন সিরি আ’র সর্বোচ্চ গোলদাতা লাওতারো মার্তিনেস, নিকো পাজ, এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, ক্রিস্টিয়ান রোমেরো এবং গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেস। এমনকি বাছাইপর্বে ব্রাজিলের বিপক্ষে তাদেরই মাঠে ৪-১ গোলের ঐতিহাসিক জয়টি আর্জেন্টিনা পেয়েছিল মেসিকে ছাড়াই।
দলের আত্মবিশ্বাস নিয়ে আলভারেজ যোগ করেন, ‘আর্জেন্টাইন হিসেবে আমাদের স্বপ্ন ও উত্তেজনা সব সময় একই থাকে। আমরা সব সময়ই চ্যাম্পিয়ন হতে চাই। এবারও তার ব্যতিক্রম হওয়ার কোনো কারণ নেই।’