মেসি-রোনালদো-নেইমার: বিশ্বকাপ খেলার সম্ভাবনা কার কেমন

প্রথম আলো গ্রাফিকস

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আগে পোস্টটি করেছিলেন এক ফুটবলপ্রেমী।তিনজনের ছবিসহ সে পোস্টের ক্যাপশন ছিল ‘দ্য থ্রি স্টুজেস’—অর্থাৎ তিন ‘জোকার’।

কেন এ তকমা—সেটার ব্যাখ্যাও ছিল বেশ মজার। দেড় দশক ধরে ফুটবলে তারকা ইমেজে তাঁদের ধারেকাছে কেউ নেই। মাঠে প্রতিভার ছটায় প্রতিপক্ষকে যেভাবে বোকা বানিয়ে দর্শকদের তাঁরা মজা দেন, সে বিচারে তো তাঁরা তিনজন ‘জোকার’ই।

১৯২২ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত সারা দুনিয়াকে আনন্দে ভাসানো কমেডি শো ‘দ্য থ্রি স্টুজেস’ যেমন দীর্ঘ মেয়াদে চলেছে—তাঁদের তিনজনের ক্যারিয়ারও তেমনই লম্বা। আর সাফল্যে সেই কমেডি শোর মতো তাঁরাও ঐতিহাসিক। নাম বলে দিলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার—লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও নেইমার।

২০২৬ বিশ্বকাপে ফুটবল সামনে রেখে এই ত্রয়ী ‘জোকার’ কিংবা কিংবদন্তি তিন রকম পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। অন্যভাবে বললে, তাঁরা যতটা যাচ্ছেন, ভক্তদের ভাবনা তার চেয়ে আরও বেশি। সেই ভাবনা খুলে বলার আগে একটি প্রশ্ন করা যাক—২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় তারকা কারা?

খেলবেন কি না খেলবেন, কিংবা দলে ঠাঁই পাবেন কি না—এসব ভাবনাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে এক লহমায় বলা যায়—নেইমার, রোনালদো ও মেসি। অর্থাৎ বিশ্বকাপে আসলে এই তিন কিংবদন্তিকে দেখার অপেক্ষায় সবাই। এই আগ্রহের পেছনে একটি কারণ সম্ভবত—তিনজনের জন্যই এট শেষ বিশ্বকাপ। ৩৮ বছরের মেসি, ৩৪ বছরের নেইমার এবং ৪১ বছর বয়সী রোনালদো আগেই এই সীমারেখাটা টেনে দিয়েছেন।

সম্ভাব্য এই শেষ বিশ্বকাপে পা রাখার আগে তিন কিংবদন্তি দাঁড়িয়ে তিন রকম পরিস্থিতিতে। অল্প কথায় তা বর্ণনা করলে যেমন দাঁড়ায়—

ইন্টার মায়ামির জার্সিতে লিওনেল মেসি
এএফপি

মেসি: গোটা দুনিয়া মেসিকে বিশ্বকাপে দেখতে চায়। কিন্তু বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র দুই মাস আগেও কেউ জানে না ২০২৬ বিশ্বকাপে মেসি খেলবেন কি না! ভদ্রলোক নিজে হয়তো জানেন কী করবেন, কিন্তু কাউকে এখনো কিছু বলেননি।

রোনালদো: গোটা দুনিয়া রোনালদোকেও ২০২৬ বিশ্বকাপে দেখতে চায়। পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেজও চান আর রোনালদো যে খেলতে চান সেটা না বললেও চলে। ঝামেলা হলো, কিছুদিন আগে হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি কাটিয়ে মাঠে ফেরা রোনালদোর ফিটনেস ও চোটে পড়ার শঙ্কা আছে।

নেইমার: ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলতে তিনি নিজে মরিয়া। কিন্তু ফিটনেস সমস্যায় ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি তাঁকে কোনো নিশ্চয়তা দেননি এখনো। নেইমারকে বিশ্বকাপে খেলানো উচিত কি না—তা নিয়ে কিছুদিন আগে ব্রাজিলের এক সংবাদমাধ্যমের জরিপে স্বয়ং ব্রাজিলেই বিভক্তিটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অর্থাৎ এই তিন তারকার মধ্যে কারও বিশ্বকাপে খেলাই এখনো নিশ্চিত নয়। হ্যাঁ, খেলার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। তবে চূড়ান্ত স্কোয়াড ঘোষণার আগে যেমন কোনো কিছু নিশ্চিত নয়, তেমনি বর্তমান পরিস্থিতিও তাঁদের সে জোরাল সম্ভাবনায় বেশ কিছু ছোটখাটো প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ধরে নেওয়া যাক, শেষ পর্যন্ত কাউকে বিশ্বকাপে দেখা গেল না! তখন? কী আর করা, দীর্ঘ দেড় দশকজুড়ে ফুটবল বিশ্বে আধিপত্য এবং জনপ্রিয়তার শীর্ষবিন্দুতে ওঠা তিন তারকাকে না দেখার হতাশায় পুড়তে হবে।

কিন্তু ফুটবলের সবচেয়ে নৈরাশ্যবাদী সমর্থকও সম্ভবত এমন কিছুর শঙ্কার নেই। কারণ, মেসি চাইলে এবং রোনালদো ও নেইমার ফিট থাকলে—তাঁদের ছাড়াই বিশ্বকাপে যাওয়ার মতো বোকা কোচ পৃথিবীতে সম্ভবত নেই।

তাই আশার কথাই বলা যাক এবং সেটা শুরু হোক সর্বশেষ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন মেসিকে দিয়ে।

আল নাসরের হয়ে ভালোই ফর্মে আছেন রোনালদো
রয়টার্স

মেসি: সিদ্ধান্ত তাঁর, অপেক্ষায় বিশ্ব

মুখ ফুটে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। প্রায় দেড়–দুই বছর ধরেই বলছেন, ২০২৬ বিশ্বকাপ সামনে রেখে প্রতিটি দিন ধরে ধরে এগোতে চান। শরীর সায় দিলে খেলবেন ২০২৬ বিশ্বকাপে। আগামী জুনে মেসি পা দেবেন ৩৯ বছরে। চার বছর আগের সেই মেসি আর এ মেসির মধ্যে বয়স যে কিছুটা পার্থক্য টেনে দিয়েছে, তা তো বলাই যায়। কিন্তু লোকটির নাম মেসি বলেই আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি এসব কিছুই ভাবছেন না। তিনি মেসির সবুজ সংকেত পাওয়ার অপেক্ষায়—সিদ্ধান্তটি ‘সম্পূর্ণ মেসির ওপর নির্ভর করছে’। অর্থাৎ ফিটনেস, পারফরম্যান্স আসলে কিছু না। মেসি চান কি না খেলতে—সেটাই স্কালোনির কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মেসি খেলতে চান কি না, সেটা বোঝা যায় গত বছর ও চলতি বছরে তাঁর পারফরম্যান্স দেখে। গত বছর দেশ ও ক্লাবের হয়ে মোট ৫৪ ম্যাচে করেন ৪৬ গোল, গোল বানান ২৮টি। এ বছর এখন পর্যন্ত ১০ ম্যাচে করেছেন ৭ গোল। এর মধ্যে ইন্টার মায়ামির হয়ে খেলেছেন সম্ভাব্য ৯ ম্যাচের মধ্যে ৮ ম্যাচ। বিশ্বকাপে খেলার বিষয়টি মাথায় না রাখলে ক্লাবের হয়ে নিয়মিত কি খেলতেন মেসি? তাঁর তো ক্যারিয়ারে আর কিছুই পাওয়ার নেই। তাহলে নিয়মিত খেলার অর্থ তো একটাই, ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলতে নিজের ধারটা ধরে রাখা। এখন শুধুই তাঁর মুখ ফুটে সেই ইচ্ছাটা বলার অপেক্ষা।

রোনালদো: ইচ্ছা আছে, প্রশ্ন ফিটনেসে

গত বছরের নভেম্বরেই জানিয়েছেন, আর ‘এক–দুই বছর’ হয়তো ফুটবল খেলবেন। অর্থাৎ ২০২৬ বিশ্বকাপই হতে তাঁর শেষ বিশ্বকাপ। পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেজও রোনালদোকে বিশ্বকাপে পাওয়ার আগ্রহ জানিয়েছেন একাধিকবার। এ পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। একটু শঙ্কার মেঘ জমে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি রোনালদোর আল নাসরের হয়ে খেলার সময় হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পাওয়ার পর। ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে তখন একাধিক ম্যাচে খেলতে পারেননি। আল নাসর কোচ জর্জ জেসুস সে সময় জানিয়েছিলেন, রোনালদোর চোট যেমন ভাবা হয়েছিল তার চেয়েও ‘মারাত্মক’। সেই চোট কাটিয়ে কিংবদন্তি মাঠে ফিরে গতকাল আল নাসরের হয়ে গোলও করেছেন। তবু এই বয়সে ফিটনেস নিয়ে একটা শঙ্কার জায়গা তো থাকেই। মার্তিনেজ যদিও বলে রেখেছেন, বিশ্বকাপে ‘সেন্টার ফরোয়ার্ড পজিশন রোনালদো ও গনসালো রামোসের’।

সান্তোস ফরোয়ার্ড নেইমার
নেইমারের ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডল

নেইমার: ইচ্ছা প্রবল, কিন্তু পথ কঠিন

২০২৬ বিশ্বকাপ নিয়ে ব্রাজিলের এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—নেইমারকে কি দেখা যাবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর আসরে? আনচেলত্তি ব্রাজিল কোচের দায়িত্ব নেওয়ার পর এখনো জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পাননি নেইমার। চোটের কারণে দুই বছরের বেশি সময় ধরে তিনি ব্রাজিল দলের বাইরে। আনচেলত্তি বারবার বলেছেন, জাতীয় দলে ফিরতে নেইমারকে আগে পূর্ণ ফিটনেস ফিরে পেতে হবে। এদিকে গতকাল সান্তোসের হয়ে ব্রাজিলিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে মাঠে ফিরে ভালো খেলেন নেইমার। ক্লাবটির কোচ কুকার ভাষায়, ‘নেইমার ম্যাচের পর ম্যাচ উন্নতি করছে।’

ব্রাজিলের কোচ আনচেলত্তি ফরাসি সংবাদমাধ্যম ‘লেকিপ’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘হাঁটুর চোট কাটিয়ে নেইমার ভালোভাবে ফিরে এসেছে, গোল করেছে। নিজের অবস্থার উন্নতি ঘটাতে তাকে অবশ্যই এভাবে খেলা চালিয়ে যেতে হবে। সে সঠিক পথেই আছে।’

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় আগামী ১১ জুন শুরু হবে বিশ্বকাপ। শেষ পর্যন্ত এ তিন কিংবদন্তিকে একসঙ্গে বিশ্বকাপে দেখা যাবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে পরিস্থিতি অনুযায়ী, রোনালদোকে বিশ্বকাপে দেখার ব্যাপারটি আপাতত বাকি দুজনের চেয়ে বেশি নিশ্চিত। মেসির ক্ষেত্রে শুধু মুখ ফুটে বলার অপেক্ষা। আর নেইমারের অপেক্ষা পূর্ণ ফিটনেসে ফেরার।

দেখা যাক, কী ঘটে।