বিশ্বকাপে ‘গোয়েন্দাগিরি’: নজরদারি যেখানে কৌশলের অংশ

প্রতিপক্ষের ওপর নজর রাখাটা কৌশলেরই অংশএএফপি

ব্যোমকেশ, মাসুদ রানা থেকে জেমস বন্ড—সব গোয়েন্দা গল্পেই একটা চেনা প্লট থাকে। সময়ে সময়ে প্রতিপক্ষের ওপর  নজর রাখা। নজরদারি না থাকলে গল্পে যেন ঠিক রোমাঞ্চ জমে না। বিশ্বকাপের গল্পেও এই নজরদারি জড়িয়ে আছে পরতে পরতে। কারও কারও কাছে আবার ম্যাচের আগে প্রতিপক্ষের ওপর নজর রাখাটা কৌশলেরই অংশ।

উরুগুয়ের কোচ মার্সেলো বিয়েলসার জন্য তো এটা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। প্রতিপক্ষের মাঠে গোয়েন্দাগিরি করাকে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন অন্য উচ্চতায়। ইংলিশ ক্লাব লিডস ইউনাইটেডের কোচ থাকাকালীন তিনি প্রতিপক্ষের অনুশীলনে ড্রোন পাঠাতেন। প্রতিপক্ষের কৌশল জানতে না পারলে বিয়েলসার মনে হতো ম্যাচের প্রস্তুতিই অসমাপ্ত রয়ে গেছে।

অনেক কোচেরই পরিকল্পনা থাকে প্রতিপক্ষের ছক বুঝে নিজেদের কৌশল সাজানোর। তবে সব কৌশল তো আর ম্যাচের ভিডিও ফুটেজে পাওয়া যায় না। কিছু কৌশল থাকে অত্যন্ত গোপনীয়, কড়া নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা।

তাই প্রতিটি দলই অনুশীলনের একটা বড় অংশ সারে ক্লোজড-ডোর বা রুদ্ধদ্বার মাঠে, যেখানে মিডিয়া বা দর্শকদের প্রবেশাধিকার থাকে না। অনুশীলনের প্রথম ১০-১৫ মিনিট যখন খেলোয়াড়েরা গা গরম করেন, শুধু তখনই মিডিয়ার ক্যামেরা সচল রাখার অনুমতি থাকে। আসল কৌশল শুরু হয় ক্যামেরার নজর সরে যাওয়ার পর। খুঁটিনাটি কৌশল ঝালিয়ে নেওয়ার মোক্ষম সময় সেটাই।

সংবাদ সম্মেলনে পচেত্তিনো বলেছেন, ‘আমরা এখন গোয়েন্দাদের যুগে বসবাস করছি’
এএফপি

২০১৪ বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের টিম ক্রুলকে দিয়ে টাইব্রেকার ঠেকানোর প্রস্তুতি কিংবা ২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সেই বিখ্যাত ফ্রি-কিক রুটিন—কোচ লুই ফন হাল এসব কৌশল অনুশীলন করিয়েছিলেন কড়া নিরাপত্তার মধ্যেই। অনুশীলনে আসল ঘাম ঝরানো আর মাথা খাটানোর কাজটা তাই নিরাপত্তার আড়ালেই হয়।

ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, অন্য দলের ওপর নজরদারি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই মৌসুমেই প্রতিপক্ষের ওপর নজর রাখায় ইংলিশ চ্যাম্পিয়নশিপ প্লে-অফ থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে সাউদাম্পটনকে। এর আগে বিয়েলসার কাণ্ডের কারণে বড় অঙ্কের জরিমানা করা হয়েছিল লিডসকেও।

আরও পড়ুন

বিশ্বকাপে নজরদারি নিয়ে ফিফার অবস্থান আরও কঠোর। অনুশীলনের মাঠগুলোকে ‘নো ফ্লাই জোন’ ঘোষণা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের পক্ষ থেকে জেল-জরিমানার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছিল। বিশ্বকাপের মাঠের পাশে ড্রোন পাওয়া গেলে ১ লাখ ডলার জরিমানার পাশাপাশি ১ বছরের জেলের বিধান রাখা হয়েছে।

তবে জেল-জরিমানার ভয় দেখিয়ে কি আর গোয়েন্দাগিরি আটকানো যায়? অনেক অনুশীলন মাঠের আশপাশেই উঁচু ভবন থাকে। সেখান থেকে অনুশীলন দেখা খুব একটা কঠিন নয়।

এর আগে বিয়েলসার কাণ্ডের কারণে বড় অঙ্কের জরিমানা করা হয়েছিল লিডসকে
এএফপি

যেমন গত সপ্তাহে দক্ষিণ কোরিয়ার অনুশীলনের সময় মাঠের ওপর দিয়ে একটি ড্রোন উড়ে গিয়েছিল। টের পেয়েই সেটি ভূপাতিত করে মেক্সিকান সেনাবাহিনী। তবে সেই ড্রোনটি আসলে কোন দলের ছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের কোচ মরিসিও পচেত্তিনোও অনুশীলনের আগে ছিলেন ভীষণ সতর্ক। দলের অনুশীলনের আগে মাঠের পাশের পাহাড়ে উঠে তিনি নিজেই দেখে নিয়েছেন কেউ ওত পেতে আছে কি না। পরে সংবাদ সম্মেলনে এসে পচেত্তিনো বলেছেন, ‘আমরা এখন গোয়েন্দাদের যুগে বসবাস করছি। কেউ নজর রাখছে কি না, সরাসরি দেখে নিশ্চিত হওয়া ভালো।’

তবে মার্কিন মিডফিল্ডার টাইলার অ্যাডামসের মতে, নজরদারি কমবেশি সবাই করে। তিনি বলেছেন, ‘দিন শেষে সবাই কিছু না কিছু নজরদারি করে। কেউ একটু কম করে, কেউ একটু বেশি।’

দিন শেষে, ফুটবল দুনিয়ায় আসলে দুই ধরনের মানুষ আছে। হয় কেউ নজরদারি করছে, না হয় কেউ নজরদারিতে আছে। তবে সমীকরণ যেটাই হোক, মাঠের লড়াইয়ে কাজে না লাগাতে পারলে এই গোপন গোয়েন্দাগিরির মূল্য আসলে শূন্য।

আরও পড়ুন