দলের সঙ্গে চিলিতে গেলেন ঠিকই, একটি মিনিটের জন্যও মাঠে নামা হলো না। স্পেন গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়ার আগপর্যন্ত শুধু বেঞ্চই গরম করে গেছেন। এটা কি ডি স্টেফানোর প্রতি ভাগ্যের অবিচার নয়! বিশ্বকাপ না খেলতে পারা নিয়ে একবার তাঁকে প্রশ্ন করলে বাষট্টির সেই চোটের বিষয়টি টেনে হতাশামাখা উত্তর দিয়েছিলেন এভাবে, ‘সান সেবাস্তিয়ানে জার্মানির বিপক্ষে একটি গা-গরমের ম্যাচে পিঠে হালকা একটু চোট অনুভব করেছিলাম। হেলেনিও হেরেরা (সেই সময়ের স্পেনের কোচ) আমাদের কঠিন অনুশীলন করাতেন।

তিনি আর আমাকে বিশ্বকাপে খেলার জন্য ফিট মনে করলেন না। আক্ষরিক অর্থেই আমি তাঁর কাছে করজোড়ে ভিক্ষা চেয়েছিলাম, যেন আমাকে তিনি দলে রাখেন। বলেছিলাম, আমি ঠিক হয়ে যাব। কিন্তু তিনি তা শুনলেনই না!’

বিশ্বকাপের প্রতি ডি স্টেফানোর ভালোবাসা আর তা খেলতে না পেরে কতটা কষ্ট পেয়েছিলেন, সেটা তাঁর আক্ষেপভরা ওই কথা শুনেই বোঝা যায়। একটা ক্ষেত্রে অনেকের কাছেই ডি স্টেফানো আর বিশ্বকাপের বিয়োগান্ত ভালোবাসাকে রোমিও-জুলিয়েটের কাহিনি ছাপিয়ে মনে হতে পারে, ব্যাবিলনের যুগল পিরামাস ও থিসবের বিয়োগান্ত প্রেমের গল্পের মতো আরও করুণ! পিরামাস আর থিসবের প্রেমে ব্যর্থ হওয়ার পেছনে যেমন পারিবারিক কলহ ছিল, ডি স্টেফানোর বিশ্বকাপ-স্বপ্ন পূরণ না হওয়ার পেছনে দুর্ভাগ্যের সঙ্গে ছিল ফুটবল রাজনীতিও।

১৯৫০ সালেই ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে পারতেন ডি স্টেফানো, আর সেটা তাঁর জন্মভূমি আর্জেন্টিনার হয়েই। কিন্তু সেবার বাছাইপর্বে ড্রর পর আর্জেন্টিনা নিজেদের টুর্নামেন্ট থেকে সরিয়ে নিয়েছিল। ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ হয়েছিল ব্রাজিলে, দেশটির ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জের ধরেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আর্জেন্টিনা।

জন্মভূমি আর্জেন্টিনার হয়ে ডি স্টেফানোর অভিষেক ১৯৪৭ সালে, দক্ষিণ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপে। বলিভিয়ার বিপক্ষে ৭-০ গোলে জেতা সেই ম্যাচে একটি গোল পেয়েছিলেন ডি স্টেফানোও। সেই টুর্নামেন্টে আরও পাঁচটি ম্যাচ খেলেছেন, করেছেন আরও পাঁচ গোল।

আর্জেন্টিনার হয়ে সব মিলিয়ে এই ছয়টি ম্যাচই খেলেছেন ডি স্টেফানো। এরপর আসে ১৯৫৪ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের ক্ষণ, ডি স্টেফানোকে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিষিদ্ধ করে ফিফা। তাঁর অপরাধ? কলম্বিয়ান লিগে খেলতে যাওয়া ডি স্টেফানো লিগের বিরতির সময় কলম্বিয়া একাদশের হয়ে চারটি প্রীতি ম্যাচ খেলেছিলেন ১৯৫১ সালে। তবে দুঃখজনক ওই চারটি ম্যাচ কখনোই ফিফার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়নি! ডি স্টেফানোকে নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপও বর্জন করেছিল আর্জেন্টিনা।

কলম্বিয়ার ক্লাব মিলিওনারিওস থেকে ডি স্টেফানো স্পেনে পাড়ি জমান ১৯৫৩ সালে, নাম লেখান রিয়াল মাদ্রিদে। সেখানেই আন্তর্জাতিক ‘তৃতীয় জীবন’ শুরু তাঁর। রিয়ালে খেলার শুরু থেকেই স্প্যানিশ ফুটবলপ্রেমীদের ভালোবাসায় সিক্ত হতে থাকেন ডি স্টেফানো। সেই ভালোবাসা থেকেই স্পেনের হয়ে খেলা।

১৯৫৩ থেকে ১৯৬৪—রিয়ালের হয়ে খেলেছেন ১১ বছর। জিতেছেন আটটি লিগ ও পাঁচটি ইউরোপিয়ান কাপ। স্পেনের হয়ে খেলেছেন ১৯৫৭ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত। কিন্তু খেলা হয়নি বিশ্বকাপে!

১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে খেলেছেন স্পেনের হয়ে। কিন্তু হায়! ডি স্টেফানো, লাজলো কুবালা, জেনতাসমৃদ্ধ সেই স্পেনও বাছাইপর্বের বৈতরণি পার হয়ে যেতে পারেনি বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে।

স্কটল্যান্ড আর পুঁচকে সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে সহজ গ্রুপেই পড়েছিল স্পেন। কিন্তু সুইসদের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র দিয়ে অভিযান শুরু করা স্পেন স্কটিশদের কাছে হ্যাম্পডেন পার্কে হেরে যায় ৪-২ গোলে। ফিরতি লেগের দুটি ম্যাচই ৪-১ গোলে জিতেছিল স্পেন। কিন্তু নিজেদের শেষ ম্যাচে সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে স্পেনের বদলে বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয় স্কটল্যান্ড।

বাষট্টিতে ডি স্টেফানোর দুর্ভাগ্যের কথা তো সবার জানাই হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ আর ডি স্টেফানোর মিলন হলোই না। বিশ্বকাপটা আর্জেন্টিনা ও স্পেনের কিংবদন্তির কাছে বিরহের অপর নাম হয়েই রইল!

তেরঙা কুবালার দুর্ভাগ্য

ডি স্টেফানো আর লাজলো কুবালা—নাম দুটি যেন একই সূত্রে গাঁথা। ডি স্টেফানোর মতো তিনিও খেলেছেন তিনটি দেশের হয়ে—জন্মভূমি হাঙ্গেরি, চেকস্লোভাকিয়া ও স্পেন। কিন্তু বিশ্বকাপ–ভাগ্য ছিল না সর্বকালের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকারের। ডি স্টেফানোর মতো কুবালার ফুটবল ক্যারিয়ারও তিন দেশে বিস্তার হয়েছে রাজনীতির কারণে! ডি স্টেফানোর সঙ্গে একটাই অমিল ছিল কুবালার—সেটা ক্লাবে, ডি স্টেফানো খেলেছেন রিয়ালে আর কুবালা রিয়ালের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনায়।

বাধ্যতামূলক সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া এড়াতে হাঙ্গেরি থেকে ১৯৪৬ সালে ১৯ বছর বয়সে পালিয়ে যান চেকস্লোভাকিয়ায়। সেই দেশের হয়ে দুই বছর ফুটবল খেলেন কুবালা। ১৯৪৮ সালে আবার ফিরে আসেন জন্মভূমিতে। কিন্তু এক বছর পেরোতে না পেরোতেই হাঙ্গেরি চলে যায় কমিউনিস্টদের অধীনে। আবার পালাতে হয় তাঁকে।

একটি ট্রাকের পেছনে করে ১৯৪৯ সালে পালিয়ে কুবালা প্রথমে গিয়ে ওঠেন যুক্তরাষ্ট্রের একটি অঞ্চলে। সেখান থেকে নানা দেশ ঘুরে পাড়ি জমান স্পেনে। দেশটির হয়ে খেলেছেন ১৯৫৩ থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আবার যখন বিশ্বকাপ আয়োজনের তোড়জোড় চলছে, কুবালার কোনো জাতীয় দল নেই। ১৯৪৯ ও ’৫০ সালে কোনো দেশের হয়েই খেলেননি তিনি। আর ১৯৫৪ ও ১৯৫৮ বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব উতরাতে পারেনি তাঁর দল স্পেন।

ভাগ্যের কী পরিহাস! ১৯৬১ সালে কুবালা আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর পরের বছর ১৯৬২ বিশ্বকাপে খেলেছে তাঁর তিনটি জাতীয় দলই—চেকস্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি ও স্পেন!