ম্যারাডোনার মৃত্যু নিয়ে মামলা: চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ড চাইলেন আইনজীবীরা

ডিয়েগো ম্যারাডোনাএএফপি

আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনার মৃত্যুর সময় তাঁর চিকিৎসায় নিয়োজিত মেডিক্যাল টিমের সদস্যদের জন্য সর্বোচ্চ ১২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড চেয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। গতকাল বৃহস্পতিবার আদালতে যুক্তিতর্কে এ দাবি জানানো হয়।

মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের জেরে ’৮৬ বিশ্বকাপ কিংবদন্তির অস্ত্রোপচার করানো হয়। এরপর সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় থাকা অবস্থায় ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর মারা যান ম্যারাডোনা। তাঁর চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে গত এপ্রিল থেকে সাতজন চিকিৎসাকর্মীর বিচার চলছে।

অস্ত্রোপচারের দুই সপ্তাহ পর বুয়েনস এইরেসের শহরতলি তিগ্রেতে একটি ভাড়া বাসায় হৃদ্‌রোগ এবং অ্যাকিউট পালমোনারি এডেমাতে (ফুসফুসে তরল জমে যাওয়া) মারা যান ৬০ বছর বয়সী ম্যারাডোনা। দীর্ঘদিন মাদকাসক্তিতে ভুগেছেন সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার।

ম্যারাডোনার প্রধান চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মনস্তত্ত্ববিদ, নার্সসহ পুরো মেডিক্যাল টিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ—কিংবদন্তির মৃত্যুর আগের দিনগুলোয় তাঁরা চরম অবহেলাপূর্ণ চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। আসামিরা অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবি প্যাট্রিসিও ফেরাই (বাঁয়ে) ও কোসমে ইরিবারেন
এএফপি

চূড়ান্ত যুক্তিতর্কে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী প্যাট্রিসিও ফেরাই বলেন, আসামিদের ‘বিশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা’ অসুস্থ রোগীকে ‘সম্পূর্ণ সহায়হীন অবস্থায় ফেলে দিয়েছিল এবং তাঁর ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়েছিল’।

ফেরাই অভিযোগ করেন, আসামিরা ‘তাঁদের দায়িত্ব লঙ্ঘন করেছেন, চিকিৎসাবিদ্যার নিয়মের পরিপন্থী কাজ করেছেন’ এবং ‘যেসব পদক্ষেপ নেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল, তা বর্জন করেছেন’।

আসামিদের বিরুদ্ধে ‘ডোলো ইভেঞ্চুয়াল’ অভিযোগ আনা হয়েছে। আইনি এই পরিভাষার অর্থ হলো, কোনো ব্যক্তি নিজের কাজের পরিণতি সম্পর্কে জেনেও সেই কাজ করে যাওয়া।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা ম্যারাডোনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক লিওপোল্ড লুকের জন্য সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ড চেয়েছেন। এ ছাড়া মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, নার্স, সমন্বয়কসহ অন্য চিকিৎসাকর্মীদের জন্য ৪ থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ডের আবেদন করা হয়েছে।

স্বাস্থ্যকর্মীদের দাবি, ম্যারাডোনার মৃত্যু অপ্রত্যাশিত ছিল এবং তাঁরা নিজেদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করেছিলেন। পাশাপাশি প্রত্যেক আসামি ম্যারাডোনার চিকিৎসায় ব্যক্তিগত দায় এড়িয়ে গেছেন।

আদালতে উপস্থিত ছিলেন ম্যারাডোনার দুই মেয়ে। দালমা ম্যারাডোনা (মাঝে), জিয়ান্নিনা ম্যারাডোনা (ডানে)
এএফপি

ছিল না ডিফিব্রিলেটর

চিকিৎসকেরা অবহেলা থেকে ম্যারাডোনাকে হাসপাতালে না রেখে বাড়িতে সুস্থ করে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কি না, তা নিয়েই মূলত এ মামলার বিচার চলছে।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের পক্ষ থেকে বলা হয়, আসামিরা কর্তব্যে কী পরিমাণ অবহেলা করেছিলেন, তার প্রমাণ হলো সেই বাড়িতে হাসপাতালের বিছানা, ডিফিব্রিলেটর (চিকিৎসা যন্ত্র, যা হৃদ্‌যন্ত্রে নিয়ন্ত্রিত বৈদ্যুতিক শক দিয়ে স্বাভাবিক স্পন্দন ফিরিয়ে আনে), অ্যাম্বুলেন্স বা ন্যূনতম চিকিৎসাসামগ্রীর অস্তিত্ব ছিল না।

বেশ কয়েকজন চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন, মৃত্যুর আগে ম্যারাডোনার শরীরে এডেমা, ট্যাকিকার্ডিয়া (দ্রুত হৃৎস্পন্দন) ও শ্বাসকষ্টের মতো বিপজ্জনক লক্ষণ দেখা দিলেও চিকিৎসকেরা সময়মতো কোনো পদক্ষেপ নেননি।

রাষ্ট্রপক্ষের সহকারী আইনজীবী কোসমে ইরিবারেন গতকাল বলেন, ‘ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনার মৃত্যু আকস্মিকভাবে হয়নি; এই মর্মান্তিক পরিণতির লক্ষণ অনেক আগেই স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করেছিল।’

আরও পড়ুন

গতকাল আদালতে যুক্তিতর্কের শুরুতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা সাবেক এই ফুটবলারের মৃতদেহের কিছু শিউরে ওঠার মতো ছবি প্রদর্শন করেন, যেখানে তাঁর পেট অস্বাভাবিকভাবে ফোলা দেখাচ্ছিল। তখন আদালতে উপস্থিত ম্যারাডোনার মেয়েরা ছবিগুলো না দেখতে নিজেদের মুখ ঢেকে রাখেন।

আর্জেন্টিনাকে ১৯৮৬ বিশ্বকাপ জেতান ম্যারাডোনা
এএফপি

ধারণা করা হচ্ছে, এই যুক্তিতর্ক পর্ব শেষ হতে প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লাগবে এবং পরবর্তী সময়ে মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। এর আগে ম্যারাডোনার মৃত্যুর ঘটনায় প্রথম বিচারকার্য আড়াই মাস চলার পর গত বছর বাতিল হয়। কারণ হিসেবে জানা যায়, বিচারকদের একজন এ মামলা নিয়ে একটি গোপন প্রামাণ্যচিত্রে অংশ নিয়েছিলেন।