ইংল্যান্ডের ‘চিট কোড’ বেলিংহামের বিশ্বকাপের একাদশে জায়গাই নিশ্চিত ছিল না!  

জোড়া গোল করে দলকে জিতিয়েছেন, উঠিয়েছেন সেমিফাইনালে—ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ড ফরোয়ার্ড জুড বেলিংহামের উচ্ছ্বাসটা দেখার মতোই হলো। পরশু মায়ামিতে নরওয়ের বিপক্ষেছবি: এএফপি

বিশ্বকাপের আগে ইংল্যান্ড দলকে মাঠে বাজানোর জন্য তিনটি গানের নাম দিতে বলা হয়েছিল। ওয়েসিসের ‘ওয়ান্ডারওয়াল’ আর নিল ডায়মন্ডের ‘সুইট ক্যারোলিনের’ সঙ্গে আরেকটা গানের নাম দিয়েছিল ইংল্যান্ড দল—বিটলসের ‘হেই জুড’।

ইংরেজ ব্যান্ড বিটলসের এই গান লেখা হয়েছিল ৫৮ বছর আগে। জুড বেলিংহামের জন্ম তারও ৩৫ বছর পর। কিন্তু এই বিশ্বকাপে এই গানটি যেন সমার্থক হয়ে গেছে ২৩ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডারের! নামটি এখন ইংল্যান্ডের ঘরে ঘরে—বেলিংহাম মানেই যেন ইংল্যান্ডের ত্রাতা। এই বিশ্বকাপে এখনো যে ইংরেজ সমর্থকেরা ‘ইটস কামিং হোম’ গাইতে পারছেন, তাতে হ্যারি কেইনের সঙ্গে তাঁর অবদানও কম নয়। 

ফুটবলের ভাষায় বেলিংহাম একজন আধুনিক ‘বক্স টু বক্স’ মিডফিল্ডার; যিনি খেলতে পারেন মাঠজুড়ে। কিন্তু মিডফিল্ডারের জার্সি গায়ে তিনি আদতে তো স্ট্রাইকারই, নইলে এক বিশ্বকাপে একজন মিডফিল্ডারের ৬ গোল করার কীর্তি তো খুব বেশি নেই। এই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের ছয় ম্যাচের মধ্যে চারটিতেই ম্যাচসেরা তো বেলিংহাম এমনি এমনি হননি! 

বেলিংহামের গল্পের শুরুটা ইংল্যান্ডের বার্মিংহামে, ২০১৯ সালের আগস্টে। মাত্র ১৬ বছর ৩৮ দিন বয়সে বার্মিংহাম সিটির জার্সিতে অভিষেক। ৪৪টি ম্যাচ খেলেই ২০ মিলিয়ন পাউন্ডে পাড়ি জমান জার্মান ক্লাব ডর্টমুন্ডে। সে সময় তাঁর পরা বার্মিংহামের ১৭ নম্বর জার্সিটা চিরকালের জন্য তুলে রাখে ক্লাবটি। সাধারণত কিংবদন্তিদের সম্মান জানিয়েই এটি করা হয়, যে মর্যাদা বেলিংহাম ১৭ বছর বয়সেই পেয়ে গিয়েছিলেন বার্মিংহামে। 

জুড বেলিংহাম
এএফপি

ডর্টমুন্ডে তাঁর দুর্দান্ত অভিষেকের পরেই ইংল্যান্ড জেনে গিয়েছিল, এই ছেলে হবে ইংলিশ ফুটবলের ‘নেক্সট বিগ থিং’। তবে ইংল্যান্ডের তখনকার কোচ গ্যারেথ সাউথগেট তাড়াহুড়ো করেননি বেলিংহামকে নিয়ে। ২০২১ ইউরোতে বদলি নেমেছিলেন তিন ম্যাচে। তবে ২০২২ বিশ্বকাপে বেলিংহাম শোনালেন তাঁর আগমনধ্বনি।

ইরানের বিপক্ষে করেন নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক গোল, সেই বিশ্বকাপে একুশ শতকে জন্মানো কোনো ফুটবলারের সেটিই ছিল প্রথম গোল। ২০২৪ ইউরোতে স্লোভাকিয়ার বিপক্ষে দুর্দান্ত বাইসাইকেল কিকের গোলের পর তাঁর সেই বিখ্যাত ‘হু এলস’ উদ্​যাপনটা চিনেছিল বিশ্ব। 

আরও পড়ুন

এর মধ্যেই বেলিংহামের ওপর চোখ পড়ে ইউরোপের বড় অনেক ক্লাবের। আরও অনেক বড় খেলোয়াড়ের মতো তাঁর গন্তব্যও হয় রিয়াল মাদ্রিদ। ২০২৩ সালে অভিষেকের প্রথম মৌসুমেই ১৯ গোল, লা লিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার পর ইংল্যান্ডের পর স্পেনেও শুরু হয়ে গেল ‘বেলিংহাম-ম্যানিয়া’।

কিন্তু এক বছর ধরে দেখতে হয়েছে মুদ্রার উল্টো পিঠ। কাঁধের চোটে পড়ে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে ছিলেন, ইংল্যান্ড দলেও একাদশে আগের মতো অপরিহার্য ছিলেন না। এর মধ্যে নতুন ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুখেলের সঙ্গেও সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না। টুখেল প্রকাশ্যে বেলিংহামের সমালোচনা করেন। পরে অবশ্য সে জন্য বেলিংহামের কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন তিনি। 

বিশ্বকাপে দলে যদি তাঁর জায়গা নিয়ে প্রশ্ন উঠেও ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই বেলিংহাম সেটির উত্তর দিয়েছেন দারুণ গোলে। পানামার সঙ্গে গোলের পর নিজেদের সেরাটা রেখে দিয়েছিলেন নকআউটের জন্য। শেষ ষোলোয় আজতেকায় মেক্সিকোকে স্তব্ধ করে দেওয়া জোড়া গোলের পর এবার নরওয়ের বিপক্ষেও জোড়া গোল—বেলিংহাম মানে যেন ইংল্যান্ডের ‘চিট কোড’, যেটি দিয়ে জয় করা যায় যেকোনো বাধা!

টানা দুটি নকআউট ম্যাচে জোড়া গোল করেছেন জুড বেলিংহাম
এএফপি

কোয়ার্টার ফাইনাল শেষে পুরো ইংল্যান্ড বেলিংহাম প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সতীর্থ এলিয়ট অ্যান্ডারসন বলেছেন, ‘ও ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় কীভাবে থাকতে পারে, সেটি আমার কাছে একটা বিস্ময়।’ নরওয়ে ম্যাচের প্রতিপক্ষ আর্লিং হলান্ডের কথা, ‘ইংল্যান্ড ভাগ্যবান ওর মতো একজন খেলোয়াড় পেয়েছে।’ ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি গ্যারি লিনেকারের কথাটা বোধ হয় ছাড়িয়ে গেছে অন্য সবকিছুকেই, ‘বেলিংহাম ইংল্যান্ডের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় হতে পারে।’

নরওয়ের সঙ্গে ম্যাচের আগে হলুদ কার্ডের শঙ্কায় ছিলেন বেলিংহাম। কোনোভাবে আরেকবার শাস্তি পেলেই সেমিতে বসে থাকতে হতো। বেলিংহাম ম্যাচ শেষে বলেছেন, পুরো সপ্তাহে মা ডেনিস তাঁকে সতর্ক করে গেছেন নিজের ভাষা সামলাতে, ট্যাকল সাবধানে করতে, বেফাঁস কিছু না বলতে। 

পুরো ইংল্যান্ডের পক্ষ থেকে বেলিংহামের মা একটা ধন্যবাদ পেতেই পারেন।

আরও পড়ুন