প্রথম আলো-স্টার নিউজ নারী ফুটবল
অভিজ্ঞতায় জয়, জমজমাট ফাইনালে পিছিয়ে পড়েও চ্যাম্পিয়ন সাবিনা-কৃষ্ণাদের টাঙ্গাইল
শুরুতেই গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়া, তারপর অভিজ্ঞতার ঝলকে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ানো। রোমাঞ্চকর এক ফাইনাল জিতে প্রথম আলো-স্টার নিউজ নারী ফুটবল টুর্নামেন্টের প্রথম আসরের শিরোপা জিতল টাঙ্গাইলের মরহুম ফরহাদ হোসেন তালুকদার ফুটবল একাডেমি। আজ সাভারের বিরুলিয়ায় ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মাঠে ময়মনসিংহের অদম্য কলসিন্দুর ফুটবল একাডেমিকে ২-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে তারকাবহুল দলটি।
প্রথম তিন ম্যাচে টাঙ্গাইলের অধিনায়ক ছিলেন সাফজয়ী কৃষ্ণা রানী সরকার; কিন্তু সেমিফাইনাল ও ফাইনালে অধিনায়কের বাহুবন্ধনী পরেন দুইবারের সাফজয়ী বাংলাদেশ নারী দলের সাবেক অধিনায়ক সাবিনা খাতুন। তবে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি নেওয়ার জন্য নিজে না গিয়ে কৃষ্ণাকেই মঞ্চে এগিয়ে দেন সাবিনা। কৃষ্ণা ট্রফি উঁচিয়ে ধরতেই কনফেত্তির রঙিন কাগজের ফোয়ারায় উল্লাসে মেতে ওঠেন চ্যাম্পিয়ন দলের সবাই। যে দলে ছিলেন মাছুরা পারভীন, মাতসুশিমা সুমাইয়া, নীলুফা ইয়াসমিন, মার্জিয়াসহ ছয়জন সাফজয়ী খেলোয়াড়।
সাফজয়ী তারকাদের সঙ্গে টাঙ্গাইলের নবীনেরাও তাল মিলিয়ে খেলে দলকে শিরোপা এনে দিয়েছেন। শিরোপা উৎসবটাও হলো নবীন-প্রবীণের মিলিত উচ্ছ্বাসে। ট্রফি নিয়ে ছবি তোলার ধুম পড়ে পড়ন্ত বিকেলে। ভক্তদের সঙ্গে ছবি তোলার ফাঁকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার ব্যস্ত সময়ও কেটেছে সাবিনা-কৃষ্ণাদের। কলসিন্দুরের মেয়েদের কাছে তা কিছুটা হতাশার হলেও এই বিকেলটা তাঁরাও মনে রাখবেন অনেক দিন।
ফাইনালের শুরুটা চমক দিয়ে করেছিল কলসিন্দুরের মেয়েরা। বৃষ্টির কারণে মাঠ ভারী থাকায় নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা পর শুরু হওয়া ফাইনালের দ্বিতীয় মিনিটেই তাঁরা গোল করে উল্লাসে মাতেন। টাঙ্গাইলের গোলকিপার বক্সের ওপরে উঠে এলেও বল ঠিকমতো ক্লিয়ার করতে পারেননি। সেই সুযোগে নিখুঁত শটে ফাঁকা পোস্টে বল পাঠিয়ে কলসিন্দুরকে এগিয়ে দেন ফরোয়ার্ড ঝুমুর আক্তার। পুরো টুর্নামেন্টে ফাইনালে এসে প্রথম গোল হজম করে টাঙ্গাইল।
গোল খেয়ে সমতায় ফিরতে সাঁড়াশি আক্রমণ চালায় টাঙ্গাইলের দলটি। সাবিনা, কৃষ্ণা ও সুমাইয়াদের একের পর এক আক্রমণে সুফল আসে ১৮ মিনিটে। একক প্রচেষ্টায় বক্সে ঢুকে দারুণ প্লেসিং শটে টাঙ্গাইলকে ১-১ সমতায় ফেরান সাবিনা খাতুন। দ্বিতীয় গোলটি পেতে সময় নেয়নি টাঙ্গাইল। ২০ মিনিটে মাছুরা পারভীনের দূরপাল্লার কোনাকুনি শটে এগিয়ে যায় টাঙ্গাইল। বৃষ্টির কারণে ৭০ মিনিটের ম্যাচ ৫০ মিনিটে নেমে আসায় গোলটা ধরে রাখতে খুব একটা ঘাম ঝরাতে হয়নি টাঙ্গাইলকে। ফিফা রেফারি সারাবান তহুরার শেষ বাঁশির সঙ্গে সঙ্গেই উল্লাসে মেতে ওঠে সাবিনা-মাছুরাদের দলটি।
টুর্নামেন্টে খেলার ইচ্ছা থাকায় টুর্নামেন্ট কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছিলেন সাবিনা। মাঠে নেমেও দেখিয়েছিলেন ঝলক। দুটি ম্যাচ খেলে দুটিতেই হয়েছেন ম্যাচসেরা। ফাইনাল সেরার পুরস্কার নিয়ে সাবিনা ছিলেন উচ্ছ্বসিত, ‘আমি প্রথমেই ধন্যবাদ দিতে চাই এত সুন্দর একটা আয়োজনের জন্য। প্রত্যেকটি মেয়েই এই টুর্নামেন্ট উপভোগ করেছে। আমার মনে হয়, মেয়েদের জন্য এটি বিরাট এক মঞ্চ। যেখানে অনেক সিনিয়র খেলোয়াড়ের সঙ্গে সঙ্গে খেলতে পেরেছে নতুনেরা।’
টুর্নামেন্টে নিজের খেলা নিয়ে বলতে গিয়েও সাবিনার মুখে ছিল চওড়া হাসি, ‘আমার ইচ্ছা ছিল যদি সুযোগ হয় দুই একটা ম্যাচ খেলব; এবং খেলতে এসে দুটি ম্যাচে সেরার পুরস্কার পেয়েছি। আমাদের এই সাফল্য পুরোটাই দলগত।’
টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার উঠেছে চ্যাম্পিয়ন দলের সেন্টারব্যাক মাছুরা পারভীনের হাতে। টুর্নামেন্টে নিজেদের প্রথম ম্যাচে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার পেয়ে মাছুরা মজা করে বলেছিলেন, উঠতি খেলোয়াড়েরা তাঁর সামনে আসতে নাকি ভয় পায়। ফাইনালের মঞ্চে সেটা মনে করিয়ে দিলে মাছুরা আবারও মজা করেন, ‘আমি ওদের (ছোটদের) সাহস দিয়ে বলেছিলাম, আসো, খেলো, আমি মারব না। ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’
পুরস্কার নিয়ে ফেরার সময় জানালেন, তাঁর কাছে এই পুরস্কারটা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কারণটাও বলেন, ‘এর আগে কখনো কোনো টুর্নামেন্টে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার পাইনি। ভাবিনি যে পুরস্কারটা পাব। তবে পেয়ে খুব ভালো লাগছে।’
সর্বোচ্চ ৮ গোল করে টুর্নামেন্টের সেরা গোলদাতার পুরস্কার জিতেছেন রাঙামাটির সুইহলামং ফুটবল একাডেমির হয়ে খেলা জাতীয় স্তরে উঠতি তারকা উমেহ্লা মারমা। তাঁর পক্ষে পুরস্কার নেন তাঁর কোচ সুইহলামং।
প্রথম আলোর প্রধান ক্রীড়া সম্পাদক উৎপল শুভ্রর সঞ্চালনায় পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ছিলেন টুর্নামেন্ট কমিটির প্রধান কামরুন নাহার ডানা, টুর্নামেন্টের টেকনিক্যাল কমিটির প্রধান মারুফুল হক, টুর্নামেন্ট কমিটির সদস্য আলফাজ আহমেদসহ কয়েকজন সদস্য। ছিলেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. মাসুম ইকবাল ও স্টার নিউজের হেড অব ইনপুট আসিফ জাহাঙ্গীর।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ৩৬টি নারী ফুটবল একাডেমি নিয়ে গত ২৬ সেপ্টেম্বর রংপুরে শুরু হয়েছিল এই আয়োজনের আঞ্চলিক পর্ব। রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, চট্টগ্রাম ও ঢাকা অঞ্চল থেকে ওঠা আটটি দল নিয়ে ড্যাফোডিলের মাঠে অনুষ্ঠিত হয়েছে কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল ও ফাইনাল।
একই মাঠে হয়েছে ঢাকা পর্বও। চ্যাম্পিয়ন দল পাঁচ লাখ ও রানার্সআপ তিন লাখ টাকা অর্থ পুরস্কার পেয়েছে। টুর্নামেন্টে নিবন্ধিত ফুটবলার ছিলেন ৮২৮ জন। খেলা পরিচালনা করেন দেশসেরা নারী রেফারিরা। ফাইনালে বিরতির সময় টুর্নামেন্টের থিম সং গেয়ে শোনান ফাতিমা তুয যাহারা ঐশী।