সমালোচনার পর স্থগিত এলইডি লাইট দেখার কাতার সফর
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে সরকার সম্প্রতি যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সরকারি কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর বন্ধ করা। অথচ কাতার বিশ্বকাপের ভেন্যুগুলোতে স্থাপিত এলইডি ফ্লাডলাইট দেখতে আগামীকাল দোহা যাওয়ার কথা ছিল সরকারের চার কর্মকর্তার। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা খোঁজখবর নেওয়া শুরু করলে আজ এই সফর স্থগিত করা হয়েছে।
এই সফরে যে চারজনের যাওয়ার কথা ছিল, তাঁদের মধ্যে ছিলেন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মুহাম্মদ সারওয়ার জাহান, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব আবু নাছের ভূঁঞা, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সহকারী পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) সুকুমার সাহা ও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের প্রকল্প প্রকৌশলী মোহাম্মদ কামরুজ্জামান মিয়া।
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব আবু নাছের ভূঁঞা সফর স্থগিতের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘বিশ্বকাপের ভেন্যুগুলো দেখতে আমাদের কাতার যাওয়ার কথা ছিল। সেখানে মূলত অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য যাওয়ার কথা ছিল। এগুলো দেখে এসে প্রতিমন্ত্রীর (যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান) কাছে একটা প্রতিবেদন দেওয়ার কথা, যাতে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে এমন লাইট স্থাপন করা যায়। কিন্তু ব্যক্তিগত কারণে এই সফরে আমি যাচ্ছি না। তবে পরে এই সফর হলে মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে অন্য কেউ হয়তো যেতে পারে।’
এমন করলে তো দেশের সবারই স্থাপনা তৈরি করার আগে বিদেশে ঘুরতে যেতে হবে। তা ছাড়া যাঁরা সেখানে যাচ্ছেন, তাঁদের এই অভিজ্ঞতা আদৌ কাজে আসবে কি না, তা নিয়েও সংশয় আছে।আসাদুজ্জামান কোহিনুর, ক্রীড়া সংগঠক ও বাংলাদেশ হ্যান্ডবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক
আধুনিক প্রযুক্তির এলইডি ফ্লাডলাইটের টেকনিক্যাল বিষয়সমূহ সরেজমিনে পর্যবেক্ষণের জন্য ২৮ আগস্ট এই কর্মকর্তাদের কাতার সফরের সরকারি অনুমোদন দেয় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়।
যদিও এই বিদেশ সফরের জন্য কোনো বাজেট রাখা হয়নি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পক্ষ থেকে। কর্মকর্তাদের সরকারি আদেশ পত্রের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, এই সফরে তাঁদের যাবতীয় ব্যয়ভার বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) বহন করবে। এতে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ বা বাংলাদেশ সরকারের কোনো আর্থিক সংশ্লিষ্টতা নেই। অথচ বাফুফে এই সফরের কোনো খরচ দিচ্ছে না বলেই জানালেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আবু নাইম, ‘আমাদের জানিয়েই সেখানে যাওয়ার কথা তাঁদের। বিশ্বকাপের ভেন্যুগুলো কীভাবে তৈরি করা হয়, কীভাবে লাইটগুলো স্থাপন করা হয়, সেসব দেখতে যাচ্ছেন তাঁরা। কিন্তু এই সফরের কোনো খরচ বাফুফে দেবে না। কারণ, বাফুফের তহবিলে কোনো টাকা নেই।’
কর্মকর্তাদের কাতার সফরের এই বাজেট নিয়ে তৈরি হয় বড়সড় রহস্য। সরকারের পক্ষ থেকে যে এই সফরের কোনো বাজেট পাস হয়নি, সেটা নিশ্চিত করেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা কামরুন নাহার। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা এই বিষয়ে কিছুই জানি না। আমাদের কাছে এ-সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র আসেনি। খরচটা কারা বহন করবে বা এর বাজেটের বিষয়ে আমরা তাই কিছুই বলতে পারব না। সাধারণত যখন প্রতিমন্ত্রী মহোদয় বাইরে যান, তখন এর খরচের একটা অংশ এনএসসি (ক্রীড়া পরিষদ) বহন করে। তখন তিনি কাউকে সঙ্গে নিয়ে গেলে সেটারও কিছু অংশ এনএসসি বহন করে। কিছু অংশ অর্থ মন্ত্রণালয় বহন করে। সেটার অফিস আদেশ আমরা পেয়ে যাই। তবে এবার যে চারজন কাতার যাবেন, তাঁদের খরচের ব্যাপারে কোনো অফিস আদেশ আসেনি।’
মূলত বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের চলমান সংস্কারকাজকে সামনে রেখেই কাতার সফর করতে চেয়েছিলেন এনএসসির এই চার কর্মকর্তা। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ এই স্টেডিয়াম সংস্কারে প্রায় ১০০ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে এই স্টেডিয়ামে খেলা শুরুর কথা থাকলেও ফেব্রুয়ারি মাসের আগে কাজ শেষ হবে না। স্টেডিয়ামের ফ্লাডলাইট বসানো নিয়ে বাফুফে ও এনএসসি কোনো ঐকমত্যে আসতে পারেনি। বাফুফে চাইছে এলইডি ফ্লাডলাইট। কিন্তু এনএসসি চাইছে বর্তমান ফ্লাডলাইট। আর সেই এলইডি ফ্লাডলাইট দেখতেই কাতার যাওয়ার কথা ছিল তাঁদের।
কিন্তু এভাবে ফ্লাডলাইট দেখতে যাওয়ার আদৌ কোনো যৌক্তিকতা রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ক্রীড়া সংগঠক ও বাংলাদেশ হ্যান্ডবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান কোহিনুর, ‘যাঁরা এগুলো দেখতে যাচ্ছেন, সেগুলো চাইলে ইন্টারনেটের মাধ্যমেও দেখা যায়। ঢাকা শহরে যাঁরা বড় বড় উঁচু ভবন তৈরি করেন, সবাই কি এগুলো তৈরির আগে সেটার নির্মাণ কৌশল দেখতে বিদেশে যান? আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় স্থাপনা মিরপুর ইনডোর। সেটা তৈরির আগে তো কেউ বিদেশে যাননি। আমাদের ভলিবল, বাস্কেটবল জিমনেসিয়াম আছে, সেগুলো তৈরি করতে কি কেউ বিদেশে গেছেন? এমন করলে তো দেশের সবারই স্থাপনা তৈরি করার আগে বিদেশে ঘুরতে যেতে হবে। তা ছাড়া যাঁরা সেখানে যাচ্ছেন, তাঁদের এই অভিজ্ঞতা আদৌ কাজে আসবে কি না, তা নিয়েও সংশয় আছে।’