পিটারের ছক বনাম ‘চাপহীন’ ভারত

কাল অনুশীলনে বাংলাদেশের মেয়েরাবাফুফে

গোয়ার বিকেল মানেই সমুদ্রের নোনাজল মেশানো বাতাস, দূরে নারকেলগাছের সারি আর পর্যটকদের নিশ্চিন্ত পদচারণ। কিন্তু মারগাঁওয়ের জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামের আশপাশে এখন অন্য এক আবহ।

আরব সাগরের ঢেউ যতই শান্ত থাকুক, অষ্টম সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচ ঘিরে উত্তেজনার পারদ ক্রমেই চড়ছে দুই দলের অন্দরে। বাংলাদেশ সময় আজ রাত আটটায় এই লড়াই শুধু সাফে দুই দলের গ্রুপ–সেরা হওয়ার নয়, দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলের দুই শক্তিধর দলের সামর্থ্য যাচাইয়ের মঞ্চও।

ম্যাচের আগে দুই শিবির থেকেই এসেছে ভিন্ন ধরনের বার্তা। বাংলাদেশ কোচ পিটার বাটলার যেখানে কৌশল আর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন, সেখানে ভারতীয় কোচ ক্রিসপিন ছেত্রি বেছে নিয়েছেন চাপমুক্ত ফুটবলের দর্শন।

ভারত প্রথম ম্যাচে মালদ্বীপকে ১১-০ গোলে বিধ্বস্ত করেছে। একই দলকে বাংলাদেশ হারিয়েছে ৪-২ গোলে। এতেই দুই দল উঠে গেছে সেমিফাইনালে। গ্রুপ–সেরা হয়ে সেমিতে নেপালকে এড়াতে আজ বাংলাদেশের জয়ের বিকল্প নেই। তাই তো কাল সকালবেলায় মারগাঁওয়ের ডন বস্কো মাঠে বাংলাদেশ দলের অনুশীলনে ছিল ভিন্ন দৃশ্য। কোচ বাটলার প্রতিটি পাসিং, মুভমেন্ট এবং ছোট ছোট অনুশীলন ম্যাচ গভীর মনোযোগে সেরেছেন।

পরিসংখ্যানের খেরোখাতা খুললে দেখা যাবে, একসময় ভাগ্য ভারতের দিকেই হেলে থাকত। ২০১০ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত প্রথম পাঁচটি সাফেই হেরেছিল বাংলাদেশ। প্রথমটিতে ৬–০, এরপর ২০১২ সাফে ৩–০, ২০১৪ সাফে ৫–১ আর ২০১৯-এর সেমিফাইনালে ৪–০ গোলে জিতে ম্যাচগুলো একপেশে বানিয়ে ফেলেছিল ভারত।

মাঝখানে ২০১৬ সালের গ্রুপপর্বে একটি ম্যাচ ০-০ ড্র করতে পেরেছিল বাংলাদেশ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে হাওয়া বদলেছে। ২০২২ সাফের সেমিফাইনালে ৩-০ এবং ২০২৪-এর গ্রুপ পর্বে ৩-১ ব্যবধানে জিতে বাংলাদেশ মনে করিয়ে দিয়েছে, এখন আমরাও পারি।

আরও পড়ুন

টুর্নামেন্টের প্রথম পাঁচ আসরেরই চ্যাম্পিয়ন ভারত। পরের দুটিতে বাংলাদেশ। ভারত নিশ্চিতভাবে চাইবে এবার ঘরের মাঠে হারানো মুকুট ফিরে পেতে। দলে কয়েকজন ‘বয়সী’ খেলোয়াড় বাদ দিয়ে তরুণদের সুযোগ দিয়েছে তারা।

শনিবার সন্ধ্যায় ডন বস্কো মাঠে দলের অনুশীলনের আগে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কোচ ছেত্রি বলেন, ‘আমরা আমাদের মেয়েদের ওপর কোনো চাপ দিচ্ছি না। তাদের স্বাধীনভাবে নিজেদের খেলা খেলতে দিতে হবে। আমি এবং বাংলাদেশের কোচ পিটার বাটলার—দুজনই বিশ্বাস করি যে আমাদের দলগুলোকে নিয়মিতভাবে এএফসি এশিয়ান কাপের পর্যায়ে খেলতে হবে। সাফ পর্যায়টি মূলত শেখা এবং নিজেদের দক্ষতা উন্নত করার জন্য।’

কিন্তু মহারণে জয় কে না চায়! ভারতের গোলরক্ষক পানথোই চানুও মনপ্রাণে চাইছেন তা, ‘বাংলাদেশ ভালো দল। তবে আমরা জিততেই নামব। যদিও স্কোরলাইন কত হবে, তা নিয়ে আমরা ভাবছি না।’ বাংলাদেশ কোচ পিটার বাটলারও আশাবাদী। কাল সকালে ডন বস্কো মাঠে অনুশীলন শেষে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠে ছড়িয়েছে আত্মবিশ্বাসের সুর, ‘আমরা ভারতকে যথেষ্ট সম্মান করি। তবে সেমিফাইনালে যারাই সামনে পড়ুক, কাউকেই ভয় পাই না।’

অনুশীলনে চনমনে ঋতুপর্ণা
বাফুফে

আগের ম্যাচে মালদ্বীপের বিপক্ষে নড়বড়ে রক্ষণ আর আক্রমণ থেকে প্রত্যাশিত মাত্রায় গোল না পাওয়ার কথা উল্লেখ করেও বাংলাদেশ কোচের আত্মবিশ্বাস, ‘ভারতের বিপক্ষে পুরো ভিন্ন বাংলাদেশকে দেখা যাবে।’

বাংলাদেশের জন্য বড় সুখবর, মাঝমাঠের ভরসা মনিকা চাকমা এবং রক্ষণভাগের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য শিউলি আজিমের ফেরা। ফলে বাটলারের হাতে কৌশলগত বিকল্পও বাড়ছে।

অন্যদিকে স্বাগতিক ভারত পাবে না তাদের অন্যতম তারকা ২৪ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড মনিষা কল্যাণকে, যা বাংলাদেশের জন্য কিছুটা স্বস্তির। ভারতের আক্রমণভাগের প্রাণভোমরা, উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ খেলা পেরুর ক্লাব আলিয়াঞ্জা লিমার এই ফরোয়ার্ড গোয়া আসবেন ১ জুন ফিফা উইন্ডোর পর।

সব মিলিয়ে আজ মাঠে চলবে গত দুবারের চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস আর সাবেক চ্যাম্পিয়ন স্বাগতিক ভারতের ঘরের মাঠের সুবিধা নেওয়ার লড়াই। আরব সাগরের তীরের শহরে যখন ম্যাচ শুরুর বাঁশি বাজবে, সমুদ্রের শান্ত বাতাসও হয়তো হার মেনে যাবে মাঠের লড়াইয়ের উত্তাপে। গোয়ার রাত সাক্ষী হবে দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলের জমজমাট এক দ্বৈরথের।

আরও পড়ুন