শূন্য থেকে শিখরে ওঠার এক মহাকাব্য মারিয়া মান্দার

মারিয়া মান্দাপ্রথম আলো

অধিনায়কত্বের অভিষেকেই সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও উঠেছে তাঁর হাতে। নতুন ভূমিকায় মাঝমাঠের প্রাণ মারিয়া মান্দার শুরুটা হয়েছে দারুণ। খেলায় নিয়ন্ত্রণ রাখা, বল সঠিকভাবে বণ্টন করা যাঁর কাজ।

বাংলাদেশের জার্সি গায়ে মাঝমাঠ সামলানোই এখন যাঁর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। কিন্তু এই ট্রফি, করতালি আর আলোর ঝলকানির পেছনের গল্পটা মোটেও সহজ ছিল না। এটি মূলত এক লড়াকু মা আর অদম্য মেয়ের শূন্য থেকে শিখরে ওঠার মহাকাব্য।

গতকাল সাফের মঞ্চে মালদ্বীপ ২ গোলে পিছিয়ে থাকলেও একপর্যায়ে ২-২ করে ফেলে। যদিও শেষ পর্যন্ত ৪-২ গোলে জিতে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ। সাবিনা খাতুনের পর আফঈদা খন্দকার, আর এবার অধিনায়কত্বের আর্মব্যান্ড উঠল মারিয়া মান্দার হাতে। আর অধিনায়ক হিসেবে প্রথম ম্যাচেই পেলেন সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি।

গতকাল জওহরলাল নেহেরু স্টডিয়ামে ম্যাচসেরার ক্রেস্ট হাতে নিয়ে মিক্সড জোনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মারিয়া। আনিকার ১১ সেকেন্ডের গোলটির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘প্রথম ম্যাচে ৩ পয়েন্ট পেয়েছি, খুব ভালো একটা শুরু হয়েছে। আনিকার শুরুর ওই গোল আমাদের মানসিকভাবে অনেক এগিয়ে দিয়েছিল। দেশবাসীর কাছে অনুরোধ, আপনারা যেভাবে পাশে আছেন, সব সময় থাকবেন।’

৩১ মে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ভারত, যারা মালদ্বীপকে ১১ গোল দিয়েছে

৩১ মে গ্রুপের সেরা হওয়ার লড়াইয়ে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ভারত, যারা মালদ্বীপকে ১১ গোল দিয়েছে। বাংলাদেশ তাই একটু চাপে আছে। তবে তা একপাশ সরিয়ে রাখতে চান মারিয়া, ‘আমরা আশাবাদী, নিজেদের সেরাটা দিয়ে ভারতকে হারিয়ে গ্রুপসেরা হয়েই সেমিফাইনালে খেলব।’

মাঠে প্রতিপক্ষের সঙ্গে আর মাঠের বাইরে জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে জিতে আসা মারিয়া মান্দা আজ কোটি নারীর অনুপ্রেরণা। তাঁর গল্প হয়তো ছোট, কিন্তু তা প্রতিটি প্রান্তিক মেয়ের স্বপ্নকে আকাশ ছোঁয়ার সাহস জোগায়।

আরও পড়ুন

ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার পাহাড়ঘেরা, সবুজে মোড়া এক গ্রাম মন্দিরগোনা। এই গ্রামেই জন্ম মারিয়া মান্দার। তিনি গারো সম্প্রদায়ের মেয়ে। গারো সমাজ থেকে তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ারে সরাসরি কোনো বাধা আসেনি।

কিন্তু গ্রামীণ রক্ষণশীল সমাজ থেকে হাফপ্যান্ট পরে মেয়েদের ফুটবল খেলা নিয়ে ধেয়ে আসত কটূক্তি। সেই সময় পাশে দাঁড়িয়েছিলেন কলসিন্দুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কোচ মফিজ উদ্দিন এবং শিক্ষিকা মিনতি রানী শীল। তাঁরা প্রতি সপ্তাহে অভিভাবকদের মিটিং ডেকে বোঝাতেন, মেয়েদের খেলার সুযোগ দেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরতেন। তাঁদের হাত ধরেই মূলত কলসিন্দুর গ্রামে নারী ফুটবলের এক নীরব বিপ্লব শুরু হয়েছিল।

মারিয়া মান্দার উঠে আসা সহজ ছিল না
হাসান রাজা

মারিয়া তৃতীয় শ্রেণিতে থাকতে তাঁর বাবা বীরেন্দ্র মারাক মারা যান। বাবার কোনো স্মৃতি মারিয়ার মনে নেই। চার ভাই–বোনকে নিয়ে মা এনতা মান্দা পড়েন অথৈ সাগরে। নিজেদের কোনো জমি ছিল না। অন্যের জমিতে দৈনিক মাত্র ২০০ টাকা মজুরিতে দিনমজুরের কাজ (ধান কাটা, ধান বোনা) শুরু করেন মা। সেই সব দিনে খাবার জোগানোই ছিল বড় লড়াই। খেলার জন্য বুট কেনা ছিল বিলাসিতা।

মারিয়া খেলতেন খালি পায়ে। যখনই বুট কেনার বা বাইরে খেলতে যাওয়ার টাকার প্রয়োজন হতো, মা ২-৩ দিন টানা অতিরিক্ত কাজ করে টাকা জমিয়ে মেয়ের হাতে তুলে দিতেন। বর্ষাকালে যখন নেতাই নদী উত্তাল হয়ে উঠত, তখন মাঝির অপেক্ষায় না থেকে মা এনতা মান্দা নিজেই নৌকা বেয়ে মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দিতেন। মারিয়ার মেজো বোন পাপিয়া মান্দাও পড়াশোনা ছেড়ে অন্যের বাড়িতে কাজ করে মায়ের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, যা মারিয়ার জীবনের অন্যতম বড় অনুপ্রেরণা।

২০১১ সালে বঙ্গমাতা স্কুল ফুটবল দিয়ে মারিয়ার ফুটবলযাত্রা শুরু। ২০১৩ সালে বঙ্গমাতা স্কুল টুর্নামেন্টে কলসিন্দুর স্কুল দেশসেরা হয়। মারিয়া সেই বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব–১৪ দলের সদস্য, যারা ২০১৫ সালে নেপালে এএফসি অনূর্ধ্ব–১৪ নারী আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়নশিপ এবং ২০১৬ সালে তাজিকিস্তানে অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ্ব–১৪ নারী আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছিল।

বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব–১৫, ১৬, ১৯ দলে খেলার সময় অধিনায়কত্বও করেছেন মারিয়া। বাংলাদেশের জেতা প্রথম সাফে তিনি ছিলেন সহ-অধিনায়ক। ২০১৬ সাল থেকে জাতীয় দলের নিয়মিত মুখ। ইতিমধ্যে ৫০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর। দেশের হয়ে দুটি ঐতিহাসিক সিনিয়র সাফজয়ী দলের অন্যতম প্রধান কাণ্ডারি তিনি। সাফ জয়ের অসামান্য অবদান রাখার জন্য পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘একুশে পদক’। এ ছাড়া ভুটানের ঘরোয়া লিগে শীর্ষ ক্লাব ‘থিম্পু সিটি’র জার্সিতে খেলার আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও হয়েছে তাঁর।

আরও পড়ুন

মারিয়াদের এই অভাবের গল্প বিশ্বজুড়ে উন্মোচিত হয় ‘অদ্যম মেয়েরা’ প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে। প্রথম আলোর প্রথিতযশা সাংবাদিক, সাহিত্যিক আনিসুল হক যখন একাধিকবার তাঁদের গ্রামে যান, মারিয়া তাঁর কাছে গ্রামে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানান। তাঁর উদ্যোগেই মারিয়াদের বিদ্যুৎহীন অন্ধকার গ্রামে প্রথম আলোর রোশনাই জ্বলে ওঠে। রাষ্ট্রীয় নজর এবং প্রথম আলোর বৃত্তির সহায়তা মারিয়ার স্বপ্নের পথকে আরও পোক্ত করে।

ফুটবল মারিয়ার জীবনে আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। ফুটবলের উপার্জনে মারিয়া গ্রামে কিছু জমি কিনেছেন। মেজ বোনের অন্যের বাসায় কাজ করা বন্ধ করে বাড়ির পাশে একটি মুদিদোকান করে দিয়েছেন। ছোট ভাইয়ের জন্য তৈরি হয়েছে নতুন ঘর। সবচেয়ে বড় তৃপ্তি, মারিয়া তাঁর মাকে আর দিনমজুরের কাজ করতে দেন না।

যদিও ঘরে বসে থাকতে ভালো লাগে না বলে মা মাঝেমধ্যে মাঠে চলে যান। একসময় যে গ্রামবাসীরা কটূক্তি করতেন, আজ মারিয়া বাড়ি ফিরলে তাঁরা ফুল হাতে গেট সাজিয়ে বরণ করে নেন। সংবর্ধনার মঞ্চে বসে মারিয়া মায়ের চোখে যে গর্বের আলো দেখেছিলেন, তা ছিল মেঘেঢাকা আকাশে সূর্যের দেখা পাওয়ার মতো।

কোচ পিটার বাটলারের সঙ্গে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের অধিনায়ক মারিয়া মান্দা
বাফুফে

গত বছর ভুটানের লিগ খেলেছেন। ২৩ বছরের মারিয়া মনে করেন, দেশের নারী ফুটবলের উন্নতি করতে হলে নিয়মিত ঘরোয়া লিগ হওয়া প্রয়োজন। প্রচুর ম্যাচ খেললে আরও ভালো খেলোয়াড় উঠে আসবে। তবে কিছু আক্ষেপও রয়ে গেছে মারিয়ার কণ্ঠে।

মেয়েদের ক্রিকেটে বেতন, পুরস্কার সবকিছু ভালো। নারী ফুটবল দলও তা পেলে ভালো হবে। মেয়েরা ভালো ফল করলেও তুলনায় অতটা টাকাপয়সা পায় না। সাফ জেতার পর বাফুফে দেড় কোটি টাকা পুরস্কার দেবে বলেছিল, কিন্তু মেয়েরা এখনো তা পায়নি। চ্যাম্পিয়ন হয়ে পুরস্কারের অর্থ সময়মতো পেলে খেলোয়াড়দের ভালো লাগে। কিন্তু বাফুফে খেলোয়াড়দের সেই ভালোলাগার অনুভূতিটা দিতে পারেনি।
আরেকটি সাফ চলছে। এবার জিতলে কী করবে বাফুফে?