রিয়াল–বেনফিকা লড়াইয়ে একদিকে ‘সন্তান’, অন্যদিকে পিতৃতুল্য কোচ
চ্যাম্পিয়নস লিগে আজ রাতে বেনফিকা–রিয়াল মাদ্রিদের ম্যাচে সবার চোখ থাকবে ডাগআউটেও। দুই দলের ডাগআউটে এমন দুজন কোচ দাঁড়াবেন, যাঁরা একে অপরকে খুব ভালোভাবে চেনেন ও জানেন। বলা হচ্ছে, বেনফিকার কোচ জোসে মরিনিও এবং রিয়াল মাদ্রিদের নতুন কোচ আলভারো আরবেলোয়ার মধ্যকার গভীর সম্পর্কের কথা। ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত মরিনিও রিয়ালের কোচ থাকাকালে দারুণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে দুজনের মধ্যে।
রিয়ালে কোচ হিসেবে মরিনিওর সময়টা ছিল রোমাঞ্চ ও বিতর্কে ভরপুর। একপর্যায়ে ড্রেসিংরুমের অনেক তারকা খেলোয়াড়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভেঙে পড়ে। তবে কঠিন মানসিকতার ডিফেন্ডার আরবেলোয়া পুরো সময়ই ছিলেন মরিনিওর বিশ্বস্ত সৈনিক।
২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে স্প্যানিশ টিভি অনুষ্ঠান ‘এল চিরিঙ্গিতো’য় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরবেলোয়ার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল ‘মরিনহিসমো’ বা মরিনিওর দর্শন সম্পর্কে। এটা আসলে কেমন, তা দর্শন জানতে চাইলে আরবেলোয়া বলেন, ‘এটা হলো সবকিছুর মুখোমুখি হওয়া, নিজের পরিচয় নিয়ে ভয় না পাওয়া। আমি যতটা সম্ভব “মরিনিস্তা” হতে চাই।’
কয়েক মাস পরই আরবেলোয়া খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টানেন। তার আগে ২০১৬ সালের মে মাসে মরিনিও স্প্যানিশ দৈনিক মার্কাতে একটি খোলা চিঠিতে আরবেলোয়ার প্রশংসা করেছিলেন। তখন মরিনিও ছিলেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কোচ। মরিনিও লিখেছিলেন, ‘আরবেলোয়া আমার কাছে শুধু একজন খেলোয়াড় নয়, সে আমার বন্ধু। নিজের পেশার প্রতি ভালোবাসা, ক্লাবের প্রতি দায়বদ্ধতা, দলের জন্য নিবেদন ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে সততা, সবকিছুর উদাহরণ সে।’
পর্তুগিজ এই কোচ আরও যোগ করেন, ‘ও হয়তো খুব আলোচিত নাম নয়। কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদ, সমর্থক, কোচ ও সতীর্থদের জন্য সে নিজের সবটুকু দিয়েছে, এমনকি যা তার ছিল না, সেটাও। ১৬ বছরের কোচিং জীবনে সে আমার সঙ্গে কাজ করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের একজন।’
তবে লিসবনে আজ রাতে মুখোমুখি হওয়ার আগে মধুর এই বন্ধুত্বকে এক পাশে সরিয়ে রাখতে হবে দুজনকে। সরাসরি নকআউটে যেতে রিয়ালের ড্র–ই যথেষ্ট হতে পারে, তবে বেনফিকার সামনে জয়ের বিকল্প নেই। ফলে মরিনিওকে একটু বেশিই সতর্ক হয়ে মাঠে নামতে হবে। তবে যতই সতর্ক থাকুন, ডাগআউটে যখন একজনের অন্যজনের দিকে চোখ পড়বে, তখন নিশ্চয় পুরোনো স্মৃতি উঁকি দেবে।
২০১০ সালে মরিনিও যখন রিয়ালের দায়িত্ব নেন, তখন দলে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, কাকা, ক্যাসিয়াস, সের্হিও রামোস ও করিম বেনজেমারা ছিলেন মূল তারকা। আরবেলোয়া তখন তুলনামূলকভাবে আড়ালেই ছিলেন। ২০১৪ সালে জট ডাউন ম্যাগাজিনে আরবেলোয়া বলেছিলেন,‘প্রিসিজনেই বুঝে গিয়েছিলাম মরিনিও কেমন। এলএ গ্যালাক্সির বিপক্ষে আমরা হাফটাইমে ২-০ পিছিয়ে। তিনি সবাইকে ধমক দিলেন, এমনকি রোনালদোকেও। বললেন, দৌড়াতে না চাইলে বেঞ্চে বসবে। তুমি কাকা হও বা যুবদলের খেলোয়াড়, কিছু যায়–আসে না।’
মরিনিওর লক্ষ্য ছিল পেপ গার্দিওলার দুর্দান্ত বার্সেলোনাকে টপকানো। শুরুতে ধাক্কা খেয়েও তাঁর রিয়াল শারীরিক ও মানসিকভাবে বার্সাকে মোকাবিলা করতে শিখে যায়। ২০১১ সালে কোপা দেল রে ফাইনালে এল ক্লাসিকো জিতে নেয়, আর ২০১১-১২ মৌসুমে জেতে লা লিগা।
তবে সুবিধা আদায়ে মরিনিওর কঠোর পন্থা ড্রেসিংরুমে দ্বন্দ্বও বাড়ায়। ক্যাসিয়াস ও রামোসের মতো সিনিয়ররা তাঁর বিরুদ্ধে চলে যান। ২০১১ সালের স্প্যানিশ সুপারকোপায় বার্সা কোচ টিটো ভিলানোভার চোখে খোঁচা দেওয়ার ঘটনাটি ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করে।
‘এল এসপারতানো’ নামে পরিচিত আরবেলোয়া শেষ পর্যন্ত মরিনিওর পাশেই ছিলেন। এরপর ২০১২-১৩ মৌসুমে মরিনিওর সঙ্গে রোনালদোসহ অনেকের সম্পর্ক চরমভাবে খারাপ হয়। মৌসুম শেষে মরিনিও চলে গেলে আরবেলোয়া বলেন, ‘কিছু খেলোয়াড় নিজেদের সুনামকে দলের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। মরিনিও ক্লাবের জন্য সব আঘাত নিতে প্রস্তুত ছিলেন। সবাই কি তা বলতে পারে?’
পরবর্তী কোচ আনচেলত্তি এলেও আরবেলোয়া বারবার মরিনিওর ইতিবাচক প্রভাবের কথা বলেছেন। ২০১৭ সালে অবসর নেওয়ার পর আরবেলোয়া মিডিয়ায় নিয়মিত হয়ে ওঠেন এবং মরিনিওর পক্ষে কথা বলেন। বলেন, সমালোচনা সত্ত্বেও তিনি অনুশোচনা করেন না। পরে রিয়ালের টিভিতে বিশ্লেষক, ক্লাবের দূত ও যুব দলের কোচ হিসেবে কাজ করেন। পাঁচ বছর একাডেমিতে কাজ করার পর এ মাসেই তিনি জাবি আলোনসোর জায়গায় রিয়ালের মূল দলের কোচ হন।
আজ মুখোমুখি হওয়ার আগে সংবাদ সম্মেলনে মরিনিও প্রসঙ্গে প্রশ্ন এলে আরবেলোয়া বলেন, ‘তিনি আমাকে অনেক প্রভাবিত করেছেন। তবে আমি আলভারো আরবেলোয়া হিসেবেই কাজ করব।’ কাজেও অবশ্য সেই প্রমাণ দিয়েছেন আরবেলোয়া। মরিনিওর মতো প্রকাশ্যে তারকাদের আক্রমণ না করে আরবেলোয়া খেলোয়াড়দের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। কোপা দেল রেতে লজ্জাজনক হারের পরও তিনি সমর্থন দিয়েছেন খেলোয়াড়দের।
তবে মরিনিওর মতোই আরবেলোয়া রিয়ালের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের কথা বলতেও পিছপা নন। বার্নাব্যুতে ভিনিসিয়ুস, বেলিংহাম ও প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজকে দুয়ো দেওয়ার ঘটনায় তিনি বলেন,‘আমি জানি এই শিস কোথা থেকে আসছে। এরা রিয়াল মাদ্রিদকে পছন্দ করে না।’ এতে বোর্ডের সমর্থনও পেয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে মুখোমুখি হওয়ার আগে আরবেলোয়াকে নিয়ে মরিনিও বলেছেন, ‘একটা বিষয় পরিষ্কার, চিভু ও আরবেলোয়া দুজনই আমার সন্তান। তারা শুধু আমার সাবেক খেলোয়াড় নয়, তারা আমার কাছে বিশেষ কেউ। আলভারো মানুষ হিসেবে, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও অনুভূতির দিক থেকে আমার সবচেয়ে প্রিয় খেলোয়াড়দের একজন। সে হয়তো রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় নয়, কিন্তু আমার অধীন খেলা সেরা মানুষদের একজন।’
সব মিলিয়ে বলা যায়, আরবেলোয়ার মধ্যে স্পষ্ট ‘মরিনিস্তা’র ছাপ আছে। তবে ড্রেসিংরুম ও বোর্ড—দুটিই সামলাতে তিনি বেশি বাস্তববাদী। এ ভারসাম্যই হয়তো লিসবনের ম্যাচে এবং ভবিষ্যতে রিয়ালের পথে তাঁকে এগিয়ে রাখবে।