সময় থমকে দেওয়া মদরিচ

লুকা মদরিচ আজ ডালাসের মাঠে নামছেন ইংল্যান্ডের বিপক্ষেরয়টার্স

সময় কি সত্যিই সবকিছু শেষ করে দেয়?

২০০৬ সালের ১১ অক্টোবর। জাগরেবের মাকসিমির স্টেডিয়ামে সেদিন একটা অদ্ভুত দৃশ্য তৈরি হয়েছিল। গ্যারি নেভিলের ব্যাকপাস গেল পল রবিনসনের দিকে। বলটা বাঁকানো পথে এল, ছয় গজ বক্সের কিনারায় অদ্ভুত বাউন্স খেল এবং ইংলিশ গোলরক্ষক মিস করলেন। বল গেল জালে।

বিজ্ঞাপনের বোর্ডে তখন ভাসছিল ল্যারি চার্লসের বিখ্যাত ব্ল্যাক কমেডি ‘বোরাত’ সিনেমার সেই হাস্যোজ্জ্বল মুখ—স্যাশা ব্যারন কোহেনের গোঁফ আর হাসি, যেন ইংল্যান্ডের দুর্দশাকেই উপহাস করছে।

সেই ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার হয়ে পুরো ৯০ মিনিট খেলেছিলেন এক তরুণ মিডফিল্ডার। ওটা ছিল তাঁর একাদশ আন্তর্জাতিক ম্যাচ।

তবে প্রথম ম্যাচটি খেলেছিলেন সেই বছরই। একটা প্রীতি ম্যাচ, যেখানে লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথম গোল করেছিলেন। সেই তরুণের নাম—লুকা মদরিচ। তখন কেউ জানত না, একটা যুগের শুরু হয়েছিল সেই বছর।

টনি ব্লেয়ার তখন ডাউনিং স্ট্রিটে। আর্সেনাল হাইবেরি ছেড়ে সবে এমিরেটসে উঠেছে। ইতালি সদ্য বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। পেপ গার্দিওলা মেক্সিকোর দোরাদোসে শেষ মৌসুম খেলে অবসর নিতে চলেছেন।

ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে অনুশীলেন ক্রোয়াটরা
রয়টার্স

ফেসবুক কেবল সবার জন্য খুলল, টুইটার জন্মের মাত্র তিন মাস। ওই পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে মাকসিমির স্টেডিয়ামের সেই সদ্য তরুণ মিডফিল্ডারের দিকে সম্ভবত কেউ তাকাননি।

প্রায় দুই দশক পরে সেই লুকা মদরিচ আজ ডালাসের মাঠে নামছেন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। বয়স ৪০, খেলবেন ক্যারিয়ারের ১৯৯তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ।

ফুটবলে ৪০ মানে সাধারণত সংকলন, উপসংহার কিংবা বিদায়ী ভাষণ। তবু মদরিচ এই বিশ্বকাপে আছেন। শুধু আছেন না, ক্রোয়েশিয়ার কেন্দ্রে আছেন। ওয়াইনের সঙ্গে তুলনাটা এখানেই আসে। পুরোনো ওয়াইন সময়ের সঙ্গে শুধু টিকে থাকে না, গভীর হয়। তার রং গাঢ় হয়, স্বাদ বাড়ে।

মদরিচ খেলবেন ক্যারিয়ারের ১৯৯তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ
রয়টার্স

মদরিচের প্রজন্ম বলে আসলে কিছু নেই। তাঁর পাশে সতীর্থরা এসেছেন, আলো ছড়িয়েছেন, একসময় বুটজোড়া তুলে রেখে গ্যালারির দর্শক হয়ে গেছেন। কিন্তু মদরিচ এক চিরন্তন পথিকের মতো সময়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে হেঁটে চলেছেন।

দুটি বিশ্বকাপে একসঙ্গে দেখুন। ক্রোয়েশিয়া নকআউট পর্বে সাতটি ম্যাচ জিতেছে। কিন্তু একটিও ৯০ মিনিটে জেতেনি। প্রতিবার অতিরিক্ত সময়, প্রতিবার টাইব্রেকারের রুদ্ধশ্বাস শেষ এবং দুবারই শেষ পর্যন্ত হেরে গেছে চ্যাম্পিয়নের কাছে। এটা কি দুর্বলতা? নাকি এটাই মদরিচের ক্রোয়েশিয়ার চরিত্র, যে সহজে মরে না, ৯০ মিনিটে শেষ হয় না!

আরও পড়ুন

মদরিচ সম্ভবত এবার বিশ্বকাপের পরে অবসর নেবেন। এখনো বলেননি, কিন্তু সবাই জানে। এ কারণেই ডালাসে আজকের ম্যাচটা শুধু একটা গ্রুপ পর্বের লড়াই নয়। এটা একটা যুগের শেষ অধ্যায়ের শুরু।

মদরিচ বনাম ইংল্যান্ড—যে সিরিজ শুরু হয়েছিল বোরাতের গোঁফের ছায়ায়, পেরিয়েছে ২০১৮ মস্কোর সেই রাত। সেই সিরিজের হয়তো শেষ পর্ব।

ফুটবলে সবচেয়ে সুন্দর যা আছে, তা হলো সময় মাঝেমধ্যে ভুল প্রমাণিত হয়। ৪০ বছরের একজন মানুষ মাঠে নামেন এবং পায়ের ছন্দে, চোখের দৃষ্টিতে, মুহূর্তের সিদ্ধান্তে বুঝিয়ে দেন যে ঘড়ি তাঁর জন্য বাঁধা নিয়মে চলে না।

পুরোনো ওয়াইনও শেষ পর্যন্ত ফুরোয়। কিন্তু শেষ চুমুকেও যে স্বাদ থাকে, সেটাই সবচেয়ে মনে থাকে। ডালাস সেই চুমুকের অপেক্ষায়।

আরও পড়ুন