আতলেতিকো সমর্থকদের রোষানলে আলভারেজ, কী হতে পারে তাঁর ভবিষ্যৎ
একের পর এক অবজ্ঞাসূচক শিস। মেত্রোপোলিতানোর কানফাটানো কোলাহলের ভেতর যেন এক বিষাক্ত গুঞ্জন। লাউডস্পিকার থেকে যখন নামটা ভেসে এল, গ্যালারি ফেটে পড়ল দুয়োধ্বনিতে।
হুলিয়ান আলভারেজের নাম।
৬৭ মিনিটে মার্ক পুবিলের বদলে মাঠে নেমেছিলেন আলভারেজ। ঘটনাটা সেই সময়ের। দর্শকদের কেউ কেউ চিৎকার করছিলেন, ‘ওকে চলে যেতে বলো।’
বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ডের পায়ের নিচে তখন যেন মাটি সরে যাচ্ছে। বেশ কয়েক বছর ধরেই যিনি আতলেতিকোর সবচেয়ে বড় তারকা, তাঁর জন্য এ এক অচেনা ভাষা।
ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে গতকাল ম্যাচটা যখন ২-২ সমতায় শেষ হলো, আলভারেজ সতীর্থদের সঙ্গে গ্যালারির সমর্থকদের দিকে হাততালি দিতে যাননি। সোজা হেঁটে চললেন ড্রেসিংরুমের সুরঙ্গে। গ্যালারি থেকে ছিটকে এল লাল-সাদা স্কার্ফ, গিয়ে পড়ল তাঁর পায়ের কাছে। একটি সম্পর্কে ফাটল ধরার দৃশ্য এর চেয়ে করুণ আর কীভাবে হতে পারে!
আসলে এই ফাটল তৈরি হয়েছে কয়েক মাস ধরে। আলভারেজের দলবদল নিয়ে মাসের পর মাস ধরে চলা টানাপোড়েন এখন একেবারে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলায় রূপ নিয়েছে। আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড নাকি ক্লাবের কর্তাদের জানিয়ে দিয়েছেন, আতলেতিকোয় আর খেলতে চান না, বার্সেলোনাই তাঁর স্বপ্নের গন্তব্য।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমে গুঞ্জন, মৌসুমে ক্লাবের এই প্রথম ম্যাচটাও খেলতে চাননি আলভারেজ। আতলেতিকোর কোচ দিয়েগো সিমিওনেও নাকি চেয়েছিলেন, আপাতত এই ম্যাচের স্কোয়াড থেকে তাঁকে বাইরে রাখতে। কিন্তু ক্লাবের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, আলভারেজকে জোর করে হলেও খেলাতে। সেটার ফল যে ভালো হয়নি, তা তো আলভারেজের প্রতি ক্লাবের সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া দেখেই বোঝা গেছে।
পরে কোচ সিমিওনে অবশ্য সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, ম্যাচ শেষে আলভারেজকে সরাসরি ড্রেসিংরুমে যাওয়ার নির্দেশটা ক্লাব থেকেই দেওয়া হয়েছিল। শিষ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে খোলামেলা কোনো পরামর্শ দিতে রাজি হননি তিনি, ‘উপদেশ দেওয়া আমার কাজ নয়। আমার কাজ খেলায় মন দেওয়া। আমরা যদি ট্রফি জিততে চাই, তবে একসঙ্গে থাকতে হবে।’
আতলেতিকোর গোলকিপার ইয়ান ওবলাকের কণ্ঠেও ছিল একই অস্বস্তির সুর, ‘হুলিয়ান এখন আমাদের সঙ্গেই আছে। তবে মানতেই হবে, পরিস্থিতিটা কারও জন্যই স্বস্তিকর নয়।’
সব মিলিয়ে প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই উঠছে, যে খেলোয়াড় থাকতে চাচ্ছেন না, খেলতে চাচ্ছেন না, তাঁকে রেখে আসলে কতটুকু লাভ হবে আতলেতিকোর? একই সঙ্গে আরেকটা প্রশ্ন: যদি শেষ পর্যন্ত ঠিকানা বদলাতেই হয়, তবে কোথায় যাবেন ২৬ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড?
আলভারেজের প্রথম এবং পরম আকাঙ্ক্ষিত গন্তব্য তো পরিষ্কার—বার্সেলোনা। ফুটবলের দর্শন বলুন কিংবা তাঁর টেকনিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড, ক্যাম্প ন্যুর বল পজেশনভিত্তিক ফুটবলে তিনি নিখুঁত ফিট। শুধু একজন প্রথাগত স্ট্রাইকার হিসেবেই নন, আক্রমণভাগের ডান-বাঁ কিংবা দ্বিতীয় স্ট্রাইকার হিসেবে তাঁর খেলতে পারার ক্ষমতা বার্সাকে দেবে বৈচিত্র্যের ছোঁয়া। তবে মুশকিল একটা জায়গায়, বার্সেলোনার আর্থিক টানাটানি। আর আতলেতিকোও যে খুব সহজে তাদের ঘরোয়া প্রতিপক্ষের হাতে এমন এক অস্ত্র তুলে দেবে, তা–ও ভাবা কঠিন।
আতলেতিকো আলভারেজকে ধরে রাখতে যতটা না মরিয়া, তার চেয়ে বেশি মরিয়া আসলে লা লিগার কোনো দল, বিশেষ করে বার্সেলোনার কাছে না বিক্রি করার ব্যাপারে।
এদিকে ডাক আসছে ইংল্যান্ড থেকেও। আর্সেনাল আগ্রহী। যদি বার্সেলোনার সঙ্গে শেষ পর্যন্ত বনিবনা না হয়, তাহলে আলভারেজের জন্য দ্বিতীয় সেরা বিকল্প হতে পারে আর্সেনাল। মিকেল আরতেতার গতিশীল ও হাই-প্রেসিং ফুটবলে আলভারেজ হতে পারেন তুরুপের তাস। ম্যানচেস্টার সিটিতে থাকার সুবাদে প্রিমিয়ার লিগের মেজাজও তাঁর চেনা। আর্সেনালও এমন এক ফিনিশার খুঁজছে, যিনি শুধু গোলই করবেন না, বল ছাড়াও প্রতিপক্ষের ওপর সমানে চাপ বজায় রাখবেন।
এখন আলভারেজ প্রিমিয়ার লিগে ফিরতে কতটা আগ্রহী, সেটা বোঝার অপেক্ষা। তবে তিনি যে আতলেতিকোতে থাকতে চান না, তা কিছুদিন আগে প্রায় স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছিলেন, ‘সত্যি বলতে আমি জানি না কী হবে। তবে আমি আড়াল করার ভানও করতে পারি না। আমি ক্লাবের সঙ্গে কথা বলেছি। সবার ভালোর জন্যই একটা ট্রান্সফার দরকার, যাতে আমি আমার স্বপ্ন পূরণ করতে পারি।’
আলভারেজের স্বপ্ন পূরণ হবে কি না, তা জানার জন্য দলবদলের বাজারের নাটকীয়তা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আতলেতিকো মাদ্রিদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের সুতো যে ঢিলে হয়ে গেছে, সেই তিক্ত সত্য ঢাকা দেওয়ার কোনো সুযোগ আর নেই।