নাচতে যাওয়ার স্বাধীনতা ও স্ত্রীর রান্নার কোর্সের খরচ: ফুটবলারদের চুক্তিতে যত অদ্ভুত শর্ত
ফুটবল মাঠে গোল করার জন্য কত কিছুই না করেন খেলোয়াড়েরা। কেউ করেন কঠোর অনুশীলন, কেউ মেনে চলেন খাবারের কড়া নিয়ম। কেউ আবার নিজের শরীর ঠিক রাখতে জিম করে দিনরাত পার করে দেন। কিন্তু ক্লাবের সঙ্গে চুক্তি করার সময় তাঁদের আবদারগুলো শুনলে চোখ কপালে উঠতে পারে।
কেউ চেয়েছেন ব্যক্তিগত বিমান। কেউ প্রতি মৌসুমে একটি করে বাড়ি। কারও চুক্তিতে আছে নাচতে যাওয়ার স্বাধীনতা। এমনকি একজনের চুক্তিতে লেখা ছিল, তিনি পৃথিবী ছেড়ে মহাকাশে চলে গেলে ক্লাব চুক্তি বাতিল করতে পারবে!
ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে অদ্ভুত কিছু চুক্তির গল্প শোনা যাক।
মহাকাশে গেলে চাকরি শেষ
১৯৯৯ সালে ভ্যালেন্সিয়া থেকে সান্ডারল্যান্ডে যোগ দেন স্টেফান শোয়ার্জ। একসময় তিনি মহাকাশে যাওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। সেটিই হয়ে গেল তাঁর চুক্তির অদ্ভুত এক শর্ত। শোয়ার্জ পৃথিবী ছেড়ে মহাকাশে গেলে চুক্তি বাতিল করার অধিকার থাকবে ক্লাবের।
রাতে নাচতে যেতে হবে
রোনালদিনিওর ফুটবল যেমন আনন্দের, জীবনযাপনও তেমনই। ফ্লামেঙ্গোর সঙ্গে চুক্তিতে তাঁর জন্য ছিল বিশেষ স্বাধীনতা। সপ্তাহে অন্তত দুবার নৈশ ক্লাবে নাচতে যেতে পারবেন। এ জন্য ক্লাব কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে না।
প্রতিদিন ব্যক্তিগত বিমানে অনুশীলনে
রাশিয়ার ক্লাব আনঝি মাখাচকালায় যোগ দিয়ে স্যামুয়েল ইতো দাবি করেন ব্যক্তিগত বিমান। তাঁর ইচ্ছা, মস্কোয় থাকবেন, আর প্রতিদিন বিমানে উড়ে অনুশীলনে যাবেন। ক্লাবও তাঁর সেই আবদার মেনে নেয়।
নাইকির জন্য চিকিৎসকের সনদ
২০১৫ সালে মাতিয়া নাস্তাসিচ ম্যানচেস্টার সিটি থেকে শালকেতে যোগ দেন। তখন শালকের খেলোয়াড়দের শুধু অ্যাডিডাসের বুট পরার নিয়ম ছিল। কিন্তু সার্বিয়ান এই ডিফেন্ডার জানালেন, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তিনি শুধু নাইকির বুট পরতে পারবেন। প্রমাণ হিসেবে জমা দিলেন চিকিৎসকের সনদ!
বালাতেল্লির ভালো আচরণের শর্ত
প্রিমিয়ার লিগে বদমেজাজি খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিতি ছিল মারিও বালাতেল্লির। লিভারপুলে যোগ দেওয়ার সময় তাঁর চুক্তিতে তাই যুক্ত করা হয় ‘ভালো আচরণের’ শর্ত। মাঠে কিংবা মাঠের বাইরে বাগড়াবাজি করলেই শাস্তি হতে পারে।
অ্যান্টি-আর্সেনাল ধারা
লুইস সুয়ারেজকে ৪ কোটি ইউরোতে কেনার প্রস্তাব দিয়েছিল আর্সেনাল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লিভারপুল ছাড়েননি উরুগুইয়ান স্ট্রাইকার। তবে এরপর রবার্তো ফিরমিনোর চুক্তিতে বিশেষ ধারা যোগ করে লিভারপুল। আর্সেনাল ছাড়া অন্য কোনো আগ্রহী ক্লাব ফিরমিনোকে কিনতে চাইলে রিলিজ ক্লজ ৯ কোটি ৮০ লাখ ইউরো। আর আর্সেনাল কিনতে চাইলে ছিল আলাদা শর্ত।
বাড়ি চেয়েছিলেন, পেয়েছিলেন লেগো বাড়ি
জার্মান স্ট্রাইকার জিউসেপে রেইনা আর্মিনিয়া বিলেফেল্ডে যোগ দিয়ে দাবি করেন, চুক্তির প্রতিবছরের জন্য তাঁকে একটি করে বাড়ি দিতে হবে। কিন্তু বাড়ির ধরন কেমন হবে, তা চুক্তিতে লেখা ছিল না। ক্লাবও সুযোগটা কাজে লাগায়। প্রতিবছরের জন্য রেইনাকে দেওয়া হয় একটি করে লেগো দিয়ে তৈরি বাড়ি!
বিমানভীতি বার্গক্যাম্পের
ডেনিস বার্গক্যাম্প যে ক্লাবেই খেলেছেন, ইউরোপিয়ান টুর্নামেন্টে অনেক অ্যাওয়ে ম্যাচে যেতেন না। কারণ, চুক্তিতেই থাকত বিমানে ভ্রমণ না করার শর্ত। বিমানভীতির কারণে এই ডাচ স্ট্রাইকার এই ব্যবস্থা করেছিলেন।
ভেড়ার অণ্ডকোষ খেতে হতো
২০০১ সালে কার্ডিফে যোগ দেন স্পেনসার প্রায়র। ক্লাবটির সভাপতি স্যাম হামামের অদ্ভুত সব পছন্দের সঙ্গে দ্রুত পরিচিত হন এই ফুটবলার। লেবানিজ বংশোদ্ভূত হামামের খাবারের সংস্কৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে চুক্তিতে রাখা হয় বিশেষ শর্ত। প্রিয়রকে লেবুর রস ও পার্সলে সস দিয়ে রান্না করা ভেড়ার অণ্ডকোষ খেতে হবে!
লাল রঙের জুতা নিষিদ্ধ
২০১৫-১৬ মৌসুমে সেভিয়া শহরের ক্লাব রিয়াল বেতিসে খেলেছিলেন রাফায়েল ফন ডার ফার্ট। ফুটবল লিকসের ফাঁস করা নথিতে দেখা যায়, তাঁর চুক্তিতে ছিল অদ্ভুত এক শর্ত। যেকোনো ধরনের খেলার জুতা পরতে পারবেন, তবে সেটি লাল রঙের হওয়া চলবে না। বেতিস-সেভিয়া দ্বৈরথের উত্তাপ যে চুক্তিতেও পৌঁছেছিল!
ওজন বাড়লেই বেতন কাটবে
১.৮৮ মিটার উচ্চতার নিল রাডককের ওজন নিয়ে প্রিমিয়ার লিগে আলোচনা ছিল নিয়মিত। ২০০০ সালে ক্রিস্টাল প্যালেসে যোগ দেওয়ার পর কোচ হ্যারি রেডন্যাপ চুক্তিতে শর্ত রাখেন, ওজন ৯৮ কেজি ছাড়ালে বেতনের ১০ শতাংশ জরিমানা দিতে হবে। কয়েকবার সেই সীমা ছাড়িয়েছিলেন রাডকক। দ্য সান-এর খবর অনুযায়ী, একসময় ট্রাউজারই আর ফিট না হওয়ায় তাঁকে ছেড়ে দেয় ক্লাব!
স্ত্রীর রান্নার কোর্সের খরচ
কঙ্গোর ফুটবলার রলফ-ক্রিস্টেল গুইয়ে-মিয়েন কার্লসরুহেতে দুই মৌসুম কাটিয়ে আইনট্রাখট ফ্রাঙ্কফুর্টে যোগ দেন। নতুন ক্লাবের কাছে তাঁর আবদার ছিল, স্ত্রীর রান্নার কোর্সের খরচ দিতে হবে। ক্লাব রাজি হয়েছিল। ৪০ বছর বয়সেও জার্মান ফুটবলের পঞ্চম স্তরে খেলছেন তিনি।
স্কিইং, মোটরসাইকেল চালানো নিষেধ
২০১৪ সালে বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষের দিকে ছিল রবার্ট লেভানডভস্কির। রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। ফাঁস হওয়া চুক্তির নথিতে দেখা যায়, মৌসুমপ্রতি তাঁর মোট বেতন ৮৬ লাখ ৯ হাজার ৫৯০ ইউরো। সঙ্গে ১ কোটি ৯ লাখ ৫৭ হাজার ৬৫০ ইউরো সাইনিং বোনাস। বায়ার্ন মিউনিখের প্রস্তাবের চেয়ে অঙ্কটা বেশি ছিল। কিন্তু ডর্টমুন্ডের চুক্তিতে ছিল অদ্ভুত কিছু নিষেধাজ্ঞা। স্কিইং, মোটরসাইকেল চালানো ও স্কাইডাইভিংয়ের মতো ঝুঁকিপূর্ণ খেলায় অংশ নিতে পারবেন না তিনি। ইংলিশ সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, অ্যাডভেঞ্চারের নেশাই তাঁকে শেষ পর্যন্ত বায়ার্নের প্রস্তাব বেছে নিতে প্রভাবিত করে। সেখানে এমন নিষেধাজ্ঞা ছিল না।
বুলেটপ্রুফ গাড়ি চাই
২০২০ সালের জানুয়ারিতে ব্রাজিলের ক্লাব বোতাফোগোয় যোগ দেন জাপানের কেইসুকে হোন্ডা। রিও ডি জেনিরোর রাস্তাঘাট নিয়ে তাঁর ভয় ছিল। তাই চুক্তিতে চাইলেন বুলেটপ্রুফ বর্মযুক্ত গাড়ি। ক্লাবও রাজি হয়ে গেল।
বাবার জন্য ট্রাক্টর
২০১৭ সালের জুনে জুভেন্টাসের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করেন মোইজে কিন। নতুন চুক্তির মেয়াদ ছিল ২০২০ সাল পর্যন্ত। কিন্তু আলোচনার সবচেয়ে কঠিন জায়গাটি ছিল অন্য। কিনের বাবা বিয়োরু কিন জুভেন্টাসের কাছে একটি ট্রাক্টর চেয়েছিলেন। আইভরি কোস্টের এই নাগরিকের দাবি, ২০১৭ সালের শুরুর দিকে ক্লাব তাঁকে কৃষিকাজের যন্ত্রপাতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু বাজেটের সীমাবদ্ধতায় শেষ পর্যন্ত সেই চুক্তি আর বাস্তবায়িত হয়নি।