বিশ্বকাপ ফাইনাল: অলৌকিক আর্জেন্টিনা, না সম্মোহনী স্পেন
পাঁচ সপ্তাহের কিছু বেশি সময় আগে মেক্সিকো সিটিতে যখন এই বিশ্বকাপের প্রথম বাঁশি বেজেছিল, তখন পৃথিবীর ৪৮টি দেশের অন্তত গোটা দশেক তো বিশ্বাস করেছিল, ট্রফিটা তাদের হাতেও উঠতে পারে। তারপর হাজার হাজার কিলোমিটার রাস্তা, প্রায় ১০ হাজার মিনিটের নাটক শেষে গল্পটি এসে থেমেছে মাত্র ৯০ মিনিটের শেষ পর্বে।
সব কিংবদন্তিরই কি একটা মুহূর্ত আসে, যখন তাঁকে নিজের প্রতিচ্ছবির সামনে দাঁড়াতে হয়?
কখনো সেই প্রতিচ্ছবি আয়নায় দেখা যায়, কখনো দেখা যায় অন্য কোনো মানুষের মধ্যে। আজ মেটলাইফ স্টেডিয়ামে হয়তো লিওনেল মেসি ঠিক সেটাই দেখবেন। নিজের অতীত নয়, ভবিষ্যৎ। লামিনে ইয়ামাল।
ফুটবলের সবচেয়ে নিষ্ঠুর সত্য সম্ভবত এটাই—এক কিংবদন্তির বিদায় আরেক কিংবদন্তির জন্মের জন্যই জায়গা করে দেয়। আজ পুরো পৃথিবী তাকিয়ে থাকবে এটা দেখার জন্য, মেসির উত্তরাধিকারে পরবর্তী নামটি সত্যিই ইয়ামাল কি না।
কিন্তু উত্তরাধিকার কখনো ঘোষণা দিয়ে আসে না, অর্জন করে নিতে হয়। কখনো কখনো বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচে।
পাঁচ সপ্তাহের কিছু বেশি সময় আগে মেক্সিকো সিটিতে যখন এই বিশ্বকাপের প্রথম বাঁশি বেজেছিল, তখন পৃথিবীর ৪৮টি দেশের অন্তত গোটা দশেক তো বিশ্বাস করেছিল, ট্রফিটা তাদের হাতেও উঠতে পারে। তারপর হাজার হাজার কিলোমিটার রাস্তা, প্রায় ১০ হাজার মিনিটের নাটক শেষে গল্পটি এসে থেমেছে মাত্র ৯০ মিনিটের শেষ পর্বে।
এখন আর কোনো ভিড় নেই। এখন আছে শুধু দুটি নাম—আর্জেন্টিনা ও স্পেন। একদিকে লাতিন আবেগ, অন্যদিকে ইউরোপীয় শৃঙ্খলা। একদিকে মুকুট রক্ষার যুদ্ধ, অন্যদিকে নতুন সাম্রাজ্য গড়ার স্বপ্ন। এই দুইয়ের মাঝখানে এক কিংবদন্তি ও তাঁর প্রতিচ্ছবি। মেসি ও ইয়ামাল।
কী কাকতাল, ১৯ বছর আগে ইউনিসেফের এক প্রচারণামূলক ফটোশুটে শিশু ইয়ামালকে কোলে নিয়েছিলেন মেসি। আজ তাঁরাই বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি। ফুটবল কখনো কখনো গল্প লেখে না, গল্প হয়ে যায়।
এই বিশ্বকাপে স্পেনের গল্পটা যেন নিখুঁতভাবে লেখা এক সিম্ফনি। শুরুতে হোঁচট, কেপ ভার্দের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র। তারপর ধীরে ধীরে তাল ঠিক করা। সৌদি আরবের বিপক্ষে ঝড় বইয়ে দেওয়া। উরুগুয়ের বিপক্ষে ধৈর্য। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আধিপত্য।
পর্তুগালের বিপক্ষে শেষ মিনিটের নাটক। এরপর সেমিফাইনালে শুধু ফ্রান্সকে হারানো নয়, তাদের দমবন্ধ করে দেওয়া। এমবাপ্পে–দেম্বেলে–ওলিসে—গতিময় এই ত্রয়ী যেন রদ্রির চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে নিজেদেরই ছায়া তাড়া করছিলেন।
স্পেনের ফুটবলকে শুধু ‘পজেশন ফুটবল’ বললে ভুল হবে। এটি আসলে একধরনের সম্মোহন। রদ্রি মাঝমাঠে যেন এক দক্ষ ট্রাফিক কন্ট্রোলার। কোথায় গতি বাড়বে, কোথায় খেলা থামবে, কখন চাপ বাড়াতে হবে—সব যেন তাঁর মাথার ভেতরে আগে থেকেই লেখা।
আর আর্জেন্টিনা? ওটা অন্য বই, একেবারেই অন্য বই। যে বইয়ের পাতায় পাতায় ঘাম, রক্ত আর শেষ মুহূর্তের অলৌকিকতা। এবং মেসি!
গ্রুপ পর্বে সবকিছু সহজই ছিল। আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া, জর্ডান—প্রতিপক্ষদের সামনে লিওনেল মেসি যেন বহু বছর আগের সেই তরুণ জাদুকর। তিন ম্যাচেই আর্জেন্টিনা বুঝিয়ে দিয়েছিল, নকআউট পর্যন্ত তাদের পথ খুব একটা কঠিন নয়।
তারপর পৃথিবী বদলে গেল। কেপ ভার্দে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেল। মিসরের বিপক্ষে ৭৯ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকে নাটকীয় জয়। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে বারবার বিপদের মুখে পড়েও শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকা।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আবারও খাদের খুব কাছ থেকে ফিরে আসা। সবকিছুর মূলে আসলে সেই একটাই মানুষ। এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত তাঁর ৮ গোল, ৪ অ্যাসিস্ট। আর্জেন্টিনার ১৯ গোলের ১২টিতেই তাঁর সরাসরি অবদান। সংখ্যাগুলো বিস্ময়কর, কিন্তু সংখ্যাও মেসির গল্পের পুরোটা বলতে পারে না।
কারণ, মেসি কখনো শুধুই পরিসংখ্যান ছিলেন না, ছিলেন সময় নিয়ন্ত্রণের শিল্পী। কখন হাঁটবেন, কখন নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকবেন, কখন হঠাৎ গতি বাড়িয়ে পাঁচজনকে পেছনে ফেলে দেবেন, সেটা তিনি ছাড়া আর কেউ জানে না।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে ১০টি সফল ড্রিবল করেছেন, এই বিশ্বকাপে এক ম্যাচে যা সর্বোচ্চ। অথচ ম্যাচের অনেকটা সময় তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি যেন খেলার বাইরে। এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় ভেলকি। জাদুকর কখনো সারাক্ষণ জাদু দেখান না। তিনি অপেক্ষা করেন। ঠিক সেই মুহূর্তের জন্য, যখন সবাই বিশ্বাস করতে শুরু করে, আজ হয়তো কিছুই ঘটবে না, তখন তিনি টুপি খুলে বের করেন সেই খরগোশ!
এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা কখনোই স্পেনের মতো নিখুঁত ছিল না। তারা অসম্পূর্ণ, কিন্তু অসম্ভব রকম জেদিও। তাদের ১৯ গোলের ১২টিই এসেছে ৭৫ মিনিটের পর; অর্থাৎ অন্য দল যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, আর্জেন্টিনা ঠিক তখনই ম্যাচ শুরু করে। আর্জেন্টিনা শেষের আগে কখনো শেষ ভাবে না।
ম্যাচের ফল হয়তো কৌশলে ঠিক হবে না, হবে সাহসে। হয়তো স্পেন বল দখলে রাখবে, হয়তো আর্জেন্টিনা অপেক্ষা করবে।
আজকের ফাইনাল তাই আসলে নিয়ন্ত্রণ বনাম বিশ্বাসের লড়াই। স্পেন বিশ্বাস করে, খেলার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখো, ম্যাচ তোমার হয়ে যাবে। আর্জেন্টিনা বিশ্বাস করে, ম্যাচ কখনো শেষ হয় না, যতক্ষণ না শেষ বাঁশি বাজে। একটি দল প্রতিপক্ষকে শ্বাস নিতে দেয় না। অন্যটি শ্বাস বন্ধ হয়ে আসার পরও বেঁচে থাকে। বিশ্বকাপের সবচেয়ে দারুণ ব্যাপার এটাই। এর ইতিহাস কখনোই বলে না, কোন দর্শনটি শেষ পর্যন্ত জিতবে। সে শুধু অপেক্ষা করে, দেখবে বলে।
আর্জেন্টিনা ও স্পেন এর আগে ১৪ বার মুখোমুখি হয়েছে, ৬টি করে জয় দুই দলের। বিশ্বকাপে একমাত্র দেখা ১৯৬৬ সালে, ২-১ গোলে জিতেছিল আর্জেন্টিনা। অদ্ভুতভাবে বার্সেলোনায় দুই দশকের জীবনে মেসি স্পেন জাতীয় দলের বিপক্ষে খেলেছেন মাত্র তিনবার। যে দেশ একসময় তাঁকে নিজেদের হয়ে খেলাতে চেয়েছিল, সেই দেশের বিপক্ষেই তিনি শেষবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে দাঁড়াবেন।
শেষ পর্যন্ত এ ম্যাচের ফল হয়তো কৌশলে ঠিক হবে না, হবে সাহসে। হয়তো স্পেন বল দখলে রাখবে, হয়তো আর্জেন্টিনা অপেক্ষা করবে। হয়তো রদ্রি পুরো মাঝমাঠ শাসন করবেন। হয়তো ইয়ামাল আবারও কোনো ডিফেন্ডারকে বসিয়ে দেবেন। হয়তো মেসি হঠাৎই এমন একটি পাস দেবেন, যা টেলিভিশনের ক্যামেরাও আগে থেকে কল্পনা করতে পারবে না অথবা হয়তো সব পূর্বাভাসই ভুল প্রমাণিত হবে।
কারণ, বিশ্বকাপের ফাইনাল কখনো ভবিষ্যদ্বাণী মেনে চলে না। বিশ্বকাপ নিজের গল্প নিজেই লেখে। মেটলাইফের এই ফাইনালের পর কেউ হয়তো আকাশের দিকে দুই হাত তুলবেন, কেউ হাঁটু গেড়ে বসে পড়বেন। কেউ কাঁদবেন, কেউ হাসবেন।
আর ফুটবল? সে আবারও প্রমাণ করবে, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো হয়তো কাগজে লেখা হয় না, লেখা হয় সবুজ ঘাসের ওপর।