ইয়ামালদের যেভাবে চমকে দিতে চান কোর্তোয়ারা
একটা দল গত তিন বিশ্বকাপের দুটিতেই অন্তত কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত গেছে। আরেক দল সেই তিন বিশ্বকাপের দুটিতেই বিদায় নিয়েছে গ্রুপ পর্ব থেকে, আরেকবার শেষ ১৬ থেকে। এই দুই দল মুখোমুখি হলে আপনি কাকে ফেবারিট বলবেন?
খুব বেশি চিন্তাভাবনা না করেই প্রথম দলের পক্ষে মত দিয়ে ফেলতে পারেন। কিন্তু আপনি যখন জানবেন প্রথম দলটার নাম বেলজিয়াম এবং পরেরটি স্পেন, উত্তরটা এবার বদলে ফেলতে চাইতে পারেন। স্পেন এখন ফুটবলের পরাশক্তি, এবারের বিশ্বকাপে এসেছে অন্যতম ফেবারিট হিসেবে। অন্যদিকে বেলজিয়ামের জন্য এবার শেষ আট পর্যন্ত আসাটাই একটা চমক।
স্পেন এই বিশ্বকাপে যেসব বাধা পার হয়েছে, তাতে শেষ আটে আজকের বেলজিয়াম–পরীক্ষা খুব কঠিন হওয়ার কথা নয়। কেপ ভার্দের গোলশূন্য ড্রটাই ছিল তাদের একমাত্র হোঁচট। প্রথম ম্যাচের পর তারা ছুটছে দুর্দান্ত গতিতে। জিতেছে পরের সব ম্যাচেই। তবে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলকে বেশি আত্মবিশ্বাস দেবে শেষ ১৬-তে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালকে হারানো। সে জন্য অবশ্য তাদের ম্যাচের শেষ সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।
তবে স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি অবশ্যই তাদের রক্ষণ। এই বিশ্বকাপের একমাত্র দল হিসেবে তারা এখন পর্যন্ত কোনো গোল হজম করেনি। বিশ্বকাপের ইতিহাসেই নিজেদের প্রথম ছয় ম্যাচে গোল না খাওয়া প্রথম দল স্পেন। আর এমনও নয় যে স্পেন গোলকিপার উনাই সিমনকে খুব কঠিন পরীক্ষাও দিতে হয়েছে। স্পেন দল হিসেবে এতটাই গোছানো, এই বিশ্বকাপে তাদের বিপক্ষে শটই হয়েছে ১৯টি, এর মধ্যে পোস্টে শট ছিল মাত্র ৬টি।
এটা ঠিক যে ২০২৪ ইউরোর সেই আনন্দদায়ী ফুটবল এখনো পুরোপুরি খেলতে পারেনি স্পেন, তবে রক্ষণ-আক্রমণ মিলে এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দল হয়তো তারাই। দলের মিডফিল্ডার দানি ওলমো বললেন তাদের এই খেলার রহস্যের কথা, ‘আমরা এমন একটি দল, যেখানে সবাই আক্রমণ করে এবং সবাই রক্ষণে সাহায্য করে। কোচ বলেন, দলের নাম্বার নাইন (স্ট্রাইকার) হলো প্রথম ডিফেন্ডার। এরপর বাকিরা তাকে অনুসরণ করে।’
স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের একটাই খচখচানি থাকবে, দলের আক্রমণটা এখনো সেরা ফর্মে আসেনি। লামিনে ইয়ামাল চোট থেকে ফেরার পর পুরো ছন্দে ফেরেননি। মূল ভরসা তাই এই বিশ্বকাপে এরই মধ্যে চার গোল করে ফেলা মিকেল ওয়াইরসাবাল। মধ্যমাঠে রদ্রি, পেদ্রি, ওলমোরা নিজেদের কাজ করে যাচ্ছেন ঠিকঠাক। কাজেই স্পেনকে থামানোটা বেলজিয়ামের জন্য কঠিন বললেও কম বলা হবে।
ম্যাচের আগে সেটা স্বীকার করে নিচ্ছেন বেলজিয়াম গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়াও, ‘স্পেন অবশ্যই ফেবারিট। তবে প্রতিটি টুর্নামেন্টেই চমক থাকে...চ্যাম্পিয়নস লিগ, ইউরোপা লিগ, বিশ্বকাপ—সব জায়গাতেই। সব সময়ই অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটে। আমার মনে হয় এবার আমরা সেই চমকের একটি হতে পারি। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নদের বিদায় করা অবশ্যই বড় একটি অঘটন হবে। তবে আমাদের আত্মবিশ্বাস আছে।’ দীর্ঘদিন স্পেনে খেলার সুবাদে কোর্তোয়ার দ্বিতীয় বাড়ি হয়ে গেছে দেশটি। প্রতিপক্ষের হাঁড়ির খবরগুলো তাঁরই ভালো দিতে পারার কথা।
এখন পর্যন্ত বেলজিয়াম যে চমকে দিতে পেরেছে, সে ব্যাপারে তর্কের কোনো সুযোগ নেই। অথচ ইরান ও মিসরের বিপক্ষে ড্র করার পর তাদের জন্য গ্রুপ পর্ব পেরোনোটাই ছিল কঠিন। গ্রুপের শেষ ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে উড়িয়ে দিলেও সেনেগালের বিপক্ষে শেষ ৩২–এ তাদের বিশ্বকাপ স্বপ্ন প্রায় ভেস্তেই যেতে বসেছিল। কিন্তু ৮৫ মিনিট পর্যন্ত পিছিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত তিন গোল করে বিশ্বকাপের সেরা প্রত্যাবর্তনের গল্পগুলোর একটিই লিখেছে রুডি গার্সিয়ার দল।
তবে বেলজিয়াম বড় চমকটা রেখেছিল শেষ ১৬–এর জন্য। যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ডোকু, ডি ব্রুইনা, লুকাকুবিহীন বেলজিয়াম যেন উড়িয়ে দিল স্বাগতিকদের! অথচ বালোগানের লাল কার্ড নিয়ে সেই ম্যাচের আগে কম বিতর্ক হয়নি। ম্যাচের পর কোর্তোয়া যেমন মনে করিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের হালকাভাবে নিয়ে ভুল করেছে। স্পেনের অবশ্য আজ সেই ভুল না করারই কথা।
বেলজিয়াম সর্বশেষ ১১ ম্যাচে স্পেনকে হারাতে পারেনি। অবশ্য এর মধ্যে একটা ম্যাচ আছে, যেটি ‘কাগজে–কলমে’ ড্র হলেও টাইব্রেকারে জিতেছিল বেলজিয়াম। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে সেই হারটা স্পেনের হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাবে অনেক দিন। যদিও ১৯৯০ বিশ্বকাপে বেলজিয়ামকে হারিয়ে সেই হারের শোধ নিয়েছিল স্পেন।
স্পেন কোচ দে লা ফুয়েন্তের সামনে অন্য একটা হাতছানিও আছে আজ। ইউরোর পর বিশ্বকাপের নকআউটেও এখন পর্যন্ত অপরাজিত তাঁর দল। বড় আসরের নকআউটে প্রথম সাত ম্যাচেই জেতার রেকর্ড ইতিহাসে আছে মাত্র দুজনের। ইতালির ভিত্তোরিয়া পোজ্জো (১৯৩৪-৩৮) ও দে লা ফুয়েন্তেরই আরেক পূর্বসূরি সাবেক স্পেন কোচ ভিসেন্তে দে বস্ক (২০১০-১২)। সব মিলে গত ৩৫ ম্যাচে অপরাজিত তাঁর দল।
বেলজিয়ামের সামনে আজ অগ্নিপরীক্ষা বললেও কি কম বলা হবে না?