অন্ধ সমালোচকেরা বিশ্বকাপের আনন্দ নিতে পারেননি, দাবি ইনফান্তিনোর
বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেছে সপ্তাহখানেকের বেশি হয়ে গেল। ১৬ বছর পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বসেরার ট্রফি পেয়েছে স্পেন। কিন্তু টুর্নামেন্ট ঘিরে বিতর্কের মেঘ যেন কিছুতেই কাটছে না।
এবার সব সমালোচনার তীব্র জবাব দিলেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। মাঠের বাইরের বিতর্ক, সমালোচকদের তোপ আর বিষোদ্গার—সবকিছুর জবাবে সোমবার এক খোলা চিঠিতে ক্ষোভ আর বিরক্তি উগরে দিয়েছেন ৫৬ বছর বয়সী এই ক্রীড়া প্রশাসক। সমালোচকদের তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে তিনি বলেছেন, তাঁরা শুধু বিদ্বেষ আর মিথ্যা গল্প ছড়িয়েছেন, অথচ কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী যে আনন্দের মহাযজ্ঞে মেতেছিলেন, তা তাঁরা দেখতেই পাননি।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে সদ্য সমাপ্ত এই বিশ্বকাপকে শতভাগ নিরাপদ, আনন্দময় ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ইনফান্তিনো। একই সঙ্গে সমালোচকদের দিকে তির ছুড়ে লিখেছেন, ‘আপনারা সমালোচনা আর ঘৃণায় এতটাই অন্ধ হয়ে ছিলেন যে ফুটবল উৎসবের আসল আনন্দটাই মিস করে গেছেন।’
সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সমালোচকদের সরাসরি নিশানা করে ফিফাপ্রধান লিখেছেন, ‘আপনারা যাঁরা কাগজ-কলমের পেছনে, পর্দার পেছনে বসে ঘৃণা আর মিথ্যা গুজব ছড়িয়েছেন, তাঁদের উদ্দেশে বলতে চাই, আপনারা যখন পেছনে বসে ছিলেন, আমরা ফিফায় থেকে তখন একদম সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে বিশ্বের সেরা শো আয়োজন করেছি।’ ইনফান্তিনো দাবি করেন, পুরো টুর্নামেন্টে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা কিংবা সহিংসতা ঘটেনি। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা শতভাগ নিরাপত্তা বজায় রাখতে পেরেছি। কোনো সহিংসতা ছিল না, ছিল কেবল অনাবিল আনন্দ আর উল্লাস!’
বিশ্বকাপ চলাকালে নানা বিষয়ে ফিফাকে তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। কয়েকটি দেশের দর্শক ও কর্মকর্তাদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বিধিনিষেধ এবং রাজনৈতিক উত্তেজনায় থাকা দলগুলোর অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছিল মার্কিন ফুটবলার ফোলারিন বালোগানের শাস্তির ঘটনা নিয়ে। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে লাল কার্ড পাওয়ার পর তাঁর ওপর যে এক ম্যাচের স্বাভাবিক নিষেধাজ্ঞা আসার কথা ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের পর ফিফা সেই সিদ্ধান্ত স্থগিত করে। এ ছাড়া আর্জেন্টিনা ও মিসরের মধ্যকার ম্যাচে রেফারির বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে তুমুল শোরগোল পড়ে।
সুনির্দিষ্ট কোনো ঘটনার কথা সরাসরি উল্লেখ না করলেও শৃঙ্খলাজনিত এসব সিদ্ধান্তকে স্বাভাবিক ফুটবল প্রক্রিয়ার অংশ বলে দাবি করেছেন ইনফান্তিনো। তাঁর মতে, বিশ্বজুড়ে শীর্ষ ফুটবল লিগগুলোতে এমন ঘটনা নিয়মিতই ঘটে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি লেখেন, ‘সম্ভাব্য ভুল লাল বা হলুদ কার্ড, কিংবা কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে খেলোয়াড়কে নিষিদ্ধ না করার মতো সিদ্ধান্তগুলো বিশ্বের বড় বড় লিগে অহরহ ঘটে এবং তা সবাই মেনেও নেয়। কিন্তু আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, যে দেশগুলোতে এই নিয়মগুলো নিয়মিত চর্চা করা হয়, তারাই এখন এখানে এসে সমালোচনা করছে!’
ভিসা বিতর্কের জল গড়িয়েছিল ইরান, হাইতি এবং ডিআর কঙ্গোর মতো দেশগুলোকে ঘিরে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সত্ত্বেও ইরান দল বিশ্বকাপে অংশ নেয়। তবে অন্যদিকে বৈধ ভিসা থাকা সত্ত্বেও সোমালিয়ার বিশ্বকাপ রেফারি ওমর আবদুলকাদির আরতানকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। অভ্যন্তরীণ সংকট ও ইবোলা প্রাদুর্ভাবের কারণে কঙ্গোর যাতায়াত নিষেধাজ্ঞার খবরও বেশ চাউর হয়েছিল।
রাজনৈতিক টানাপোড়েন পেছনে ফেলে ফুটবল কীভাবে সব বিভেদ ভুলে ঐক্যের সুর বাধে, তার সপক্ষে যুক্তি দিয়ে ইনফান্তিনো বলেন, ‘ইরান কোনো ঝামেলা বা সংঘাত ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রে এসেছে এবং খেলেছে। ইরান দল ভিসা পেয়েছে, কারণ ফুটবল শান্তির প্রতীক, এটি রাজনীতির জায়গা নয়। তীব্র স্বাস্থ্যঝুঁকি ও রাজনৈতিক সংকটে থাকা দেশগুলোকেও ভিসা দেওয়া হয়েছিল।’
হাইতির অংশগ্রহণের বিষয়টি আলাদাভাবে মনে করিয়ে দিয়ে সমালোচকদের শ্রদ্ধাশীল হওয়ার আহ্বান জানান ফিফা সভাপতি, ‘ফুটবল যখন হাইতির মতো একটি দেশকে বিশ্বমঞ্চে তুলে আনল—যে দেশে অনেকেই যেতে চান না বা যেতে পারেন না, তখন হয়তো আপনাদের সময় এসেছে হাতে থাকা কলম আর কি–বোর্ডগুলো একটু একপাশে সরিয়ে রেখে মাঠে লড়াই করা দলগুলোর প্রতি অন্তত কিছুটা সম্মান প্রদর্শন করার।’