হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে মার্কিন পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণেও বেঁচে যাওয়া মানুষদের জাপানি ভাষায় বলা হয় ‘হিবাকুশা’। তবে অ্যাডলফ হিটলারের গ্যাস চেম্বার থেকে প্রাণ নিয়ে বেঁচে ফেরা ব্যক্তিদের আলাদা কোনো নাম ছিল না। কিন্তু তাঁদের জীবনও ছিল হিবাকুশাদের মতোই। আর বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতাও ভয়াবহ। আসলে গত শতাব্দীর ভয়াবহতম সময়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পুরো মানবজাতিই যেন হিবাকুশাদের মতো নতুন এক অভিজ্ঞতা নিয়ে বাঁচতে শুরু করে। জীবনের এক পিঠে বেঁচে থাকার স্বস্তি, অন্য পিঠে সেই বেঁচে থাকারই ভয়াল অভিজ্ঞতা। আরও ছিল ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা।

রাশিয়ার পরে চীনেও শুরু হয় মাও সে-তুংয়ের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক শাসন। ভারতবর্ষে আসে স্বাধীনতা। শুরু হয় রুশ-মার্কিন শীতল যুদ্ধ। এশিয়ার মতো আফ্রিকার কলোনিগুলোও স্বাধীনতার তাড়নায় লড়াইয়ে যেতে শুরু করে। এসবই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের প্রভাব।

শতাব্দীর একেবারে মাঝের বছরটি হাজির হয় নতুন দুনিয়া শুরুর সব উপাদান নিয়ে। তবে সব ছাপিয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় ব্রাজিলে মঞ্চস্থ হওয়া বিশ্বকাপ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে এক যুগের অপেক্ষার অবসান ঘটানো এক বিশ্বকাপ।ব্রাজিলিয়ানদের বেদনায় নীল হওয়ার বিশ্বকাপ। শুধু কি তা-ই, ভারতের খালি পায়ে খেলতে না চাওয়ার গুজব ছড়ানো এক আসরও ছিল সেই বিশ্বকাপ।

ব্রাজিল ও জার্মানি ১৯৪২ সালে বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে আয়োজক হওয়া দূরের কথা, জার্মানিকে ১৯৫০ বিশ্বকাপে খেলতেই দেওয়া হয়নি। স্বাগতিক হওয়ায় সরাসরি চূড়ান্ত পর্ব খেলে ব্রাজিল আর হিটলারের সহচর হয়েও আগের টুর্নামেন্ট জেতায় ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে খেলে ইতালি। অবশ্য বেচারাদের কপাল খারাপ, টুর্নামেন্ট শুরুর বছরখানেক আগে এক বিমান দুর্ঘটনায় বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় মারা যাওয়ায় ব্রাজিলে জাহাজে চেপে গিয়েছিল ইতালি দল।

সেবার কোয়ালিফাইং রাউন্ডের পর মূল প্রতিযোগিতায় কে খেলবে, কে খেলবে না, তা নিয়ে রীতিমতো তালগোল লেগে যায়। যুদ্ধ শেষ হয়েছে, নানা মতবাদে তখন ধুন্ধুমার ছিল পৃথিবী। এসবের মধ্যেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আগের দুই আসরের ফাইনালিস্ট, দুই সমাজতান্ত্রিক দেশ চেকোস্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরি খেললই না। খেলেনি অস্ট্রিয়া ও বেলজিয়ামও। ফলে ইউরোপ থেকে সুযোগ পায় তুরস্ক ও সুইজারল্যান্ড। আর প্রথমবারের মতো ব্রিটিশদের মনে হলো, বিশ্বকাপটা তাদের খেলার মতো যথেষ্ট কুলীন হয়েছে। বাছাইপর্ব শেষে মূল পর্বে খেলে ইংল্যান্ড। আর সেই বাছাইপর্বে প্রথম না হয়ে দ্বিতীয় হওয়ায় রাগ করে খেলেনি স্কটল্যান্ড।

এশিয়ায়ও ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও বার্মা না খেলায় সরাসরি সুযোগ পায় ভারত। ১৯৫০ বিশ্বকাপ নিয়ে একটি প্রচলিত কথা হলো, খালি পায়ে না খেলতে দেওয়ায় রাগ করে সেই টুর্নামেন্টে অংশ নেয়নি ভারত। এই কথা সত্য না, একটা গল্পমাত্র। শুধু ভারত নয়, তুরস্কও শেষ মুহূর্তে বিশ্বকাপে অংশ নেয়নি। ফ্রান্সও রাজি হয়ে শেষ মুহূর্তে পিছুটান দেয়। বিশ্বকাপ পরিণত হয় ১৩ দলের টুর্নামেন্টে।

বিশ্বকাপ ও তখনকার ভারতীয় ফুটবল

বিশ্বকাপ নিয়ে আলোচনার আগে অতিসংক্ষেপে সেই সময়ের ভারতীয় ফুটবলে একবার তাকানো যায়। অধিনায়ক শৈলেন মান্নার নিজের জবানি ও ঐতিহাসিকদের কাজের সুবাদে জানা যায়, ভারত আসলে ১৯৫০ বিশ্বকাপকে অলিম্পিকের মতো গুরুত্ব দেয়নি। আর সুদূর ব্রাজিলে গিয়ে খেলার মতো আগ্রহ ছিল না ভারতের।

ভারতীয় ফুটবল নিয়ে আলোচনায় ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগানের নাম অবধারিতভাবেই উঠে আসবে। এই দুটি ক্লাবের ঐতিহাসিক গুরুত্বও ছোট পরিসরে বোঝানো প্রায় অসম্ভব। তৎকালীন পূর্ববঙ্গ থেকে যাওয়া মানুষেরা এই ইস্টবেঙ্গলকে কেন্দ্র করেই নিজেদের আত্মপরিচয় খোঁজেন। শরণার্থীশিবিরে মানবেতর জীবন, আধপেটা খাওয়া, মাথার ওপর ছাদ না থাকাদের দল এই ফুটবল ক্লাবকে ঘিরেই নিজেদের টিকিয়ে রাখার রসদ পেয়েছিল। ‘বাঙাল’ আর ইস্টবেঙ্গলের এমন প্রাণরসায়ন পৃথিবীর বহু প্রান্তে দেখা যায় (অন্যতম দুটি উদাহরণ: ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম সেরা বই, গত শতাব্দীর অন্যতম সেরা দার্শনিক সিএল আর জেমসের ‘বিয়ন্ড আ বাউন্ডারি’তে কালো মানুষ আর ক্রিকেটকে ঘিরে লড়াইয়ের গল্প। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ইপি থম্পসন দেখান, বাস্তু ছেড়ে শহরে যেতে বাধ্য হওয়া শ্রমিকশ্রেণি নিজেদের আত্মপরিচয় খুঁজে পান ফুটবল ক্লাবগুলো ঘিরে)।

তবে এই রোমান্টিকতার মধ্যেও মনে রাখা জরুরি, দিন শেষে দুই দলের বেশির ভাগ খেলোয়াড় ও সমর্থকই সহমর্মিতা এবং সহাবস্থানে বিশ্বাস করতেন। শত্রুতার আবহের বাইরে মোটাদাগে মৈত্রী ছিলই।

ঘটি আর বাঙালের কাহিনি এ অঞ্চলের জন্য অতিগুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর মধ্যে আরেকটি ক্লাবের গল্প উপেক্ষা করা গুরুতর অন্যায় হবে। ক্লাবটি মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব। আর এই ক্লাবের গল্পটা বললেই চলে আসে মোহাম্মদ সেলিমের নাম।
কলকাতার তথাকথিত বেঙ্গল রেনেসাঁয় মুসলমানদের ‘আদার’ হিসেবে দেখানোর যে চেষ্টা, তার বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদের প্রতীক মোহামেডান। যে সময় মুসলমানরা নিজেদের আত্মপরিচয়ের বিষয়ে সবচেয়ে সোচ্চার হয়। সেই ৩০-এর দশকে ফুটবল আর ক্রিকেটে এর আশ্চর্য প্রতিফলন পড়ে। মোহামেডান টানা পাঁচবার কলকাতা লিগে চ্যাম্পিয়ন হয়, অন্যদিকে ঔপনিবেশিক ভারতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট—বোম্বে কোয়াড্রাংগুলার—যেখানে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে দল গড়া হতো, তাতে ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৯ এই ছয় বছরে পাঁচবারই মুসলিম দলটি চ্যাম্পিয়ন হয়।

সেই সময়ের মোহামেডান দলকে নিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম লিখলেন—

‘এই ভারতের অবনত শিরে তোমরা পরালে তাজ
সুযোগ পাইলে শক্তিতে মোরা অজেয়, দেখালে আজ।’

কবি গোলাম মোস্তফা লিগ বিজয় নিয়ে লেখেন:

‘নয় রে নয় এ লীগ বিজয়—
আজকে মোদের দিগ্বিজয়
কিসের বাধা, কিসের ভয়?
বুক ফুলিয়ে বলরে সবাই—
জয় মোহামেডানের জয়।’

এই গান নিয়ে আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠে গ্রামোফোন কোম্পানির রেকর্ড বিপুল পরিমাণে বিক্রি হয়, মুসলমানদের ঘরে ঘরে শোভা পেত মোহামেডানের খেলোয়াড় আর ট্রফির ছবি। এমনকি রোজার দিনে ক্লাব চত্বরে গণহারে নামাজ পড়া হতো।

কিন্তু বাংলার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইএফআইয়ের অন্যায্য আচরণের শিকার হয়ে মোহামেডান তাদের বয়কট করে। এতে সঙ্গী হয় ইস্টবেঙ্গলও। ইতিহাসের সেই অস্থির সময়ে, দুটো ‘উপেক্ষিত’ শ্রেণির চ্যাম্পিয়ন দল এককাট্টা হয়। ঔপনিবেশিক প্রভুদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই আন্তলড়াইটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। পরে দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গে কমিউনিস্টদের উত্থানের পেছনে এই সম্প্রীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সে এক লম্বা গল্প। আপাতত পশ্চিম বাংলার ফুটবলের গল্পটা শেষ করা যায়, ভারতের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় মোহাম্মদ সেলিমকে দিয়ে।

কলকাতার মেটিয়াবুরুজে জন্ম নেওয়া সেলিম কেবল মোহামেডানকে সে যুগের সেরা বানিয়েছিলেন, তা-ই নয়, মাতিয়েছিলেন ব্রিটেন তথা ইউরোপের অন্যতম সেরা ক্লাব সেল্টিকও। তবে তাঁর জাদুতে মোহিত স্কটিশরা এই ‘ইন্ডিয়ান জাগলার’কে বড় অঙ্কের চুক্তির প্রস্তাব দিলেও সেলিম দেশে ফিরে আসেন। এমনকি তাঁর জন্যই আয়োজন করা এক প্রদর্শনী ম্যাচ থেকে পাওয়া ১ হাজার ৮০০ পাউন্ডও দান করে দেন স্কটিশ এতিম শিশুদের। (টাকাটা কত বেশি, সেটা বোঝা যায় এই তথ্যে যে সে বছর ব্রিটেনে গড় আয় ছিল বছরে ১৩০ পাউন্ডের মতো)।

শুধু তা-ই নয়, সে সময় জার্মানি থেকেও সেলিমের কাছে প্রস্তাব আসে। সেগুলোও প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকের মতে, বাঙালি মুসলমান সেলিম বুঝতে পেরেছিলেন যে হিটলারের জার্মানিতে ইহুদিরা তাঁর মতোই ঘৃণার শিকার হচ্ছে। ফলে তিনি সেখানে যাবেন না, বরং ভারতে ফিরে এসে এই বার্তা দেবেন যে খালি পায়ে, সাহেবদের মাঠে গিয়েও বাঙালি তাদের টক্কর দিতে পারে। হিটলারের দেশের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যানের কারণ কতটা সত্যি, তা বলা কঠিন। কিন্তু গত প্রায় ১০০ বছর সেলিম নিজের দেশে প্রত্যাখ্যাত হয়ে রইলেন। সাম্প্রদায়িকতার চোরাস্রোতে তাঁর নাম ভেসে গেল। যেমনটা আমরা দেখি ভারতীয় ক্রিকেটের প্রথম সুপারস্টার পালওয়াংকার বালুর বেলায়। কেবল নমশূদ্রের সন্তান হওয়ায় তাঁর নামে যথাযোগ্য বেদি তৈরি হয়নি।
ফিরে যাওয়া যাক ১৯৫০ বিশ্বকাপের গল্পে।

শুরু হলো বিশ্বকাপ

নতুন দুনিয়ায় প্রথমবারের মতো ফুটবলে ব্যবসার একটা নজির দেখা গেল। বিশ্বকাপের সংস্করণেও এর প্রভাব পড়ল।

আয়োজকেরা স্টেডিয়াম ও কাঠামো নির্মাণের খরচ উঠিয়ে আনার জন্য মরিয়া হয়ে ছিলেন বলে শুরু থেকে চলে আসা নকআউট পর্বের নিয়ম উঠে গেল, বাড়ল খেলার সংখ্যা। দলগুলোকে চারটি গ্রুপে ভাগ করা হলো। আর এত কাণ্ডকীর্তির ফলে আগের দুই আসরের ১৬টি করে খেলার বদলে এবার খেলার সংখ্যা হলো ৩০। শুধু তা-ই নয়, প্রতিটি দলের অন্তত তিনটি ম্যাচ খেলার সুযোগ থাকায় দলগুলোর এত লম্বা ভ্রমণ কেবল এক খেলাতেই সীমাবদ্ধ থাকার সুযোগ রইল না।

চিলির সঙ্গে প্রথম ম্যাচটি ইংল্যান্ড জিতলেও দ্বিতীয় ম্যাচে হারে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে! সে ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের জয়ের কৃতিত্ব এক কৃষ্ণাঙ্গের। হাইতি থেকে আসা শরণার্থী ল্যারি গেটজিন্সের ৩৮ মিনিটের গোলে ইংল্যান্ড হেরে যায়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে ব্যাপারটা এত আশ্চর্যের ছিল যে তারা সংবাদ ছেপেছিল ইংল্যান্ড আসলে ১০-১ গোলে জিতেছে কিন্তু টেলিগ্রাফের ভুলে সেটিকে ০-১ মনে হচ্ছে। সেদিন খেলায় ইংল্যান্ডের পক্ষে বাজির দর ছিল ৫০০: ১।

এরপরে ফ্রাঙ্কোর স্পেনের কাছেও হারে ইংল্যান্ড। সেদিন মারাকানায় একমাত্র গোলটি দেন তেলমো জারা। এরপর ব্রাজিলের খেলোয়াড়েরা স্পেনের ছেলেদের গুনে গুনে আধডজন গোল দেয়। তারপর ব্রাজিল সুইডেনকে হারায় ৭-১ গোলে। অন্যদিকে উরুগুয়ে সুইডেনকে ৩-২ গোলে হারালেও স্পেনের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করে। ফলে ১৬ জুলাই মারাকানার ফাইনালে ব্রাজিলের কেবল ড্র করলেই চলবে, এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়।

সেদিন পৃথিবীর ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি মানুষ মাঠে এসেছিল খেলা দেখতে। কেউ বলেন, সংখ্যাটা ১ লাখ ৯৯ হাজার আবার কেউ বলেন ২ লাখ ৫ হাজার। পুরো ব্রাজিল প্রস্তুত উৎসবের জন্য। ব্যতিব্যস্ত ফুটবল কর্তারা ব্রাজিল দলের প্রত্যেক খেলোয়াড়ের জন্য খেলার আগেই নিয়ে এলেন উপহার—স্বর্ণের ঘড়ি, যাতে খচিত ছিল ‘বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের জন্য’ শব্দগুলো। ৫ লাখের বেশি টি-শার্ট বিক্রি হয়, যেখানে ব্রাজিলের প্রথম বিশ্বজয়ের গল্প লেখা ছিল।

শিরোপা নিষ্পত্তির লড়াইয়ে ৪৭ মিনিটে ব্রাজিলকে এগিয়ে দেন ফ্রিয়াকা। ২০ মিনিট পর উরুগুয়েকে সমতায় ফেরান শিয়াফিনো আর ৭৯ মিনিটে উইং থেকে গোল করে গোটা দুনিয়াকে স্তব্ধ করে দেন আলসিদেস ঘিগিয়া। মারাকানা এতটাই নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল যে লাখ দুয়েক লোকের নিশ্বাসের শব্দও যেন পাওয়া যাচ্ছিল! লাখো মানুষ নিয়েও মাঠটা মুহূর্তেই হানাবাড়ি হয়ে যায়!

ব্রাজিলের সেই হারের জের টানতে হয় গোলকিপার মোয়াকির বারবোসা নাসিমেন্তোর। দারুণ ফুটওয়ার্ক আর আত্মবিশ্বাসী বারবোসা ছিলেন নিজের সময়ে সেরা গোলকিপারদের একজন। কিন্তু ফাইনালের দিন ডান প্রান্ত থেকে ঘিগিয়ার শটটা ধরতে গিয়ে তিনি শুয়ে পড়েন, হাত পিছলে বল জালে জড়িয়ে যায়। হৃদয় ভেঙে দেওয়া সেই গোলের সঙ্গে জড়িয়ে যায় তাঁর গোটা জীবন। ব্রাজিলিয়ানরা তাঁকে কখনো ক্ষমা করেনি। এমনকি ১৯৯৩ সালে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের খেলা চলার সময়ে ব্রাজিলের তৎকালীন খেলোয়াড়দের শুভকামনা জানাতে তাঁদের ট্রেনিং ক্যাম্পে গেলে, তাঁকে সেখানে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।

দীর্ঘ ২২ বছরের ক্যারিয়ারে সময়ের অন্যতম সেরা গোলকিপার হওয়া সত্ত্বেও গ্লাভস না পরে বেশির ভাগ সময় খালি হাতে কিপিং করা বারবোসার বাকি জীবন কাটে দারিদ্র্য আর বঞ্চনায়। সামান্য পেনশনের টাকায়, স্ত্রীর বোনের বাড়িতে থাকতেন। নিজের ৭৯তম জন্মদিনের ১০ দিন পর মারা যাওয়া বারবোসা পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘ব্রাজিলে যেকোনো অপরাধের শাস্তি সর্বোচ্চ ৩০ বছরের জেল। অথচ আমি কোনো অপরাধ না করেই ৪৩ বছর ধরে শাস্তি ভোগ করছি। বারবোসার ভাগ্য আসলে জাপানের সেই হিবাকুশাদের মতো—যাঁরা বিনা দোষে শাস্তি পেয়েছেন হিরোশিমা ও নাগাসাকির সেই পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণে।’

তবে গল্পের শেষ এখানেই নয়। সেদিন মারাকানায় খেলা ২২ জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দিন কে বেঁচেছিলেন জানেন? উরুগুয়ের জয়সূচক গোলদাতা আলসিদেস ঘিগিয়া। তাঁর মারা যাওয়ার তারিখটা ২০১৫ সালের ১৬ জুলাই—মারাকানার সেই ফাইনালের ৬৫ বছর পূর্তিতে!