সালাহর বিকল্প থেকে সুলিভানের ভবিষ্যৎ, ফুটবল বদলে দিচ্ছে এআই
মোহাম্মদ সালাহ লিভারপুল ছেড়ে গেছেন, তাঁর জায়গায় কে আসতে পারেন? ১৬ বছর বয়সী কাভান সুলিভান কি শারীরিকভাবে সমবয়সীদের চেয়ে এগিয়ে, নাকি পিছিয়ে? বড় হয়ে তাঁর শরীর কতটা বদলাতে পারে? হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পাওয়া একজন খেলোয়াড় কবে পুরোপুরি ফিট হয়ে মাঠে ফিরতে পারবেন?
প্রশ্নগুলো আলাদা। উত্তর খোঁজার প্রক্রিয়া ও ব্যক্তিরাও আলাদা। ক্লাবগুলোর স্কাউট, চিকিৎসক, বিশ্লেষক ও কোচদের এ নিয়ে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হয়। তবে এখন সেই কাজের অনেকটাই ঢুকে পড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) জগতে।
সালাহর মতো তারকার সম্ভাব্য বিকল্প খুঁজে দেওয়া, চোটের পর পেশির পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ, বয়সভিত্তিক ফুটবলারের শারীরিক বিকাশের পূর্বাভাস, অনুশীলন ও কাজের চাপ ব্যবস্থাপনা—এমনকি কৌশল নিয়েও ভাবতে শুরু করেছে এআই। ফুটবলে প্রযুক্তিটির ব্যবহার এখনো পুরোদমে চালু হয়নি, কিন্তু ক্রমেই বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়েছে।
সালাহর বিকল্প খুঁজবে এআই
ধরা যাক, লিভারপুলকে সালাহর বিকল্প খুঁজতে হবে। শুধু গোল করতে পারেন, এমন একজন খেলোয়াড় খুঁজলেই হবে না। নতুন কোচের অধীন দলের খেলার ধরন বদলালে নতুন খেলোয়াড়কে সেই কৌশলের সঙ্গেও মানিয়ে নিতে হবে।
এখানেই আসে মারকির মতো এআইভিত্তিক প্রযুক্তি। খেলোয়াড় নিয়োগে সহায়তাকারী এই প্ল্যাটফর্মের প্রতিষ্ঠাতা ডিন ব্রাখা গোল ডটকমকে সালাহর উদাহরণ দিয়েই বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর কথায়, সালাহ চলে যাচ্ছেন, তাই তাঁর জায়গায় কাদের নেওয়া যেতে পারে, সেই তালিকা তৈরি করা সম্ভব। পাশাপাশি দলের খেলার ধরন বদলালে সম্ভাব্য নতুন খেলোয়াড় সেই ব্যবস্থার সঙ্গে কতটা মানানসই, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া যায়।
ব্রাখা বলেছেন, বিভিন্ন ডেটা প্ল্যাটফর্মে আলাদা করে খোঁজার বদলে তাঁর প্রযুক্তি চ্যাটজিপিটির মতো অভিজ্ঞতা দিতে পারে। তবে এর পেছনে থাকবে মেশিন লার্নিং মডেল, যা থেকে পাওয়া যাবে নির্দিষ্ট চাহিদার সঙ্গে মানানসই ৫ বা ১০ জন খেলোয়াড়ের তালিকা।
ফুটবলে তথ্যের অভাব এখন আর সমস্যা নয়; বরং সমস্যা উল্টো। ব্রাখার মতে, গত এক দশকে এই খাত তথ্যের ঘাটতি থেকে ডেটার আধিক্যে পৌঁছেছে। বিভিন্ন কোম্পানি ও প্ল্যাটফর্মে এত বেশি তথ্য আছে যে, প্রয়োজনীয় বিষয় বেছে নেওয়াটাই কঠিন হয়ে গেছে।
মারকির কাজ অনেকটা সেই জট খুলে দেওয়া। বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকা তথ্য ও জটিল স্প্রেডশিটনির্ভর কাজকে একত্র করে ক্লাবের জন্য সহজ করে দেয় তারা। ব্রাখার ভাষায়, এক অর্থে মারকি ক্লাবের হয়ে কাজ করা একটি বিশ্লেষণ বিভাগের মতো।
তবে এটি ফুটবল ম্যানেজার গেমের মতো নয়, সেটিও স্পষ্ট করেছেন ব্রাখা। সম্ভাব্য খেলোয়াড়ের প্রোফাইল তৈরি করার সময় শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সামর্থ্য নয়, নির্দিষ্ট একটি দল ও কৌশলগত ব্যবস্থার সঙ্গে তাঁর উপযোগিতাও বিবেচনা করে মারকি। এরপর সেই সুপারিশ গ্রহণ করবেন কি না, সেটি ক্লাবের খেলোয়াড় নিয়োগ বিভাগের সিদ্ধান্ত।
গোল ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তিটি প্রিমিয়ার লিগের কয়েকটি ক্লাব ব্যবহার করছে। বার্সেলোনা ও এমএলএসের শিকাগো ফায়ারও এর প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছে।
চোটের ভেতরেও খুঁজছে উত্তর
এআইয়ের ব্যবহার শুধু নতুন খেলোয়াড় বাছাইয়ে আটকে নেই। চোট, বিশেষ করে হ্যামস্ট্রিংয়ের মতো জটিল সমস্যার ক্ষেত্রেও প্রযুক্তিটি ভূমিকা রাখছে।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারে ন্যাশভিল এসসির বিপক্ষে এফসি সিনসিনাটির একটি ম্যাচে ম্যাট মিয়াজগার চলাচলে অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করেছিল ক্লাবের প্রযুক্তি। বদলি হওয়ার অনুরোধ করার পাঁচ মিনিট আগেই সেই সংকেত দিয়েছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাটি। অবশ্য এটি তাৎক্ষণিক তথ্য ছিল না এবং চোট এড়ানো যেত—এমন দাবিও করা হচ্ছে না; কিন্তু প্রযুক্তি তাঁর চলাচলের ধরনে সমস্যার ইঙ্গিত ধরতে পেরেছিল।
স্প্রিংবক অ্যানালিটিকসের মতো প্রতিষ্ঠান এআই ব্যবহার করছে এমআরআই স্ক্যানের তথ্য বিশ্লেষণে। প্রচলিত এমআরআই থেকে পাওয়া অসংখ্য দ্বিমাত্রিক ছবি নিয়ে চিকিৎসকদের বিস্তারিত বিশ্লেষণ করতে হয়। স্প্রিংবকের প্রযুক্তি সেই ছবিগুলো এআই দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে পেশির বিস্তারিত ত্রিমাত্রিক ডিজিটাল মডেল তৈরি করতে পারে।
স্প্রিংবক অ্যানালিটিকসের অ্যানালিটিকস পরিচালক ম্যাট ব্রাউন গোল ডটকমকে বলেছেন, প্রযুক্তিটির কাজ চোট সারিয়ে দেওয়া নয়। চোট প্রতিরোধের কোনো জাদুকরি সমাধানও এটি নয়; বরং জটিল তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করে চিকিৎসক ও পারফরম্যান্স বিভাগের কর্মীদের সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করা।
চোটের সময়, দুই মাস পর বা ছয় মাস পর খেলোয়াড়ের স্ক্যান করে পেশির ক্ষয় এবং পুনর্বাসনের ফলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। যে ধরনের তথ্য চূড়ান্ত করতে সাধারণত এক সপ্তাহ লাগতে পারে, প্রযুক্তিটি সেটি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দিতে পারে বলে গোল ডটকমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
কাভান সুলিভানের শরীরের ভবিষ্যৎ
এআইয়ের আরেকটি বড় সম্ভাবনার জায়গা বয়সভিত্তিক ফুটবল। ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের একাডেমিতে কাভান সুলিভানের মতো প্রতিভাবান তরুণকে নিয়ে প্রশ্ন শুধু তিনি এখন কত ভালো খেলছেন, সেটিই নয়। তাঁর শরীর মূল দলের ফুটবলের চাপ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত কি না, তিনি কতটা শারীরিকভাবে পরিণত, ভবিষ্যতে তাঁর বিকাশ কোন পথে যেতে পারে—এসব প্রশ্নেরও উত্তর খোঁজে ক্লাবগুলো।
প্রচলিত পদ্ধতিতে এ জন্য শক্তি, শরীরের আকার, সম্ভাব্য উচ্চতা ও পারফরম্যান্স নিয়ে নানা পরীক্ষা করা হয়; কিন্তু সেগুলো সময়সাপেক্ষ এবং অনেক ক্ষেত্রেই অনুমাননির্ভর।
ফিট: ম্যাচ নামের একটি প্রযুক্তি সেই কাজ আরও দ্রুত করার চেষ্টা করছে। বিভিন্ন দিক থেকে চারটি ছবি তুললেই স্মার্টফোনের মাধ্যমে একজন খেলোয়াড়ের উচ্চতা, শরীরের ভর, দুই হাতের প্রসারসহ বিভিন্ন শারীরিক পরিমাপ করা যায়। এরপর সম্ভাব্য উচ্চতা, শারীরিক বিকাশ ও পুরোপুরি ফিট অবস্থায় শরীর কেমন হতে পারে, সে সম্পর্কেও একটি ধারণা দেওয়া হয়।
প্রতিষ্ঠাতা হানিফ ব্রাউন মজা করে এটিকে বলেছেন, ‘ফুটবলের চ্যাটজিপিটি’। গোল ডটকমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেশাদার ফুটবল ক্লাবগুলোতে প্রচলিত একটি মূল্যায়নপ্রক্রিয়াকে ৩০ সেকেন্ডের কম সময়ে সম্পন্ন করার চেষ্টা করে প্রযুক্তিটি।
এর গুরুত্ব আছে আরেকটি কারণে। একই বয়সের দুজন ফুটবলার শারীরিকভাবে একই পর্যায়ে থাকেন না। ১৪ বছর বয়সী একজন হয়তো শারীরিকভাবে দ্রুত বিকশিত হয়েছে, আরেকজনের বিকাশ হতে পারে তুলনামূলক ধীরগতির। শুধু বর্তমান শারীরিক আকার দেখে সিদ্ধান্ত নিলে দেরিতে বিকশিত হওয়া প্রতিভাবান কেউ বাদ পড়ে যেতে পারেন।
হানিফ ব্রাউন গোল ডটকমকে বলেছেন, এআইয়ের সাহায্যে এখন এমএলএস ক্লাবগুলো এ ধরনের পার্থক্য বৈজ্ঞানিকভাবে বুঝতে পারে এবং দেরিতে বিকশিত হওয়া খেলোয়াড়দের জন্য আরও ভালো পথ তৈরি করতে পারে, যাতে তারা ব্যবস্থার বাইরে ছিটকে না পড়ে।
কৌশলের জন্যও চ্যাটজিপিটি
খেলোয়াড় বাছাই, চোটের তথ্য কিংবা তরুণদের শারীরিক বিকাশের পর এবার এআই ঢুকছে কোচের চিন্তার জগতেও।
রবিন ফ্রেজার স্বীকার করেছেন, সম্ভাব্য ম্যাচ আপে সুবিধা ও ফরমেশন নিয়ে পরীক্ষা করার জন্য তিনি চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে দেখেছেন। তবে সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ সিয়াটল রেইনের প্রধান কোচ লরা হার্ভি। ২০২৫ সালের অক্টোবরে তিনি বলেছিলেন, কৌশল নিয়ে ভাবতে চ্যাটজিপিটির সাহায্য নিয়েছেন। এনডব্লিউএসএলের দলগুলোকে হারাতে কোন ফরমেশনে খেলা উচিত, এমন প্রশ্ন করেছিলেন তিনি এআইকে। তখন লিগের ১৪ দলের মধ্যে দুটি দলের বিপক্ষে চ্যাটজিপিটির পরামর্শ ছিল পাঁচজন ডিফেন্ডার নিয়ে খেলা।
হার্ভি সেই ধারণা নিয়ে নিজের কোচিং স্টাফের সঙ্গে আলোচনা করেন। পরে সিয়াটল রেইন পাঁচ ডিফেন্ডারের ব্যবস্থা ব্যবহার করে মৌসুম শেষ করে পঞ্চম হয়ে, যা আগের বছরের চেয়ে আট ধাপ ভালো।
এআই কি মানুষের জায়গা নেবে
ফুটবলে এআই এখনো মানুষের বিকল্প হয়ে ওঠেনি। মারকির দেওয়া খেলোয়াড়ের তালিকা থেকে কাকে নেওয়া হবে, সেটি এখনো ক্লাবের নিয়োগ বিভাগের সিদ্ধান্ত। স্প্রিংবক চিকিৎসা করে না, দেয় পরিমাপ ও তথ্য। কোচের ক্ষেত্রেও এআই একটি ধারণা দিতে পারে; কিন্তু সেই ধারণা গ্রহণ, বিশ্লেষণ ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব মানুষেরই।