অবিশ্বাস্য নাটকীয়তার ম্যাচে রোনালদোর হাসি, মদরিচের বিদায়
পর্তুগাল ২ : ১ ক্রোয়েশিয়া
প্রথম ৪৫ মিনিটের খেলা দেখে কে জানত, পরের অর্ধেকে এত নাটকীয়তা জমিয়ে রেখেছে এই ম্যাচ।
বিরতির সময় স্কোরলাইন ছিল ০-০। সুযোগ তৈরি হয়েছে, আক্রমণ হয়েছে, কিন্তু গোল আসেনি। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে পুরো ভিন্ন ছবি। গোল–পাল্টা গোল, অফসাইডে বাতিল হওয়া গোল, ভিএআরের হস্তক্ষেপ, যোগ করা সময়ে পর্তুগালের গোল, আবার শেষ মুহূর্তে ক্রোয়েশিয়ার সমতা ফিরিয়ে আনার উল্লাস—কিছুক্ষণ পর আবার ভিএআরে বাতিল। সব মিলিয়ে টরন্টোতে বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশের ম্যাচটির দ্বিতীয়ার্ধে দেখা গেল রুদ্ধশ্বাস সব নাটকীয়তা।
৯০ মিনিট পেরিয়ে যোগ করা সময়ের ১৯তম মিনিটে শেষ হওয়া ম্যাচে শেষ উদ্যাপনটা করেছে পর্তুগাল। ক্রোয়েশিয়াকে ২–১ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলোয় উঠেছে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর দল। আর ম্যাচে এগিয়ে গিয়েও শেষ পর্যন্ত হারের হতাশা নিয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে ক্রোয়েশিয়া, খুব সম্ভবত ৪০ বছর বয়সী লুকা মদরিচও।
কানাডার টরন্টো স্টেডিয়ামে এটি ছিল এবারের বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচ। প্রথমার্ধে বলের দখল ও আক্রমণে এগিয়ে ছিল পর্তুগাল। ব্রুনো ফার্নান্দেজ, রাফায়েল লিয়াও, জোয়াও কানসেলো আর রোনালদোরা একের পর এক সুযোগ তৈরি করলেও ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণে সেসব আটকে গেছে। ক্রোয়েশিয়ার গোলকিপার ডমিনিক লিভাকোভিচ ছিলেন রীতিমতো দেয়ালের ভূমিকায়।
বিপরীতে ক্রোয়েশিয়া আক্রমণে খুব বেশি আগ্রাসী খেলতে পারেনি। যে কারণে বিরতিতে দুই দল মাঠ ছাড়ে গোলশূন্য সমতায়।
খেলার চেহারা বদলে যায় দ্বিতীয়ার্ধে। শুরুতেই আক্রমণের ধার বাড়ায় ক্রোয়েশিয়া। ৫৩ মিনিটে স্তানিসিচের ক্রস থেকে বল পেয়ে নিচু শটে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন ইভান পেরিসিচ।
সেই গোলের তিন মিনিট পর আরও একবার পর্তুগালের জালে বল জড়ায় ক্রোয়েশিয়া, তবে অফসাইডে তা বাতিল হয়ে যায়।
এরপর নাটকের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন রোনালদো। ৬১ মিনিটে কানসেলোর পাস ধরে দারুণ ফিনিশে জাল খুঁজে পেলেও সূক্ষ্ম অফসাইডের কারণে ভিএআরে তাঁর গোল বাতিল হয়ে যায়। তবে হতাশা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি।
তিন মিনিট পরই ভিএআর দেখে ভেইগার জার্সি টেনে ধরার অপরাধে পর্তুগালকে পেনাল্টি দেন রেফারি। ৬৮ মিনিটে স্পটকিকে সোজাসুজি বল জালে পাঠিয়ে সমতা ফেরান রোনালদো। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এটি তাঁর প্রথম গোল।
সমতায় ফেরার পর দুই দলই জয়সূচক গোলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। ৭৫ মিনিটে মাতেও কোভাচিচের দূরপাল্লার শট দারুণ দক্ষতায় পোস্টে ঠেলে দেন দিয়োগো কস্তা। ফিরতি বলেও আরেকটি নিশ্চিত গোল বাঁচান পর্তুগিজ গোলরক্ষক। ৮০ মিনিটে আবারও বল জালে জড়ায় ক্রোয়েশিয়া, কিন্তু এবারও অফসাইডের পতাকা তাদের আনন্দ কেড়ে নেয়।
৮১ মিনিটে রোনালদোকে তুলে নেন পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেজ। তবে মাঠ ছাড়ার সময় পর্তুগাল অধিনায়কের মুখে ছিল স্পষ্ট অসন্তোষ।
তবে রোনালদোর অনুপস্থিতিতে পর্তুগালের খেলায় আক্রমণে গতিও বাড়ে। খেলা অতিরিক্ত সময়ে যাচ্ছে মনে হচ্ছিল যখন, তখন যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে গোল পেয়ে যায় পর্তুগাল। রাফায়েল লিয়াওয়ের ক্রস থেকে দুর্দান্ত হেডে গোল করেন বদলি নামা গনসালো রামোস। ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়ে জয়ের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যায় পর্তুগাল।
কিন্তু নাটক তখনো শেষ হয়নি।
প্রথমে যোগ করা সময় ১০ মিনিট দেওয়া হলেও গোল ও সময় নষ্টের কারণে সেটি বাড়তে শুরু করে। যোগ করা সময়ের ১৩তম মিনিটে বল জালে জড়ান ইয়োস্কা গাভার্দিওল। স্কোরলাইন ২–২। ক্রোয়েশিয়ান খেলোয়াড়েরা মেতে ওঠেন উল্লাসে, পর্তুগাল বেঞ্চে নেমে আসে হতাশা।
তবে কিছুক্ষণ পরই রেফারি ছুটে যান মাঠের পাশে রাখা মনিটরে। সেখানে সময় নিয়ে ভিএআর পর্যালোচনা দেখা যায়, আক্রমণের শুরুতে পাসালিচ অফসাইডে ছিলেন। রেফারি দেন গোল বাতিলের ঘোষণা, ভেঙে যায় ক্রোয়েশিয়ার স্বপ্ন।
এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে গ্যালারি থেকে বোতল ছোড়েন ক্রোয়েশিয়ার সমর্থকেরা। কিছু সময় খেলা বন্ধ থাকার পর শেষ বাঁশি বাজান রেফারি।
শেষ বাঁশির সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় পর্তুগালের উল্লাস, আর শেষ হয়ে যায় মদরিচের আরেকটি বিশ্বকাপ–স্বপ্ন। আর রোনালদো?
বহু প্রতীক্ষার পর নকআউটে প্রথম গোলের স্বাদ নিয়ে তিনি এখন দলকে পৌঁছে দিলেন শেষ ষোলোয়। সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত একটায় পর্তুগালের প্রতিপক্ষ স্পেন।