অন্যদিকে আগের বিশ্বকাপের নায়ক জিনেদিন জিদানের জন্য এইবারের বিশ্বকাপটা ছিল পুরো বিপরীত। চোটের জন্য প্রথম দুই ম্যাচে মাঠের বাইরে থাকা জিদান দেখলেন, চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স সেই খেলাগুলোতে হেরে বিদায় নিল। নতুন শতকে চ্যাম্পিয়নদের জন্য এক নতুন অভিশাপের ধারার সূচনা করল ফ্রান্স, যার শিকার পরবর্তী সময়ে হয়েছে ইতালি, স্পেন আর জার্মানি।

ব্রাজিল ফাইনালে জার্মানিকে হারালেও অলিভার কান দেখিয়েছিলেন গোলকিপার হয়েও দলকে কীভাবে অত দূর টেনে তোলা যায়। অথচ এই দুই দল আরেকটু হলে বিশ্বকাপ থেকেই বাদ পড়ত।

ইংল্যান্ডের কাছে ৫-১ গোলে হারার পর জার্মানিকে বাছাইপর্বের প্লে–অফ খেলতে হয় ইউক্রেনের সঙ্গে। অন্যদিকে ব্রাজিলের অবস্থা ছিল আরও খারাপ। ইকুয়েডরের সঙ্গে বাছাইপর্বে হারা দলটা তিন–তিনবার কোচ বদলায়। শেষতক লাতিন আমেরিকার ৪ নম্বর দল হয়ে কোনোমতে বাছাইপর্ব উতরায়।

ফ্রান্সের কথা তো বলাই হলো। আরও দুই ফেবারিট আর্জেন্টিনা আর ইতালি প্রত্যাশার তুলনায় খারাপ করে। কিন্তু স্বাগতিক হওয়ার সুবিধা নিয়ে, এর আগে কখনো একটি ম্যাচও না জেতা দক্ষিণ কোরিয়া সেমিফাইনালে যায়, হাকান সুকুরের তুরস্কও খেলে শেষ চারে।

তবে বিশ্বকাপের আলাপে ঢোকার আগে, আমরা ফুটবলের বাইরের রাজনীতিটা দেখে আসি। ৩১ মে টুর্নামেন্ট শুরুর তিন দিন আগে কোরিয়াতে হওয়া ফিফার ৫৩তম কংগ্রেসজুড়ে চোখ ছিল গোটা দুনিয়ার। জোয়াও হাভেলাঞ্জের তৈরি করা সাম্রাজ্যের তখন অধিপতি সেপ ব্ল্যাটার। সুইজারল্যান্ডের এই ছোটখাটো দেখতে আইনজীবী, নিজের সাবেক বসের দুর্নীতির বিষয়টি ব্ল্যাকমেল করে পদটিতে আসীন হন। কিন্তু ব্ল্যাটারের নিজের সহযোগী, আরেক সুইস আইনজীবী মাইকেল জেন রাফিনেন তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন।

তত দিনে গোটা দুনিয়া জানে, ফিফা রীতিমতো এক মাফিয়া সংগঠন। এক দেশ, এক ভোট নীতিকে দারুণভাবে কাজে লাগিয়ে, ছোট দেশগুলোর ফেডারেশনগুলো ও তাদের প্রভাবশালীদের উৎকোচ ও অন্যান্য প্রভাব খাটিয়ে ব্ল্যাটার নিজের পকেট ও ক্ষমতা সুসংহত করেন। অতি সম্প্রতি নেটফ্লিক্সের ডকুমেন্টারি ফিফা আনকভার্ডে এই বিষয়ে বিশদে জানতে পারেন আগ্রহীরা। এ ছাড়াও, আরও আগ্রহীরা পড়তে পারেন ডেকলান হিলের দ্য ফিক্স, ডেভিড কনের দ্য বিউটিফুল গেম ও দ্য ফল অব দ্য হাউস।

সে যা–ই হোক, দুর্নীতির এন্তার অভিযোগের পরও ব্ল্যাটার আবার নির্বাচনে জেতেন। হারিয়ে দেন ক্যামেরুনের ইসা হায়াতুকে, যাঁর পেছনে ছিল ইউরোপের সমর্থন। ব্ল্যাটারের এই ১৩৯-৫৬ ভোটের জয় ফিফার নেতৃত্বকে করে তোলে আরও আত্মবিশ্বাসী। ‘চার্চের চেয়েও শক্তিশালী’ ফিফা নিজেদের ধরাছোঁয়ার বাইরে ভাবতে থাকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জন্ম হয় আরও বড় বড় দুর্নীতির। শেষতক মার্কিনদের সঙ্গে ঝামেলা করায় এফবিআইয়ের হাতে পতন হয় এই সাম্রাজ্যের বেশির ভাগ কুশীলবের, কেউ কেউ অপরাধীও সাব্যস্ত হন (কেন বেসিংগারের রেড কার্ড বইটা বিশদে জানার জন্য দারুণ)। কিন্তু দুনিয়ার সেরা খেলাটা কেবল খেলা হয়ে থাকে না, তা নিশ্চিত হয়। বিশ্বরাজনীতির অন্যতম ঘুঁটিতে পরিণত হয় বিশ্বকাপ। রাশিয়া ও কাতারকে বিশ্বকাপের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত, দুনিয়ার রাজনীতির মতোই প্রচণ্ড রকম দ্বিধাবিভক্ত হয়। এই কাদাপানিতে, সুযোগসন্ধানীরা নানা রকম মাছ শিকার করে নিতে ভুল করে না। জ্ঞানে কিংবা অজ্ঞানে বিক্রি হয়ে যান সমর্থকেরা, বিক্রি হয়ে যায় তাদের আবেগ আর ভালোবাসা। সন্দেহ জাগে বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো নিয়েও। তবু আমরা গল্পটা চালিয়ে যাই।

বিশ্বকাপ শুরু হলোফ্রান্স আর সেনেগাল ম্যাচের আগের দুটি ঘটনা জানলে ম্যাচটার ফলাফল বুঝতে সুবিধা হবে। সেনেগালের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার, বাঁ পায়ের খালিলু ফাদিগা এক জুয়েলারি দোকান থেকে সোনার চেইন চুরি করেন বলে অভিযোগ ওঠে। তবে চেইনটা ফেরত পাওয়ায় দোকানমালিক মামলা উঠিয়ে নেন, যাতে ফাদিগার মনোযোগে ব্যাঘাত না ঘটে। সিউলের ওই দোকানদারের দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলে ফাদিগা দুর্দান্ত খেলা উপহার দেন আর একমাত্র স্ট্রাইকার এল হাজি দিউফ, যিনি ম্যাচের একমাত্র গোলটা দেন, তাঁর সঙ্গে ফরাসিদের ব্যতিব্যস্ত করে তোলেন। সেদিন সবচেয়ে বেশি অসহায় ছিলেন, ফ্রান্সের ৩৩ বছর বয়সী সেন্টার–ব্যাক মার্সেল দেশাই। সেই খেলার আগে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে দেশাই বলেছিলেন, ফরাসি ডিফেন্ডারদের বয়স নিয়ে মিডিয়া বাড়াবাড়ি করছে। বয়স বেশি হলেও তাঁরা বিশ্বকাপ জয়ের ক্ষমতা রাখেন।

ফরাসিদের মতোই হয়তো কিছুটা হামবড়া ভাব হয়েছিল পর্তুগালের। ওরাও প্রথম রাউন্ডে উড়ে যায়, বিশেষত প্রথম ম্যাচে চনমনে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৩-২ গোলে হারার ধাক্কাটা তারা কাটাতেই পারেনি। কোচ ব্রুস এরেনার অধীনে ল্যান্ডন ডনোভান আর ব্রায়ান ম্যাকব্রাইডরা ছিলেন অপ্রতিরোধ্য।

একই অবস্থা হয় আর্জেন্টিনারও। জাপানের কাশিমা স্টেডিয়ামে প্রথম ম্যাচে তাঁরা নাইজেরিয়ার বিপক্ষে জেতে ঠিকই, কিন্তু ইংল্যান্ডের কাছে হেরে আর সুইডেনের সঙ্গে ড্র করে গ্রুপ থেকে বিদায় নেয়। সেই ১৯৬৬ সালে কোচ আলফ রামসি আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের ‘জানোয়ার’ বলার পর থেকেই দুই দেশের খেলা মানেই ছিল যুদ্ধ। সত্যিকারের ফকল্যান্ড যুদ্ধ, ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল আর সিমিওনের চালাকিতে ১৯৯৮ সালে বেকহামের লাল কার্ড, সেই ম্যাচকে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে উত্তপ্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিণত করে। বেকহাম এবার শুধু প্রতিশোধই নিলেন না, ফুটবলের গুরুত্বটা আবার বোঝালেন।

বিশ্বকাপের কিছুদিন আগে ২১ এপ্রিল, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ খেলতে নামা বেকহাম দেপোর্তিভো লা করুনার আলদো দুসারের এক কড়া ফাউলের শিকার হন। ইংল্যান্ড অধিনায়কের মেটাটারসেল কয়েক টুকরা হয়ে যায়।

সেই ঘটনায় দুনিয়া টের পায় জনমানসে ফুটবলের ক্ষমতা। পুরো ব্রিটিশ মিডিয়ায় তখন মূল খবর হয়ে ওঠে বেকহাম খেলতে পারবেন কি না, এই খবর। নাইন ইলেভেন–পরবর্তী যুদ্ধ ছাপিয়েও প্রথম পাতার শিরোনাম হতো বেকহামের খবর। গোটা ইংল্যান্ডের উৎকণ্ঠা আর প্রার্থনা। এমনকি কেউ কেউ সন্দেহ করতেন, পুরোটাই ছিল দুসার তথা আর্জেন্টিনার শয়তানি। ফুটবল যে শুধু মাঠের খেলা নয়, ফিরে দেখা বিশ্বকাপের গল্পে তো আমরা সেটাই বলে আসছি বারবার।

মাঠের খেলায় ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে হারা ইতালি অবশ্য কোনোমতে দ্বিতীয় রাউন্ডে যায়। কিন্তু দ্বিতীয় রাউন্ডে হেরে যায় স্বাগতিক দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে। কোরিয়া নামটা শুনলেই ইতালির যেন কী হয়! সেই ১৯৬৬ সালে ওরা পর্যুদস্ত হয় উত্তর কোরিয়ার কাছে। তবে এইবার তারা দোষ দেয় ইকুয়েডরের রেফারি বায়রন মরেনোর ‘জঘন্য’ রেফারিংকে। ফ্রান্সিসকো টট্টি নিজেই ফাউলের শিকার হলেও উল্টো দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখেন। ইতালি ভিয়েরির গোলে ১৮ মিনিটে এগিয়ে গেলেও ৮৮ মিনিটে হিউয়েন গোল শোধ দেন আর ১১৭ মিনিটে গোল্ডেন গোল দেন আন জুং হুয়ান। সারা দেশকে আনন্দে ভাসালেও, সে সময় ইতালির লিগে পেরুজিয়ার হয়ে খেলা আনের চুক্তি বাতিল হয়। পেরুজিয়ার মালিক লুসিয়ানো গাউচি বলেন, ‘এমন কাউকে বেতন দেওয়ার কোনো ইচ্ছা আমার নেই, যে ইতালির ফুটবলকে ধ্বংস করে দিয়েছে।’

ব্রাজিল ও রোনালদো তাঁদের জয়যাত্রা অব্যাহত রাখে। যুক্তরাষ্ট্র হারায় কনকাকাফের আরেক দেশ মেক্সিকোকে। তুরস্ক হারায় সহ-স্বাগতিক জাপানকে। ইংল্যান্ড দাপটের সঙ্গে ডেনমার্ককে হারায় ৩-০ গোলে।

তবে কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড পেরে ওঠে না। ব্রাজিলের প্রথম বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক দিদির স্মৃতি ফিরিয়ে রোনালদিনিও দেন ফ্রি–কিক থেকে জাদুকরি ‘ঝরাপাতা’ এক গোল। রোনালদো আর রোনালদিনিওর সঙ্গে ব্রাজিলের আরেক বড় তারকা রিভালদো দিয়েছিলেন দলের প্রথম গোলটি।

জার্মানির তারকা মাইকেল বালাকের গোলে বিদায় নেয় যুক্তরাষ্ট্র, সেনেগাল গোল্ডেন গোলে হারে তুরস্কের বিপক্ষে। দক্ষিণ কোরিয়া আরও একটা বড় শিকার করে স্পেনকে টাইব্রেকারে হারিয়ে। তবে সেমিফাইনালে তাদের স্বপ্নযাত্রা থামে বালাকের গোলে। রোনালদোর গোলে তুরস্ককে হারায় ব্রাজিল। ফাইনালটা ব্রাজিল ফেবারিটের মতোই খেলে। আর রোনালদো দেখান নিজের সেরা খেলাটা।

টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হওয়া কান দারুণ এক সেভ করেন খেলার শুরুর দিকেই। মাঝমাঠে ডিয়েটমার হামানও ব্রাজিলের আক্রমণ ঠেকিয়ে উল্টো জার্মানির আক্রমণ শানাচ্ছিলেন। কিন্তু হায়, জীবনের মতো ফুটবলও বড় নিষ্ঠুর। রোনালদোর এক ট্যাকলে বলের নিয়ন্ত্রণ হারান হামান, সেই বলটায় জোরালো শট করেন রিভালদো। অন্য যেকোনোদিন কানের জন্য ওই শটটা ঠেকানো কোনো ব্যাপারই ছিল না। কিন্তু ৩০ জুন ইয়াকোহামা স্টেডিয়ামের খেলাটার ৬৮ মিনিটে বলটা তাঁর হাত থেকে ছুটে যায়! পড়বি তো পড় মালির ঘাড়ে (পড়ুন রোনালদোর পায়ে)। ব্রাজিল ১-০। রোনালদো আরেক গোল দেন ১১ মিনিট পর। নিজের আর দলের ৯৮ সালের বিরাট বোঝাটা নামিয়ে দেন।

ওদিকে পুরো টুর্নামেন্টে দারুণ খেলা কানের ঘাড়ে চেপে বসে মুহূর্তের এক ভুলের আফসোস। আহা! যদি সেই ভুলটা না হতো! কত রাত হয়তো যন্ত্রণায় নির্ঘুম কাটিয়েছেন, ভাবলেশহীন দেখতে, কঠোর চেহারার এই শক্তপোক্ত জার্মান।

বিশ্বকাপ আমাদের জন্য সব সময়েই মানব অনুভূতির এই দারুণ বৈচিত্র্য নিয়ে হাজির হয়। নতুন শতকেও সেই ধারা বজায় থাকল।