এল সালভাদরের সেই তরুণী এবং এক শ ঘণ্টার সেই ‘ফুটবল যুদ্ধ’
বিশ্বকাপ মানে তো শুধু মাঠের লড়াই নয়; এর আশপাশে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য গল্পের কোলাজ। যে গল্পের কোনোটিতে ঐতিহাসিক বিতর্ক আছে, আছে রোমাঞ্চ কিংবা অজানা চমক। বিশ্বকাপের তেমন কিছু গল্প নিয়ে এ আয়োজন—
অ্যামেলিয়া বোলানোসের বয়স তখন মাত্র ১৮। এল সালভাদরের এক তরুণী। সেবার টেলিভিশনের পর্দার সামনে বসেছিলেন বুকভরা আশা নিয়ে। কিন্তু শেষ মিনিটে সব ওলটপালট হয়ে গেল। হন্ডুরাসের স্ট্রাইকার রবার্তো কার্দোনা যখন শেষ মুহূর্তের জয়সূচক গোলটি করলেন, অ্যামেলিয়া আর নিতে পারলেন না। স্তব্ধ, নির্বাক মেয়েটি আস্তে করে উঠে দাঁড়ালেন। হেঁটে গেলেন বাবার ঘরের দিকে। ড্রয়ার থেকে বের করলেন বাবার পিস্তলটা। তারপর সোজা নিজের বুকে গুলি চালালেন। এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিলেন নিজের হৃৎপিণ্ড।
পোলিশ সাংবাদিক রিশার্ড কাপুশচিনস্কির বিখ্যাত বই ‘দ্য সকার ওয়ার’-এ উঠে এসেছে শিউরে ওঠার মতো এই গল্প। মধ্য আমেরিকার দুই প্রতিবেশী দেশের ফুটবলীয় উন্মাদনা কীভাবে এক রক্তক্ষয়ী ট্র্যাজেডির জন্ম দিয়েছিল, এ যেন তারই দলিল। ১৯৭০ মেক্সিকো বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে মুখোমুখি হয়েছিল এ দুই দেশ। ভৌগোলিক মানচিত্রে এল সালভাদর বেশ ছোট; কিন্তু ১৯৬৯ সালের সেই সময়ে তাদের জনসংখ্যা ছিল হন্ডুরাসের প্রায় দ্বিগুণ। ভাগ্যের অন্বেষণে, একটু জমি আর একটু সচ্ছলতার আশায় প্রায় সাড়ে তিন লাখ সালভাদরিয়ান অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ঢুকে পড়েছিলেন হন্ডুরাসে।
ষাটের দশকে হন্ডুরাস সরকার এই অভিবাসীদের ওপর চড়াও হতে শুরু করে। দেশের ভেঙে পড়া অর্থনীতি আর রাজনৈতিক অস্থিরতার সব দায় চাপানো হয় এই বহিরাগতদের ঘাড়ে। তাঁদের জমিজমা কেড়ে নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে পুনর্বণ্টন করা শুরু হয়। দুই দেশের সরকারের মধ্যে তখন বারুদের গন্ধ। ঠিক তখনই ফুটবলের ভাগ্যদেবতা এক অদ্ভুত খেল দেখালেন। নিজেদের গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বাছাইপর্বের সেমিফাইনালে এ দুই যুযুধান প্রতিপক্ষ মুখোমুখি হয়ে গেল একে অপরের!
প্রথম পর্ব: তেগুসিগালপার সেই নির্ঘুম রাত
খেলা হবে হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে ভিত্তিতে। প্রথম ম্যাচ, ১৯৬৯ সালের জুনের শুরুতে। ভেন্যু হন্ডুরাসের রাজধানী তেগুসিগালপা। মাঠের লড়াই শুরুর আগেই শুরু হয়ে গেল মাঠের বাইরের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। হন্ডুরাসের উগ্র সমর্থকেরা রাতে গিয়ে ভিড় জমালেন সালভাদর দলের হোটেলের সামনে। চলল অবিরাম পাথর ছুড়ে মারা, গাড়ির হর্ন বাজানো। সেই সঙ্গে গগনবিদারী চিৎকার, শিস আর স্লোগান তো আছেই। পুরো রাত চোখের পাতা এক করতে পারলেন না সালভাদরের ফুটবলাররা। এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ দারুণ কাজে দিল। পরদিন ক্লান্ত শরীর নিয়ে খেলতে নেমে ১-০ গোলে হেরে গেল এল সালভাদর। ওই যে শেষ মুহূর্তের গোল, যা মেনে নিতে না পেরে আত্মহত্যা করেছিলেন তরুণী অ্যামেলিয়া।
দ্বিতীয় পর্ব: সান সালভাদরের নরক
অ্যামেলিয়া বোলানোস রাতারাতি তাঁর দেশে ‘শহীদ’-এর সম্মান পেয়ে গেলেন। এল সালভাদরে তখন উগ্র জাতীয়তাবাদের আগুন জ্বলছে। দেশের পত্রিকা ‘এল নাসিওনাল’ লিখল, ‘কিশোরী মেয়েটি তার মাতৃভূমিকে এভাবে হাঁটু গেড়ে বসে পড়তে দেখতে চায়নি।’ অ্যামেলিয়ার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সরাসরি টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হলো। কফিনের পেছনে হাঁটলেন খোদ দেশের প্রেসিডেন্ট আর তাঁর মন্ত্রীরা। সেই মিছিলে শামিল হলো সালভাদর ফুটবল দলও, যারা সেদিন সকালেই হন্ডুরাস থেকে ফিরেছিল।
ঠিক এক সপ্তাহ পর। এবার ভেন্যু এল সালভাদরের রাজধানী সান সালভাদর। এবার প্রতিশোধের পালা। হন্ডুরাস দলের জন্য রাতটা হলো আরও বেশি নরকতুল্য। সালভাদরিয়ান সমর্থকেরা হোটেলের জানালা ভেঙে ভেতরে পচা ডিম আর মরা ইঁদুর ছুড়ে মারল। পরদিন মাঠে যাওয়ার সময় পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত ছিল যে হন্ডুরাস দলকে সাঁজোয়া গাড়িতে করে স্টেডিয়ামে নিয়ে যেতে হয়েছিল। রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ক্রুদ্ধ জনতা উঁচিয়ে ধরেছিল অ্যামেলিয়ার ছবি।
ম্যাচ শুরুর আগেই দাঙ্গায় প্রাণ হারালেন তিনজন। পুরো স্টেডিয়াম ঘিরে রাখল সেনাবাহিনী। এমনকি পিচের ঠিক পাশেই অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে রইল একদল সৈন্য। পুড়িয়ে দেওয়া হলো হন্ডুরাসের জাতীয় পতাকা। ঘরের মাঠে এল সালভাদর জিতল ৩-০ গোলে। তবে ম্যাচের ফলে মাঠের ফুটবলারদের কিছু এসে–যাচ্ছিল না। হন্ডুরাসের কোচ ম্যাচ শেষে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, ‘আমরা যে হেরেছি, এটাই ভাগ্য ভালো। জিতলে হয়তো আজ আমরা জান নিয়ে ফিরতে পারতাম না।’
খেলোয়াড়েরা বাঁচলেও রক্ষা পাননি হন্ডুরাসের সমর্থকেরা। ক্ষিপ্ত সালভাদরিয়ানরা তাঁদের ওপর চড়াও হন। লাথি, কিল-ঘুষি কিছুই বাদ যায়নি। বহু মানুষকে হাসপাতালে নিতে হয়েছিল, প্রাণ হারিয়েছিলেন দুজন। এ ঘটনার পর দুই দেশের সীমান্ত পাকাপাকিভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
তৃতীয় পর্ব: মেক্সিকো সিটির ফয়সালা এবং এক শ ঘণ্টার যুদ্ধ
সে আমলে গোল ব্যবধানের কোনো নিয়ম ছিল না। দুই দলই একটি করে ম্যাচ জেতায় সিরিজ সমতায় দাঁড়ায়। ফয়সালার জন্য ২৬ জুন ১৯৬৯ নিরপেক্ষ ভেন্যু মেক্সিকো সিটিতে আয়োজন করা হলো তৃতীয় ম্যাচের। অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো সেই স্নায়ুক্ষয়ী ম্যাচে ৩-২ ব্যবধানে জিতে বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বের টিকিট কাটে এল সালভাদর।
কিন্তু মাঠের সেই উত্তেজনা ফুটবলেই সীমাবদ্ধ থাকল না। ১৮ দিন পর সেই ফুটবলের আগুন ছড়িয়ে পড়ল যুদ্ধক্ষেত্রে। এল সালভাদরের সৈন্যরা সীমান্ত পেরিয়ে আক্রমণ চালাল হন্ডুরাসে। যাত্রীবাহী বিমানগুলোকে যুদ্ধবিমানে রূপান্তর করে, দুই পাশে বোমা বেঁধে তারা বর্ষণ করতে শুরু করল হন্ডুরাসের মাটিতে। হন্ডুরাসও বসে থাকেনি। তারাও পাল্টা বিমান হামলা চালায়। আর অদ্ভুত এক নির্মম পরিহাসে, হন্ডুরাসে বসবাসরত সালভাদরিয়ানদের ধরে এনে বন্দী করে রাখা হলো ফুটবল স্টেডিয়ামের ভেতরেই!
রক্তক্ষয়ী এই ‘ফুটবল যুদ্ধ’ স্থায়ী হয়েছিল মাত্র এক শ ঘণ্টা। কিন্তু এই অল্প সময়েই ঝরে গেল প্রায় দুই হাজার তাজা প্রাণ। ঘরবাড়ি হারিয়ে উদ্বাস্তু হলো লাখো মানুষ।